শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,

চট্টগ্রাম বিদ্যুৎ খাতে বছরে চুরি ৫০০ কোটি টাকার সম্পদ

তানভীর হাসান তানু

সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২৬, ১২:৫৮ পিএম

চট্টগ্রাম বিদ্যুৎ খাতে বছরে চুরি ৫০০ কোটি টাকার সম্পদ

চাহিদার তুলনায় উৎপাদন ঘাটতিতে চট্টগ্রামে প্রতিদিন ছয় থেকে আটবার লোডশেডিং হচ্ছে। কোথাও বিদ্যুৎ গেলে আধা ঘণ্টা থেকে দেড় ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয় স্থানীয়দের। কোনো কোনো এলাকায় আট থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার নজিরও রয়েছে। চরম এই সংকটের মধ্যেও রাত নামলেই নগর ও আশপাশের এলাকায় দেড় লাখের বেশি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চার্জিং গ্যারেজগুলোতে বেড়ে যায় বিদ্যুতের বিপুল অপব্যবহার।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাবে, একেকটি রিকশার ব্যাটারি চার্জ দিতে দৈনিক গড়ে ছয় থেকে আট ইউনিট বিদ্যুৎ লাগে। দেড় লাখ রিকশার জন্য প্রতিদিন দরকার প্রায় নয় লাখ থেকে ১২ লাখ ইউনিট। প্রতি ইউনিট ১৪ টাকা ৫০ পয়সা মূল্যে দৈনিক এর আর্থিক মূল্য প্রায় এক কোটি ৩০ লাখ থেকে এক কোটি ৭৪ লাখ টাকা। মাসে এই অঙ্ক দাঁড়ায় ৩৯ কোটি থেকে ৫২ কোটি টাকা। বছরে রাষ্ট্রীয় ক্ষতির সম্ভাব্য আর্থিক মূল্য ৪৭৬ কোটি থেকে ৬৩৫ কোটি টাকা।

বাণিজ্যিক এই বিপুল বিদ্যুতের বড় একটি অংশ ব্যবহৃত হচ্ছে আবাসিক মিটারের সংযোগ ঘুরিয়ে। অনুমোদিত লোডের সীমা অমান্য করে কিংবা সরাসরি মূল সঞ্চালন লাইন থেকে অবৈধভাবে তার টেনে চার্জ দেওয়া হচ্ছে। এসব সংযোগ টিকিয়ে রাখতে বিদ্যুৎ বিভাগের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে যোগসাজশ গড়ে উঠেছে গ্যারেজ মালিকদের। নিয়মিত মাসোহারা নেওয়ার বিনিময়ে লাইন বিচ্ছিন্ন না করা, বিচ্ছিন্ন সংযোগ দ্রুত পুনঃস্থাপন ও মিটার বাইপাস করে বিদ্যুৎ ব্যবহারের সুযোগ মিলছে।

চান্দগাঁও বিসিক এলাকার এক গ্যারেজ মালিক জানিয়েছেন, লাইন যাতে কেটে না দেওয়া হয় সেজন্য বিদ্যুৎ বিভাগের লোকজনকে প্রতি মাসে ১০ হাজার টাকা দিতে হয়। আবাসিক মিটারে একসঙ্গে একাধিক যানবাহন চার্জ করাতেই তাদের লাভ বেশি থাকে। অবৈধ সংযোগের এই ব্যবসায় গ্যারেজ মালিক, বিদ্যুৎ সংযোগের মধ্যস্বত্বভোগী দালাল এবং স্থানীয় প্রভাবশালী চক্র প্রত্যক্ষভাবে জড়িত।

আইনগত নিষেধাজ্ঞা থাকলেও জীবিকার তাগিদে এই বাহনের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। রিকশাচালক কামরুল ইসলামের বক্তব্য অনুযায়ী, আধাবেলা চালালেই ১৫ থেকে ১৬টি ট্রিপ দিয়ে দিনে প্রায় এক হাজার টাকা আয় করা যায়। অন্যদিকে সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক শাহজালাল মিয়ার অভিযোগ, প্রধান সড়কে অবৈধ ব্যাটারিচালিত রিকশার দাপটে নিবন্ধিত সিএনজি চালকরা মারাত্মক আর্থিক ক্ষতির শিকার হচ্ছেন।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের সহকারী পুলিশ কমিশনার আমিনুর রশীদ জানিয়েছেন, প্রধান সড়কে এই যান চলাচল বন্ধে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। দ্রুতই সিটি করপোরেশন ও জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের সমন্বয়ে যৌথ সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করা হবে। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চট্টগ্রাম দক্ষিণাঞ্চল বিতরণের প্রধান প্রকৌশলী কামাল উদ্দিন জানান, অবৈধ সংযোগের বিরুদ্ধে তাদের নিয়মিত অভিযান পরিচালিত হয়, তবে আগের তুলনায় বর্তমানে অভিযানের সংখ্যা কিছুটা কমেছে।

চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের মনজুর আলম উল্লেখ করেছেন, বিদ্যুৎ খাতের এই অংশ থেকে বিশাল অঙ্কের অবৈধ লেনদেন চলায় কার্যকর আইনি পদক্ষেপ বাস্তবায়ন জটিল হয়ে পড়েছে। রিকশার ব্যাটারি চার্জ ব্যবস্থাপনা ও ব্যবহৃত বিদ্যুতের মূল্য নিশ্চিত করা সরাসরি রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবস্থাপনার একটি জরুরি বিষয়।