শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর, ২০২৬,

সরকারি অর্থের অপচয় রোধে কড়া পদক্ষেপ

জাতীয় ডেস্ক

অক্টোবর ৯, ২০২৬, ০৬:২৩ পিএম

সরকারি অর্থের অপচয় রোধে কড়া পদক্ষেপ

সরকারি অর্থের অপচয় রোধ এবং জনগুরুত্বপূর্ণ সেবা নির্বিঘ্ন রাখতে দেশে অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষাব্যবস্থাকে স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার সমন্বিত উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আর্থিক ক্ষতি ও নাগরিক সেবায় বিঘ্ন ঘটার আগেই সম্ভাব্য ঝুঁকি চিহ্নিত করে তা নিরসন করাই এই সংস্কারের প্রধান লক্ষ্য। দীর্ঘকাল ধরে সাময়িকভাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীদের ওপর ভর করে এই কার্যক্রম চলায় তদারকির সক্ষমতা সীমিত ছিল। এই দুর্বলতা দূর করতে স্থায়ী জনবল নিয়োগ এবং নিরপেক্ষ তদারকি কাঠামো গড়ে তোলার জোরালো প্রস্তাব এসেছে।

গাজীপুরের একটি হোটেলে ৮ থেকে ১০ অক্টোবর অনুষ্ঠিত ‘সরকারি খাতে অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া: স্থায়িত্ব ও করণীয়’ শীর্ষক তিন দিনব্যাপী এক কর্মশালায় এসব সংস্কার প্রস্তাব বিশদভাবে পর্যালোচনা করা হয়। অর্থ বিভাগের ‘স্ট্রেংদেনিং পাবলিক ফাইন্যান্সিয়াল ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রাম টু এনাবল সার্ভিস ডেলিভারি’ বা এসপিএফএমএস কর্মসূচির আওতাধীন ইন্টারনাল অডিট অ্যান্ড অডিট ফলো-আপ স্কিম এই কর্মশালার আয়োজন করে।

কর্মশালার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে সংশোধিত ‘মডেল ঝুঁকিভিত্তিক অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা সনদ ও নির্দেশিকা ২০২৬’ আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মোচন করেন অর্থসচিব মো. খায়রুজ্জামান মজুমদার।

সরকারি দপ্তরে স্বচ্ছতা ফেরাতে এই নির্দেশিকাকে একটি আধুনিক রূপরেখা হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। খায়রুজ্জামান মজুমদার বলেন, বর্তমান সরকার অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে এই ব্যবস্থা কার্যকরভাবে চালু করা একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ, যা সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় সার্বিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করবে। প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে কিছু বাস্তব চ্যালেঞ্জ থাকলেও সমন্বিত প্রচেষ্টায় তা কাটিয়ে এই উদ্যোগকে একটি স্থায়ী ও ফলপ্রসূ ব্যবস্থায় রূপান্তর করতে হবে।

২০২৪ সালের গ্লোবাল ইন্টারনাল অডিট স্ট্যান্ডার্ডসের আলোকে প্রণীত এই নতুন নির্দেশিকায় নিরীক্ষকদের কর্মপরিধি, দায়িত্ব এবং প্রতিবেদন জমার সুনির্দিষ্ট নীতিমালা স্পষ্ট করা হয়েছে। এতে নিরপেক্ষ যাচাইয়ের আইনি ভিত্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি সম্পদের সুরক্ষা ও দুর্বলতা নিরসনে দিকনির্দেশনা যুক্ত রয়েছে।

নতুন সাংগঠনিক কাঠামোয় নিরীক্ষকেরা নিরীক্ষাসংক্রান্ত পেশাগত কাজের জন্য সংশ্লিষ্ট অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা কমিটির কাছে জবাবদিহি করবেন। অন্যদিকে প্রশাসনিক শৃঙ্খলার ক্ষেত্রে তারা সচিব বা প্রধান হিসাবদানকারী কর্মকর্তার অধীনে দায়িত্ব পালন করবেন। নিয়মিত কাজের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তাদের প্রভাবমুক্ত রেখে নিরীক্ষকদের পেশাগত স্বাধীনতা বৃদ্ধি করাই এই কাঠামোর মূল লক্ষ্য।

এই ব্যবস্থার সঙ্গে নাগরিকদের স্বাস্থ্যসেবা, প্রাথমিক শিক্ষা, সড়ক যোগাযোগ এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের মান সরাসরি সম্পর্কিত। দুর্বল ক্রয়প্রক্রিয়া, প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়হীনতা ও প্রযুক্তিগত ঘাটতির কারণে অপচয় বেড়ে প্রকল্প বিলম্বিত হয়, এমনকি সেবা পর্যন্ত বন্ধ হয়ে যায়। ঝুঁকিভিত্তিক নিরীক্ষা এসব সংকট আগাম শনাক্ত করবে।

