সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২৬, ১১:২৯ এএম
সরকারি পরিচালন ব্যয় কমানোর পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে ফ্র্যাঞ্চাইজি এবং লেটার রাইটার সেবা চালু করছে ডাক বিভাগ। প্রাথমিকভাবে দেশের ১২টি নির্দিষ্ট এলাকায় এই সেবা চালুর পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে।
ইতিমধ্যে রাজধানী ঢাকাসহ রাজশাহী ও খুলনায় এই কার্যক্রম শুরু হয়েছে। পর্যায়ক্রমে উপজেলা থেকে গ্রামীণ পর্যায় পর্যন্ত এই সেবা ছড়িয়ে দেওয়া হবে। সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে নতুন কাজের সুযোগ তৈরি করতেই মূলত এই আধুনিকীকরণ শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন ডাক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কাজী আসাদুল ইসলাম। তিনি জানান, ঢাকা, রাজশাহী ও খুলনার পর শিগগিরই পার্বত্য অঞ্চল বান্দরবান এবং হাওরবেষ্টিত সুনামগঞ্জের প্রত্যন্ত শাল্লা এলাকায় পরীক্ষামূলকভাবে এই কার্যক্রম চালু করা হবে।
এর আগে গত ২৯ জুলাই রাজধানীর ডাক ভবনে এই নতুন ফ্র্যাঞ্চাইজি সেবার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। প্রথম দফায় ঢাকার ভেতরে চারটি এবং ঢাকার বাইরে চারটিসহ মোট আটটি ফ্র্যাঞ্চাইজি ডাকঘর চালু করা হয়।
কার্যক্রমটি সম্প্রসারণে মাঠপর্যায়ে তথ্যপ্রযুক্তির অবকাঠামো জোরদার করা হচ্ছে। মেইল প্রসেসিং এবং লজিস্টিক সার্ভিস টেকসই ও আধুনিকীকরণ প্রকল্পের পরিচালক ও অতিরিক্ত জেনারেল ম্যানেজার মো. শাহ আলম ভূঁইয়া জানান, ফ্র্যাঞ্চাইজি ও লেটার রাইটার মডেলটি এখন পরীক্ষামূলকভাবে পরিচালিত হচ্ছে। এটি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে স্থানীয় শিক্ষিত তরুণরা প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোক্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারবেন। এই প্রকল্পের আওতায় সারাদেশে মাঠপর্যায়ে ইতিমধ্যে ছয় হাজার মুঠোফোন ও ৫০০ কম্পিউটার বিতরণ করা হয়েছে। একই সাথে সেবা পরিচালনা সহজ করতে তিনটি বিশেষ সফটওয়্যার তৈরির কাজও এগিয়ে চলছে। নির্বাচনী ইশতেহার ও সরকারের ১৮০ দিনের অগ্রাধিকার কর্মপরিকল্পনার আওতায় ডাক বিভাগ যে আটটি সুনির্দিষ্ট উদ্যোগ হাতে নিয়েছে, ফ্র্যাঞ্চাইজি সেবা তার অন্যতম।
এই উদ্যোগগুলোর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে ডাক বিভাগের পার্সেল পরিবহন সক্ষমতায়। বর্তমানে মৌসুমি ফলমূলসহ নানা ধরনের বাণিজ্যিক পণ্য আগের তুলনায় অনেক কম সময়ে দেশের যেকোনো প্রান্তে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। বিশেষ করে ২০ থেকে ৩০ কেজি ওজনের ফলের ক্রেটসহ বিভিন্ন ভারী পার্সেল ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে জেলা শহরগুলোতে পাঠানো হচ্ছে। এমনকি দুর্গম উপজেলার ক্ষেত্রেও সর্বোচ্চ ৭২ ঘণ্টার মধ্যে নিরাপদে সরবরাহ নিশ্চিত করা হচ্ছে কোনো অভিযোগ ছাড়াই। গ্রাহকসেবা স্বচ্ছ করতে চালু হয়েছে ডিজিটাল পার্সেল ট্র্যাকিং সুবিধা। আগে পরিবহনের সময় কোনো পণ্যের তাৎক্ষণিক অবস্থান জানার সুযোগ ছিল না। এখন প্রতিটি পার্সেলে বারকোড যুক্ত করে অভ্যন্তরীণ ডাক ব্যবস্থার মাধ্যমে তা গ্রহণ ও বিলি করা হচ্ছে, ফলে গ্রাহকরা ঘরে বসেই নিজেদের পণ্যের সর্বশেষ তথ্য জানতে পারছেন। নাগরিক সেবা সহজ করতে আরও কয়েকটি ডিজিটাল সেবার কাজ দ্রুত এগোচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে জমির দলিল, পাসপোর্ট ও ড্রাইভিং লাইসেন্স সরাসরি গ্রাহকের বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া। ই-কমার্স পণ্যের জন্য ক্যাশ অন ডেলিভারি সেবা চালুর প্রক্রিয়াও চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক পার্সেল স্বল্প খরচে দ্রুত পাঠাতে চালু রয়েছে বিশেষ এক্সপ্রেস মেইল সার্ভিস।
চিঠি আদান-প্রদান কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপট তুলে ধরে ডাক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক জানান, ব্যক্তিগত ও দাপ্তরিক চিঠি গ্রহণ, পরিবহন ও বিলি করাই ছিল ডাক বিভাগের মূল কাজ। অন্যান্য কাজ যেমন সঞ্চয়পত্র ও সঞ্চয় ব্যাংক পরিচালনা, শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবই এবং টিকা বিতরণ কিংবা প্রাইজবন্ড বিক্রি সরকারের নির্দেশনায় অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে পালন করা হতো।আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির প্রসারে এখন মানুষ মুহূর্তের মধ্যে ভিডিও কল ও বার্তার মাধ্যমে যোগাযোগ সারছেন। সরকারি দপ্তরগুলোতেও সনাতন কাগজের নথির বদলে ই-নথি ও ডিজিটাল নথির ব্যবহার বাধ্যতামূলক হওয়ায় দাপ্তরিক চিঠিপত্র কমেছে। তবে ব্যক্তিগত চিঠি কমলেও অনলাইন কেনাকাটা বৃদ্ধির কারণে ডাক বিভাগের সামনে ই-কমার্স লজিস্টিকসের বিশাল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বর্তমানে নাগরিকরা অনলাইনে যেসব পণ্য কেনাবেচা করছেন, তার সবই ডাকদ্রব্য হিসেবে গণ্য। চিঠির স্থান এখন দখল করেছে পার্সেল ও পণ্য সরবরাহ। তাই মূল ডাক সেবাকে এই লজিস্টিকস খাতের উপযোগী করে ঢেলে সাজানো হচ্ছে।
ডাক বিভাগের ব্র্যান্ড নাম ব্যবহার করে কোনো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান চুক্তির মাধ্যমে পণ্য সংগ্রহ ও বিতরণের দায়িত্ব নিলে তা ফ্র্যাঞ্চাইজি হিসেবে গণ্য হবে। অন্যদিকে কোনো ব্যক্তি এককভাবে বা নিজস্ব উদ্যোগে এই দায়িত্ব পালন করলে তাকে লেটার রাইটার বলা হবে। এই দ্বৈত কাঠামোর মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোক্তার পাশাপাশি ব্যক্তি পর্যায়েও ব্যাপক কর্মসংস্থান নিশ্চিত হবে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন