শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,
বিচার বিভাগের শৃঙ্খলা

হাইকোর্টে রিট মামলা নিষ্পত্তির হার দ্বিগুণ বেড়েছে

জাতীয় ডেস্ক

সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২৬, ১১:৪৭ এএম

হাইকোর্টে রিট মামলা নিষ্পত্তির হার দ্বিগুণ বেড়েছে

সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে নতুন রিট মামলা দায়েরের তুলনায় নিষ্পত্তির গতি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বিশেষ করে বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে নতুন দায়েরের চেয়ে দ্বিগুণ রিট মামলা নিষ্পত্তি করেছেন আদালত। বিচারাধীন মামলার জট আরও কমাতে বিচারিক শৃঙ্খলা রক্ষা এবং ব্যক্তিস্বার্থ বা ব্যক্তিগত বিরোধ নিয়ে রিট দায়েরের প্রবণতা বন্ধ করার ওপর জোর দিয়েছেন রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল।

প্রধান বিচারপতির নানামুখী পদক্ষেপে সুপ্রিম কোর্টে বিচারিক গতিশীলতা ফিরছে। অ্যাটর্নি জেনারেলের মতে, বর্তমান প্রধান বিচারপতি দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে আদালত অঙ্গনে একটি সুদৃঢ় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছেন। বিচারিক কার্যক্রমে পুরোপুরি শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হলে অপ্রয়োজনীয় রিট আবেদনের সংখ্যা দ্রুত কমে আসবে। সুপ্রিম কোর্টের গণসংযোগ কর্মকর্তা শফিকুল ইসলামের দেওয়া পরিসংখ্যানে জানা যায়, চলতি ২০২৬ সালের শুরুতে হাইকোর্ট বিভাগে বিচারাধীন রিট মামলার সংখ্যা ছিল এক লাখ ২৭ হাজার ৯৬০টি।

বছরের প্রথম প্রান্তিকে অর্থাৎ জানুয়ারি থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত তিন মাসে নতুন রিট দায়ের হয়েছিল চার হাজার ১১২টি। ওই সময়ে নিষ্পত্তি হয় দুই হাজার ২১৩টি মামলা। দ্বিতীয় প্রান্তিকে নিষ্পত্তির গতিতে বড় ধরনের উল্লম্ফন দেখা যায়। ১ এপ্রিল থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত তিন মাসে নতুন রিট মামলা দায়ের হয়েছে চার হাজার ৭২৯টি। বিপরীতে এই তিন মাসে রেকর্ড সংখ্যক নয় হাজার ৫৯০টি রিট মামলা নিষ্পত্তি করেছেন হাইকোর্ট। ফলে নতুন দায়েরের তুলনায় নিষ্পত্তির হার দ্বিগুণেরও বেশি দাঁড়ায়। জুন মাস শেষে হাইকোর্টে বিচারাধীন মোট রিট মামলার সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে এক লাখ ২৪ হাজার ৯৯৯টিতে। অপ্রয়োজনীয় রিট জট সৃষ্টির বড় কারণ। হাইকোর্টে বিপুল মামলা বিচারাধীন থাকার প্রেক্ষাপটে অ্যাটর্নি জেনারেল জানান, অনেক ক্ষেত্রে জনস্বার্থ মামলার নাম ভাঙিয়ে নিছক ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করতে রিট করা হচ্ছে। এর পেছনে অনেকেরই মূল উদ্দেশ্য থাকে আত্মপ্রচার। রিট দায়ের করেই এক শ্রেণির মানুষ গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে যাচ্ছেন, যা বিচার বিভাগের জন্য কোনোভাবেই কাঙ্ক্ষিত নয়।

সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের দেওয়া চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও রায় মেনে চলা হাইকোর্ট বিভাগের জন্য বাধ্যতামূলক। আপিল বিভাগ ইতিমধ্যে আইনি পর্যালোচনার মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট করে দিয়েছেন কোন মামলাগুলো হাইকোর্ট সরাসরি গ্রহণ করতে পারবে এবং কোনগুলো পারবে না। উদাহরণ হিসেবে বেসরকারি ব্যাংকের কথা উল্লেখ করে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা বলেন, বেসরকারি কোনো ব্যাংকের বিরুদ্ধে রিট আবেদন চলে না বলে সুপ্রিম কোর্টের বহু রায় রয়েছে। এরপরও সময়ে-সময়ে বিভিন্ন হাইকোর্ট বেঞ্চ বেসরকারি ব্যাংকের বিরুদ্ধে রিট গ্রহণ করে আদেশ দিচ্ছেন। এর ফলে বিচারিক ক্ষেত্রে এক ধরনের বিভ্রান্তি ও বিশৃঙ্খলা তৈরি হচ্ছে। এই ক্ষেত্রটিতে নিয়মতান্ত্রিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হলে রিটের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমবে।

ব্যক্তিগত দেওয়ানি বিরোধ নিয়ে সরাসরি উচ্চ আদালতে আসার প্রবণতাও বাড়ছে। জমির সীমানা নির্ধারণ, জমি দখল বা বিল-বাঁওড়ের দখল নিয়ে প্রায়ই সরাসরি হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করা হচ্ছে। প্রচলিত আইন অনুযায়ী এসব ব্যক্তিগত বিরোধের ক্ষেত্রে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তিকে নিম্ন আদালতে প্রতিকার চাইতে হয়। কিন্তু স্বাভাবিক আইনি পথ এড়িয়ে অনেকেই সরাসরি রিট করায় আদালতের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। বাংলাদেশের সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুসারে হাইকোর্টে পাঁচ ধরনের রিট দায়েরের সুযোগ রয়েছে। আইনি এখতিয়ারহীন কোনো ব্যক্তির বন্দিদশার বৈধতা প্রশ্নে রিট অব হেবিয়াস করপাস, সরকারি কর্মকর্তা বা প্রতিষ্ঠানকে আইনগত দায়িত্ব পালনে বাধ্য করতে রিট অব ম্যান্ডামাস, অধস্তন আদালত বা ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ারবহির্ভূত আদেশ বাতিলে রিট অব সার্টিওরারি, আইনবহির্ভূত কার্যক্রম পরিচালনায় নিষেধাজ্ঞা দিতে রিট অব প্রহিবিশন এবং কোনো ব্যক্তির সরকারি পদে বসার বৈধতা যাচাইয়ে রিট অব কো-ওয়ারেন্টো দায়ের করা যায়।

ঐতিহাসিক ড. মহিউদ্দিন ফারুক বনাম বাংলাদেশ মামলার রায়ের মাধ্যমে দেশে জনস্বার্থে মামলার সাংবিধানিক ভিত্তি রচিত হয়েছিল। সেই রায়ে বলা হয়, কোনো ঘটনায় সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত না হয়েও জনস্বার্থ রক্ষায় যেকোনো সচেতন নাগরিক বা প্রতিষ্ঠান উচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হতে পারেন।

গত কয়েক দশকে জনস্বার্থের রিটের মাধ্যমেই দেশের নদ-নদীগুলো জীবন্ত সত্তা হিসেবে ঐতিহাসিক আইনি স্বীকৃতি লাভ করেছে। নদী দখলদারদের উচ্ছেদ, অবৈধ ইটভাটা বন্ধ, নির্বিচারে পাহাড় কাটা রোধ, নিরাপদ খাদ্য ও জনস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা এবং সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণ আদায়ে হাইকোর্টের রিট নির্দেশ অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। আইনি শৃঙ্খলার মধ্যে থেকে জনস্বার্থের প্রকৃত আবেদনগুলো চালু রেখে ব্যক্তিগত স্বার্থের অপব্যবহার রোধ করা গেলে উচ্চ আদালত আরও দ্রুত সাধারণ মানুষের অধিকার নিশ্চিত করতে পারবে।