রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,

যে কারণে ভেঙে তিন টুকরো হলো তৃণমূল কংগ্রেস

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

জুন ২০, ২০২৬, ০২:০২ পিএম

যে কারণে ভেঙে তিন টুকরো হলো তৃণমূল কংগ্রেস

পশ্চিমবঙ্গে একটানা ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল তৃণমূল কংগ্রেস নির্বাচনি ফল প্রকাশের মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ভেঙে খানখান হয়ে গেছে। political বিশ্লেষকদের অনেকে দলটির ভবিষ্যৎ নিয়ে বিভিন্ন পূর্বাভাস দিলেও এত দ্রুত এমন বিপর্যয় ঘটবে তা কেউ ধারণা করতে পারেননি। ২৮ বছরেরও বেশি পুরোনো এই রাজনৈতিক দলটি মাত্র ২৮ দিনের মধ্যে তিন টুকরো হয়ে গেছে।

বর্তমানে দলটির বেশির ভাগ বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে আলাদা ব্লক গঠন করে নিজেদের আসল তৃণমূল বলে দাবি করছেন।তারা এখন কলকাতায় রাজ্য বিধানসভায় মূল বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করছেন। অন্যদিকে দিল্লিতে তৃণমূলের অন্তত ২০ জন লোকসভা সংসদ সদস্য স্পিকারকে চিঠি দিয়ে পুরোনো দল ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছেন। তারা এনসিপিআই নামের একটি নতুন দলে যোগ দিয়ে কেন্দ্রে শাসক জোট এনডিএকে সমর্থন জানাচ্ছেন। আর মূল দল এখন কাগজে-কলমে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর ভাইপো অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, যা মূলত কালীঘাট তৃণমূল নামে পরিচিতি পেয়েছে।

তৃণমূল কংগ্রেস এত দ্রুত ভেঙে যাওয়ার পেছনে প্রধানত তিনটি বড় কারণ রয়েছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন। প্রথমত, দলটির কোনো সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক দর্শন বা আদর্শ ছিল না। ১৯৯৮ সালে দল গঠনের পর থেকে ২০১১ সালে ক্ষমতায় আসা পর্যন্ত তাদের একমাত্র লক্ষ্য ছিল সিপিআইএমকে ক্ষমতা থেকে সরানো। ফলে শুধু নির্বাচন জেতার ওপর নির্ভরশীল এই জনমোহিনী রাজনীতি  মাঠে পরাজয়ের পর দলটির জন্য চড়া মূল্য ডেকে এনেছে। গত ৪ মে নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার পর দলটির নেতারা বুঝতে পারেন যে আদর্শিক ভিত্তি ছাড়া দীর্ঘকাল টিকে থাকা সম্ভব নয়। 

ভারতের অন্যান্য বড় দল বা এমনকি বাংলাদেশের জামায়াতে ইসলামী যখন নিষিদ্ধ ছিল, তখনও তারা নিজেদের আদর্শের জোরে টিকে ছিল, কিন্তু ৪১ শতাংশ ভোট পেয়েও তৃণমূলের ক্ষেত্রে তা ঘটেনি।দ্বিতীয় বড় কারণটি হলো এই ভাঙনের পেছনে বিজেপির সরাসরি অনুঘটকের ভূমিকা পালন করা। নির্বাচনি বিপর্যয়ের পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সবচেয়ে দুর্বলতম মুহূর্তে তাঁকে রাজনৈতিকভাবে আঘাত করার কোনো সুযোগ ছাড়েনি বিজেপি। বিদ্রোহী বিধায়কদের নেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় দল ছাড়ার আগে শুভেন্দু  সঙ্গে দেখা করেন এবং অন্যদিকে বিদ্রোহী সংসদ সদস্যরা বিজেপি নেতা ভূপেন্দ্র যাদবের বাসভবনে গোপন বৈঠক করেন। পুরো বিষয়টি ভারতের  স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ আড়াল থেকে তদারক করেছেন বলে জানা গেছে। 

বিজেপি মূলত পশ্চিমবঙ্গে রাজপথের আন্দোলনকারী মমতার বদলে একটি বন্ধুত্বপূর্ণ ও নরমপন্থী বিরোধী দল চেয়েছিল। তাছাড়া দিল্লিতে ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে বিজেপি এককভাবে ২৪০ আসন পাওয়ায় শরিকদের ওপর নির্ভরশীল ছিল এবং তৃণমূলের দুই-তৃতীয়াংশ সংসদ সদস্যকে ভাঙিয়ে এনডিএর শক্তি ৩০০ পার করাই ছিল তাদের লক্ষ্য।তৃতীয় এবং অন্যতম প্রধান অভ্যন্তরীণ কারণটি হলো দলের শীর্ষ নেতা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকা। তৃণমূলের বিদ্রোহী নেতারা প্রায় প্রত্যেকেই দলের ভেতর এক দমবন্ধ পরিস্থিতির জন্য মমতার ভাইপো ও অঘোষিত উত্তরাধিকারী অভিষেকের একনায়কতান্ত্রিক মনোভাবকে দায়ী করেছেন। 

তিনি পুরো রাজনৈতিক দলটিকে করপোরেট কায়দায় পরিচালনা করতেন এবং নিজের একটি নির্দিষ্ট ঘনিষ্ঠ বলয় তৈরি করে রাখতেন। এর ফলে তৃণমূলের নিচুতলার সাধারণ কর্মীদের সঙ্গে শীর্ষ নেতৃত্বের এক বিশাল দূরত্ব তৈরি হয়।দল পরিচালনায় করপোরেট শৃঙ্খলা আনতে গিয়ে তিনি আমজনতার রাজনীতি থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়েন। কয়েক বছর আগে তিনি আই-প্যাক নামের একটি নির্বাচনি পরামর্শদাতা সংস্থাকে দলের সঙ্গে যুক্ত করেন, যার বেতনভুক কর্মীরা কার্যত পুরো দলটিকে হাইজ্যাক করে নিয়েছিল। কে নির্বাচনে টিকিট পাবেন বা কে কী ধরনের  ভাষণ দেবেন, তা এই সংস্থার কর্মীরাই ঠিক করে দিত। এর পাশাপাশি অভিষেকের বিরুদ্ধে ওঠা নানা আর্থিক কেলেঙ্কারির অভিযোগ দলটির ভাবমূর্তি পুরোপুরি নষ্ট করে দেয়। ক্ষুব্ধ নেতারা এখন অভিষেকের দিকে আঙুল তুলেই নিজেদের দলবদলকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করছেন।

তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা