সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২৬, ১১:১৪ এএম
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। স্থানীয় সময় বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের ফাঁকে গুরুত্বপূর্ণ এই আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক সংঘাত দ্রুত কূটনৈতিক সমাধানের দিকে নিয়ে যাওয়ার তাগিদ দিয়েছেন বাংলাদেশের সরকারপ্রধান। একই সঙ্গে আঞ্চলিক উত্তেজনার কারণে হরমুজ প্রণালিতে আটকে পড়া বাংলাদেশের বাণিজ্যিক কনটেইনার জাহাজগুলো নিরাপদে বের করে দেওয়া এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে তেহরানের সরাসরি সহযোগিতা চান তিনি।
উপসাগরীয় অঞ্চলের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। দ্বিপক্ষীয় এই সংলাপে মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধাবস্থা, আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, প্রবাসী বাংলাদেশিদের জীবন ও জীবিকা, বৈদেশিক রেমিট্যান্সের ধারাবাহিক প্রবাহ, সমুদ্রপথে আন্তর্জাতিক পণ্য পরিবহন এবং সম্ভাব্য জ্বালানি বিপর্যয় নিয়ে গভীর উদ্বেগ তুলে ধরে ঢাকা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উল্লেখ করেন যে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন রাষ্ট্রে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মী কঠোর পরিশ্রম করছেন। চলমান সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে তাদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার পাশাপাশি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে সরাসরি বড় ধরনের আঘাত আসবে।
এসব রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের পাঠানো অর্থ তাদের পরিবার চালানোর পাশাপাশি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভিত্তিকে সচল রাখে, ফলে সেখানে যেকোনো অস্থিরতা দেশের জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ। হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা বাংলাদেশের জ্বালানি ও বৈদেশিক বাণিজ্যে তৈরি করছে তীব্র ঝুঁকি। সংঘাতময় পরিস্থিতির কারণে প্রণালিটিতে বাংলাদেশের কয়েকটি কনটেইনারবাহী জাহাজ আটকা পড়ে আছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। চলমান বৈরী পরিস্থিতি শান্ত হয়ে সমাধানের পথ উন্মুক্ত হলে এসব বাণিজ্যিক জাহাজ যাতে কোনো বাধা ছাড়াই নিরাপদে গন্তব্যে ফিরতে পারে সে ব্যাপারে কার্যকর সহযোগিতার আহ্বান জানানো হয়।
জ্বালানি আমদানির সুরক্ষার ওপর বিশেষ জোর দিয়ে বৈঠকে জানানো হয় যে হরমুজ প্রণালির সামরিক সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে আন্তর্জাতিক তেল ও গ্যাস সরবরাহের স্বাভাবিক শৃঙ্খলে মারাত্মক চাপ সৃষ্টি হবে। এর সরাসরি প্রভাবে বাংলাদেশ যেন বড় ধরনের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের কবলে না পড়ে সে বিষয়েও বিস্তারিত তুলে ধরা হয়। বাংলাদেশের এসব কৌশলগত উদ্বেগ ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান মনোযোগ দিয়ে শোনেন এবং তার প্রতিনিধিদলের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বিষয়গুলো গুরুত্বসহকারে নথিভুক্ত করেন।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের নিরপেক্ষ অবস্থান নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়। ঢাকার পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয় যে জাতিসংঘ একটি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ প্ল্যাটফর্ম যেখানে বিবাদমান যেকোনো পক্ষের সঙ্গে স্বাধীনভাবে সংলাপ চালানোর সুযোগ রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার রাষ্ট্রগুলোও বাংলাদেশকে এই নিরপেক্ষ অবস্থানের মর্যাদা ব্যবহার করে শান্তির পক্ষে কার্যকর ভূমিকা পালনের অনুরোধ জানিয়েছে। বাংলাদেশ কোনো পক্ষাবলম্বন না করে নিজস্ব কূটনৈতিক অবস্থান কাজে লাগিয়ে একটি সংবেদনশীল ও নিরপেক্ষ মধ্যস্থতার প্রভাব তৈরি করতে আগ্রহী। এর একমাত্র লক্ষ্য সংঘাত উসকে দেওয়া নয়, বরং কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে স্থায়ী শান্তির পরিবেশ গড়ে তোলা।
বৈঠক প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন জানান যে বাংলাদেশ সবসময় সামরিক উত্তেজনার বদলে শান্তিপূর্ণ মীমাংসার পক্ষে অবস্থান নেয় এবং প্রয়োজনে সব পক্ষের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ অবস্থান বজায় রেখে আলোচনার ক্ষেত্র তৈরিতে সক্রিয় থাকতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের বহুমুখী জাতীয় স্বার্থ জড়িত থাকায় সেখানে বসবাসরত নাগরিক, জ্বালানি নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর সংঘাতের ক্ষতিকর প্রভাব বিবেচনায় নিয়েই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন