মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,

তরুণ প্রজন্ম প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে ইতিবাচক পৃথিবী গড়ার আহ্বান ড. ইউনূসের

জাতীয় ডেস্ক

সেপ্টেম্বর ২২, ২০২৬, ১২:৫৫ পিএম

তরুণ প্রজন্ম প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে ইতিবাচক পৃথিবী গড়ার আহ্বান ড. ইউনূসের

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের উদ্বোধনী দিনে তরুণ প্রজন্মের শক্তি, প্রযুক্তি ও সামাজিক ব্যবসাকে সমন্বিত করে একটি ইতিবাচক বিশ্ব গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন নোবেলজয়ী অধ্যাপক এবং বাংলাদেশের সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। সোমবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত সামাজিক ব্যবসা, তরুণ ও প্রযুক্তি শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের এক সাইড ইভেন্টের ১১তম আসরে ভাষণদানকালে তিনি এ প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। 

আন্তর্জাতিক ওই ফোরামে বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতা, আন্তর্জাতিক কূটনীতির ভাষা, ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম এবং সামাজিক ব্যবসার বহুমুখী প্রভাব বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন তিনি। মানুষ জন্মগতভাবেই উদ্যোক্তা বলে মন্তব্য করেন তিনি। অনুষ্ঠানে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি ড. খলিলুর রহমান, তিমুর-লেস্তের প্রেসিডেন্ট জোসে রামোস-হোর্তা এবং ব্রাজিলের সামাজিক উন্নয়ন ও সহায়তা, পরিবার ও ক্ষুধামুক্তিমন্ত্রী ওয়েলিংটন দিয়াসসহ আন্তর্জাতিক অঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বরা অংশ নেন। 

বক্তব্যে বিশ্ব কূটনীতির চলমান সংকট নিয়ে কথা বলতে গিয়ে ড. ইউনূস জানান, বর্তমান আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে প্রায়ই শব্দের অন্তর্নিহিত অর্থ হারিয়ে যায় এবং এর ফলে যুদ্ধ কিংবা শান্তির মতো মৌলিক বিষয়গুলো নিয়েও বিপজ্জনক বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের এই অধিবেশন শব্দের প্রকৃত অর্থ ও স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে কার্যকর ভূমিকা পালন করবে এবং বৈশ্বিক সাধারণ মানুষের গভীর আকাঙ্ক্ষা এখন এই অধিবেশনের দিকে নিবদ্ধ রয়েছে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

ক্ষুদ্রঋণের ৫০ বছর পূর্তির মাইলফলক স্মরণ করে যুক্তরাষ্ট্রে পরিচালিত গ্রামীণ আমেরিকা কর্মসূচির ইতিবাচক প্রভাব তুলে ধরেন ড. ইউনূস। তিনি উল্লেখ করেন, উন্নত বিশ্বের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর পাশে কীভাবে দাঁড়ানো সম্ভব তা এই উদ্যোগ সফলভাবে প্রমাণ করেছে। ২০০৮ সালে নিউইয়র্কে সর্বোচ্চ ৫০০ ডলার ঋণসীমা নিয়ে যাত্রা শুরু করা এ কার্যক্রমের আওতায় এখন পর্যন্ত ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি ঋণ বিতরণ সম্পন্ন হয়েছে। এই ঋণের পরিশোধের হার প্রায় শতভাগ এবং হিস্পানিক ও কৃষ্ণাঙ্গ নারীদের পাশাপাশি পুরুষদেরও এই ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। তবে আমানত সংগ্রহ এবং সঞ্চয় ব্যবস্থাপনায় কিছু আইনি প্রতিবন্ধকতা এখনো রয়ে গেছে বলে তিনি জানান।

সামাজিক ব্যবসার তাৎপর্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে নোবেলজয়ী এই অর্থনীতিবিদ বলেন, অর্থ উপার্জন মানুষকে ব্যক্তিগত সুখ দিতে পারে, তবে অন্যের জীবনে ইতিবাচক রূপান্তর ঘটাতে পারা মানবজীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দ। সামাজিক ব্যবসা বাণিজ্যিক মুনাফাকেন্দ্রিক না হয়ে প্রত্যক্ষভাবে মানবজাতির জটিল সমস্যা সমাধানের সর্বজনীন মাধ্যম হিসেবে কাজ করে থাকে। তিনি বাংলাদেশে পরিচালিত সামাজিক ব্যবসার উদাহরণ টেনে জানান, বর্তমানে দেশে ১৫৩টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র পরিচালিত হচ্ছে এবং মুঠোফোনের ডিজিটাল সংযোগ ব্যবহার করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের রোগীরা সরাসরি চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে সেবা গ্রহণ করছেন। 

এছাড়া দেশে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ বিশেষায়িত চক্ষু হাসপাতাল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হয়েছে, যা নিজেদের সঞ্চিত উদ্বৃত্ত অর্থ দিয়েই নতুন নতুন চিকিৎসাকেন্দ্র নির্মাণ করতে সক্ষম হচ্ছে। বিশ্বের তরুণ সমাজের উদ্দেশে ড. ইউনূস বলেন, প্রচলিত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থা একজন তরুণকে মূলত পরনির্ভরশীল চাকরিপ্রত্যাশী হিসেবে গড়ে তোলে, অথচ প্রতিটি মানুষ জন্মগতভাবে উদ্যোক্তা হওয়ার যোগ্যতা নিয়ে পৃথিবীতে আসে। 

এই দৃষ্টিভঙ্গিকে বাস্তবায়ন করতে আগামী ডিসেম্বরে গ্রামীণ ইউনিভার্সিটি তাদের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করতে যাচ্ছে বলে তিনি ঘোষণা দেন। শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য বেকারত্ব এবং শূন্য নেট কার্বন নিঃসরণের তিন শূন্যের পৃথিবী প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে গড়ে ওঠা এই বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় তরুণদের কেবল সনদের পেছনে না ছুটে সরাসরি আত্মনির্ভরশীল উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি করবে। বিশ্বের সামগ্রিক দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও কার্বন নিঃসরণমুক্ত টেকসই ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে বিশ্ববাসীকে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসার উদাত্ত আহ্বান জানান তিনি।