শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর, ২০২৬,
সাহিত্যের নোবেল

প্রেম ও জীবনের জটিল অনুভূতির কবি অ্যান কারসন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

অক্টোবর ৯, ২০২৬, ০৫:৩৯ পিএম

প্রেম ও জীবনের জটিল অনুভূতির কবি অ্যান কারসন

কানাডীয় কবি অ্যান কারসন চলতি বছরের সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার অর্জন করেছেন। তাঁকে এই পুরস্কারের জন্য বেছে নেওয়াকে দারুণ সাহসী ও আনন্দদায়ক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে। ১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে তিনি যে বৈচিত্র্যময় সাহিত্যকর্ম সৃষ্টি করে চলেছেন, তা সত্যিই ব্যতিক্রমী। তাঁর লেখার জগতে রয়েছে কবিতা, প্রবন্ধ, অনুবাদ, যৌথ শিল্পকর্ম এবং এমন কিছু সৃষ্টি, যেখানে গবেষণা, গ্রাফিক নকশা ও জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা একে অপরের সঙ্গে মিশে গেছে।

তবে তাঁর বইয়ের পাতা খুললেই প্রথম যে বিষয়টি পাঠকের নজর কাড়ে, তা হলো লেখার স্বতন্ত্র ভঙ্গি। অ্যান কারসনের লেখার ধরন একেবারেই আলাদা। তাঁর রচনায় রয়েছে সংযত অথচ তীক্ষ্ণ ভাষা, বুদ্ধিদীপ্ত তর্ক এবং কখনো কখনো চমকপ্রদ রসবোধ। জীবনের যন্ত্রণাদায়ক অভিজ্ঞতাগুলোও তিনি অতিরিক্ত আবেগ ছাড়াই তুলে ধরেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মুদ্রিত লেখার কিছু অংশ ইচ্ছাকৃতভাবে বাদ দিয়েও তিনি অনুভূতি প্রকাশ করেন। তাঁর এই সংক্ষিপ্ত অথচ গভীর লেখার ধরন পাঠককে একবার পড়তে শুরু করলে সহজে বই থেকে উঠতে দেয় না।

পাঠ শুরু করার জন্য তাঁর সাহিত্যজগতে প্রবেশের অন্যতম সেরা বই হলো ২০০১ সালে প্রকাশিত ‘The Beauty of the Husband: A Fictional Essay in 29 Tangos’। বইটির দীর্ঘ উপশিরোনাম দেখে পিছিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। বিচ্ছেদকে কেন্দ্র করে লেখা এই কাব্যধর্মী আখ্যান প্রেম, সম্পর্ক ও যৌন ঈর্ষার এমন এক চিত্র তুলে ধরে, যার সঙ্গে অনেক পাঠকই নিজেদের অভিজ্ঞতার মিল খুঁজে পান। বইটির অধ্যায়গুলোকে ট্যাঙ্গো বা এক ধরনের যুগল নৃত্যকলা বলা হয়েছে। আকাঙ্ক্ষা থেকে ক্রোধ—এমন নানা অনুভূতির মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলে প্রতিটি অধ্যায়। কবিতার ঘূর্ণায়মান ছন্দ, আবেগের তীব্রতা ও দ্রুতগতির ভাষা যেন ট্যাঙ্গো নাচের আবেগময় গতিকেই লেখার মধ্যে ফুটিয়ে তুলেছে।

ইংরেজিভাষী সাহিত্যের কয়েকজন কবি যখন পদ্যনির্ভর উপন্যাস নিয়ে কাজ করছিলেন, তখন অ্যান কারসন এই ধারাকে আত্মঅনুসন্ধানের এক নতুন রূপ দেন। ‘The Beauty of the Husband’ প্রকাশের তিন বছর আগে প্রকাশিত তাঁর ‘Autobiography of Red’ বইটি প্রাচীন গ্রিক পুরাণের গেরিয়ন চরিত্রের খণ্ডিত কাহিনিকে নতুনভাবে তুলে ধরে। এই গল্পে গেরিয়ন হয়ে ওঠে ভিন্নতা ও বিচ্ছিন্নতার প্রতীক। এ দিক থেকে চরিত্রটির সঙ্গে ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের সেই নিঃসঙ্গ ও ভালোবাসাবঞ্চিত সৃষ্টির তুলনা করা যায়, যে সমাজে নিজের জায়গা খুঁজে পায় না। প্রাচীন গ্রিক সাহিত্য নিয়ে কারসনের গভীর জ্ঞান থাকলেও তিনি তা পাঠকের ওপর চাপিয়ে দেননি। বরং সমকালীন পৃথিবীতে নিজের পরিচয় ও অবস্থান খুঁজতে থাকা এক তরুণ শিল্পীর গল্পের মধ্য দিয়ে বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন।

গেরিয়ন চরিত্রটি পারিবারিক যৌন নির্যাতনের শিকার একজন তরুণ। নিজেকে অন্যদের তুলনায় অস্বাভাবিক বা ভুল মনে করার যে যন্ত্রণা, তা তার চরিত্রে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে লেখক এই অভিজ্ঞতার সঙ্গে যৌন পরিচয় প্রকাশ, প্রতিবন্ধিতার অভিজ্ঞতা এবং নিজের শরীর ও চেহারা নিয়ে অস্বস্তির মতো বিষয়ও যুক্ত করেছেন। ২০১৩ সালে কারসন এই বইয়ের পরবর্তী পর্ব ‘রেড ডক’ প্রকাশ করেন।

অ্যান কারসনের প্রায় সব লেখাই চিন্তার নতুন দরজা খুলে দেয়। তাঁর ভাষা সংক্ষিপ্ত হলেও ভাবনার জগৎ জটিল ও বহুমাত্রিক। তিনি কোনো বিষয়কে সহজ সিদ্ধান্তে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেন না। বরং প্রশ্ন ও দ্বিধাগুলোকে পাঠকের সামনে খোলা রাখেন। বর্তমানে যখন অনেক আলোচনা দুই বিপরীত অবস্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে এবং জটিল বিষয়কে অতিরিক্ত সরলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়; তখন কারসনের লেখার এই বৈশিষ্ট্য বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁর বই বারবার পড়লেও নতুন অর্থ ও ব্যাখ্যার সুযোগ থেকে যায়। এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ তাঁর প্রথম বই ‘Eros the Bittersweet: An Essay’, যা ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত হয়।

প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত বইটি মূলত তাঁর পিএইচডি গবেষণাপত্রের পরিমার্জিত রূপ। এতে প্রাচীন গ্রিক ধারণা ‘ইরোস’—অর্থাৎ প্রেম ও আকাঙ্ক্ষা নিয়ে তিনি সম্পূর্ণ নতুনভাবে আলোচনা করেছেন। বইটি গবেষণাধর্মী রচনা হলেও কবি ও শিল্পীদের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারসন দেখিয়েছেন, কোনো কিছু পাওয়ার ইচ্ছার পাশাপাশি তা না পাওয়ার কষ্টও মানুষের মনে গভীর আকাঙ্ক্ষা তৈরি করে। কোনো কিছু থেকে দূরে থাকা কিংবা তার অনুপস্থিতিই অনেক সময় আকাঙ্ক্ষাকে আরও তীব্র করে তোলে। তাঁর সাহিত্যজুড়ে এই পাওয়া-না-পাওয়ার টানাপোড়েন বারবার ফিরে এসেছে।

শিল্পী রবার্ট কারির সঙ্গে অ্যান কারসনের বেশ কিছু যৌথ কাজ রয়েছে। রবার্ট কারি বর্তমানে তাঁর স্বামী। তাঁদের উল্লেখযোগ্য যৌথ কাজ ‘Nox’—একটি বাক্সের মধ্যে রাখা অ্যাকর্ডিয়নের মতো ভাঁজ করা বই। কানাডা থেকে হারিয়ে যাওয়া এবং পরবর্তীতে নিজের জীবন থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া ভাইয়ের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে কারসন বইটি তৈরি করেন। স্মৃতি, ছবি, ব্যক্তিগত উপলব্ধি ও নানা খণ্ডচিত্রের সমন্বয়ে বইটি যেন এক অনন্য কোলাজ। প্রচলিত বইয়ের কাঠামো থেকে বেরিয়ে এসে মুদ্রণ ও উপস্থাপনার ভিন্নধর্মী ব্যবহার পাঠককে পরিচিত বিষয়ও নতুনভাবে দেখতে শেখায়।

২০১৬ সালে প্রকাশিত ‘Float’ বইটিও একইভাবে ব্যতিক্রমী। একটি বাক্সের মধ্যে রাখা ১২টি আলাদা পুস্তিকা নিয়ে এটি তৈরি। পুস্তিকাগুলোতে রয়েছে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কবিতা, নাটকের পাণ্ডুলিপি, পাবলো পিকাসোকে নিয়ে লেখিকা গারট্রুড স্টাইনের সঙ্গে কাল্পনিক সংলাপ এবং উড়াল নিয়ে একটি গদ্যকবিতা। কোনো কোনো পুস্তিকা মাত্র এক পৃষ্ঠার দুই দিকজুড়ে ছাপা। আকারে ছোট হলেও প্রতিটি রচনা নিজস্ব বিষয় ও উপস্থাপনার কারণে পাঠকের মনোযোগ ধরে রাখে।

১৯৯০-এর দশকের শেষ দিকে ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয় যদি ধ্রুপদি সাহিত্য বিভাগটি বন্ধ না করত, তাহলে অ্যান কারসনের কবিতার জগৎ কতটা ভিন্ন হতো? সে সময় তিনি বিভাগটির স্নাতকোত্তর শিক্ষা কার্যক্রমের পরিচালক ছিলেন। প্রশ্নটির নিশ্চিত উত্তর পাওয়া সম্ভব নয়। তবে তাঁর সাহিত্যকর্মের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক বোঝার জন্য এটি প্রাসঙ্গিক। কারসনের লেখার সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকগুলোর একটি হলো প্রাচীন সাহিত্যের প্রতি তাঁর গভীর পাণ্ডিত্য এবং কবিতায় নতুন কিছু করার সাহসী প্রচেষ্টার সমন্বয়। এই দুই বৈশিষ্ট্যের সবচেয়ে স্মরণীয় প্রকাশ ঘটেছে ‘If Not, Winter’ বইয়ে। এতে তিনি প্রাচীন গ্রিক কবি স্যাফোর কবিতার নিজস্ব অনুবাদ ও পুনর্নির্মাণ তুলে ধরেছেন।

স্যাফোর কবিতার অনেক অংশই আজ খণ্ডিত অবস্থায় টিকে আছে। কারসন একজন কবি ও গবেষক হিসেবে সেই খণ্ডাংশগুলোর মধ্যে যে অর্থ, অনুভূতি ও ইঙ্গিত খুঁজে পেয়েছেন, তা সততা ও সূক্ষ্মতার সঙ্গে তুলে ধরেছেন। অন্য রচনায় যেমন তিনি মানুষের গভীর আবেগ ও আত্মযন্ত্রণাকে নির্মোহভাবে প্রকাশ করেন, এখানেও তেমনই সতর্ক ও সংবেদনশীল থেকেছেন।