বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর, ২০২৬,

তারেক রহমানের জাতিসংঘ সফর: জাতীয় স্বার্থে বড় পরিবর্তনের আভাস

জাতীয় ডেস্ক

সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২৬, ১০:২২ এএম

তারেক রহমানের জাতিসংঘ সফর: জাতীয় স্বার্থে বড় পরিবর্তনের আভাস

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং জাতীয় স্বার্থের সম্পর্কটি নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে এখন নিউ ইয়র্কে অবস্থান করছেন। বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) সাধারণ বিতর্ক পর্বে তিনি প্রথমবারের মতো ভাষণ দেবেন। এবারের জাতিসংঘ সফর বাংলাদেশের জন্য বেশ কয়েকটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্বে প্রায় চার দশক পর ফিরেছে বাংলাদেশ। ৮১তম এই অধিবেশনে সভাপতিত্ব করছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। এর আগে ১৯৮৬ সালে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী এই দায়িত্ব পালন করেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এটি তারেক রহমানের প্রথম জাতিসংঘ ভাষণ। জিয়া পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে তিনি বিশ্বমঞ্চের এই অধিবেশনে বক্তব্য রাখতে যাচ্ছেন। এর আগে ১৯৮০ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান প্রথম সেখানে ভাষণ দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে ১৯৯৩ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত মোট পাঁচবার বক্তব্য তুলে ধরেছিলেন খালেদা জিয়া।

কূটনৈতিক তৎপরতার অংশ হিসেবে ২৩ সেপ্টেম্বর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমন্ত্রণে একটি নৈশভোজে অংশ নিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ভাষণে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য পাবে রোহিঙ্গা সংকট। ২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অভিযানের পর প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। দীর্ঘ সাত বছরেও এই সংকটের স্থায়ী সমাধান বা টেকসই প্রত্যাবাসন শুরু করা যায়নি। আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা মিললেও রাজনৈতিক পদক্ষেপে স্থবিরতা রয়ে গেছে।

কক্সবাজার ও ভাসানচরের আশ্রয়শিবিরগুলোতে জনসংখ্যার চাপ বাড়ছে। স্থানীয় পরিবেশ ও অর্থনীতির ওপর বিরূপ প্রভাবের পাশাপাশি সেখানে মাদক ও অস্ত্র চোরাচালানসহ নানামুখী নিরাপত্তা সংকট তৈরি হয়েছে। ক্যাম্পের অভ্যন্তরীণ সহিংসতা বৃদ্ধির পাশাপাশি মিয়ানমারের সামরিক জান্তার অসহযোগিতা এই সংকটকে জটিল করে তুলেছে। প্রধানমন্ত্রী ২৩ সেপ্টেম্বর রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আয়োজিত একটি বিশেষ সাইড ইভেন্টে অংশ নিচ্ছেন। সেখানে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে নিরাপদ, টেকসই ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনে বিশ্ব সম্প্রদায়ের কার্যকর সহায়তা চাওয়া হবে। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা আইওএম এই সংকটকে দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

সাধারণ পরিষদের সভাপতিত্ব বাংলাদেশের হাতে থাকায় এবার সাধারণ পরিষদে একটি জোরালো প্রস্তাব তোলার কূটনৈতিক সুযোগ তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) মিয়ানমারের বিরুদ্ধে চলমান মামলা এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের তদন্ত কার্যক্রমে সহযোগিতার বিষয়গুলোও আলোচনায় আসছে। দ্বিতীয় বড় অগ্রাধিকার জলবায়ু পরিবর্তন। বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশের অংশ শূন্য দশমিক ৫ শতাংশেরও কম হলেও দেশটি অন্যতম শীর্ষ ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চল। জার্মানওয়াচের বৈশ্বিক জলবায়ু ঝুঁকি সূচকে বাংলাদেশ ধারাবাহিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় রয়েছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা এক মিটার বাড়লে দেশের প্রায় ১৭ শতাংশ ভূখণ্ড তলিয়ে যাওয়া এবং প্রায় দুই কোটি মানুষের বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী ২৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ মহাসচিব আয়োজিত জলবায়ু বিষয়ক বৈঠকে বক্তব্য দেবেন। পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের জাতীয় পরিকল্পনাসহ অভিযোজন কৌশল বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরা হবে। উন্নত বিশ্বের বার্ষিক ১০০ বিলিয়ন ডলার জলবায়ু তহবিলের প্রতিশ্রুতি এবং বাকুতে অনুষ্ঠিত COP29 সম্মেলনের প্রেক্ষাপটে অনুদানভিত্তিক অর্থায়নের জোরালো দাবি তোলা হবে।

গণতান্ত্রিক উত্তরণের প্রেক্ষাপটও জাতিসংঘে তুলে ধরা হবে। জুলাই ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান, দীর্ঘ দেড় দশকের শাসন ব্যবস্থার অবসান এবং নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের সংস্কার কার্যক্রম বিশ্ব দরবারে উপস্থাপিত হচ্ছে। আইনের শাসন, মানবাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও বিচার বিভাগের সংস্কার সংক্রান্ত বিষয়গুলো ভাষণে স্থান পাবে।

পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর এবারের সফর হবে সংক্ষিপ্ত এবং প্রতিনিধি দল থাকছে মাত্র ৩৫ জনের। অতীতের বড় বহরের বদলে সীমিত পরিসরে কার্যকর দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। দ্বিপক্ষীয় বৈঠক, সাইড ইভেন্ট এবং অংশীদার দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত বোঝাপড়াই এই সফরের মূল লক্ষ্য।