সংস্কার রূপরেখায় প্রশাসনিক অনুমোদনের ভিত্তিতে আগামী তিন বছরে তিন ধাপে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগে স্থায়ী নিরীক্ষা ইউনিট বা অধিদপ্তর গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর আওতায় স্থায়ী জনবল কাঠামো, স্বতন্ত্র নিয়োগবিধি, বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ এবং বাজেট বরাদ্দের ওপর জোর দেওয়া হয়। কর্মশালায় আইবাস++ প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে সমন্বয় করে ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়টিও আলোচনায় আসে।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন অর্থ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব দিলরুবা শাহীনা এবং অতিরিক্ত সচিব ও এসপিএফএমএসের জাতীয় কর্মসূচি পরিচালক জিয়াউল আবেদীন। উদ্বোধনী পর্বে সভাপতিত্ব করেন অর্থ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. হাসানুল মতিন। মূল উপস্থাপনা তুলে ধরেন অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ আজাদ ছাল্লাল এবং নির্দেশিকা উপস্থাপন করেন অতিরিক্ত সচিব সাহানা। বিভিন্ন প্যানেল আলোচনা সঞ্চালনায় ছিলেন অতিরিক্ত সচিব ফেরদৌস রওশন আরা, রহিমা বেগম, সাহানা, মোহাম্মদ আবুল হাশেম, কে এম আলী আজম এবং যুগ্ম সচিব সৈয়দ রাশেদুল হোসেন।

কর্মশালায় সরকারের পাঁচটি প্রধান অধিদপ্তরের নিরীক্ষা অগ্রগতি ও বাস্তব প্রতিবন্ধকতা বিস্তারিতভাবে প্রকাশ করা হয়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, তারা ৯৩টি ঝুঁকি চিহ্নিত করার পাশাপাশি ছয়টি নিরীক্ষা প্রতিবেদন তৈরি সম্পন্ন করেছে। অধিদপ্তরটি অপচয় কমিয়ে স্বাস্থ্যসেবার মান বাড়াতে প্রশিক্ষিত জনবল, আর্থিক সংস্থান ও ডিজিটাল ব্যবস্থায় সরাসরি প্রবেশাধিকার দাবি করেছে।

গণপূর্ত অধিদপ্তর তাদের কার্যক্রমে ৭০টি ঝুঁকি চিহ্নিত করেছে। বার্ষিক পরিকল্পনা এগোলেও অনেক চিহ্নিত ত্রুটি এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে। শূন্য পদ, সমন্বয়হীনতা ও সীমিত স্বাধীনতা দূর করতে তারা ডিজিটাল অগ্রগতি ট্র্যাকিং ও কমিটির নজরদারির ওপর গুরুত্বারোপ করে।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর বা এলজিইডি ঝুঁকিভিত্তিক নিরীক্ষায় এসে ৭৮টি ব্যয়কেন্দ্রে কার্যক্রম চালিয়ে ৩০০টি পর্যবেক্ষণ লিপিবদ্ধ করেছে। তবে স্থায়ী সাংগঠনিক কাঠামো ও দক্ষ জনবলের ঘাটতির কারণে তাদের কাজের ধারাবাহিকতা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর জানিয়েছে, তাদের ১৩ সদস্যের নিরীক্ষা ইউনিট ৪১টি ঝুঁকি চিহ্নিত করেছে। এরই মধ্যে রায়পুরা ও লক্ষ্মীপুর সদরে পরীক্ষামূলক নিরীক্ষা পরিচালিত হয়েছে। প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও কারিগরি সহায়তার মাধ্যমে ২০২৭ সালের জুলাই মাসের মধ্যে একটি সমন্বিত নিরীক্ষা প্রতিবেদন চূড়ান্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে তারা।

সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর ৮২টি ঝুঁকি চিহ্নিত করে ছয়টি প্রতিবেদন তৈরি করেছে। এতে সরকারি কেনাকাটা, চুক্তি বাস্তবায়ন, ভূমি অধিগ্রহণ এবং আইটি কাঠামোর দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে এই কাজ করানোর ফলে নিরীক্ষার গতি শ্লথ হওয়ার চিত্রও তুলে ধরা হয়।

কর্মশালায় ২০২৬ থেকে ২০৩১ মেয়াদি অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা কর্মপরিকল্পনা নিয়ে বিশদ মতবিনিময় হয়। এতে দীর্ঘমেয়াদে স্থায়ী সরকারি কাঠামো, টেকসই বাজেট এবং অভ্যন্তরীণ ও বহিঃনিরীক্ষকদের প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় গড়ে তোলার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।