সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,
সফল কৃষি উদ্যোগ

মাশরুম চাষে ভাগ্যবদল: খুলনায় তরুণ উদ্যোক্তার চমক

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৬, ০৩:১৪ পিএম

মাশরুম চাষে ভাগ্যবদল: খুলনায় তরুণ উদ্যোক্তার চমক

খুলনার ফুলতলা উপজেলার মশিয়ালী গ্রামের একটি জুটমিলের সাধারণ বদলি শ্রমিকের পরিবারে ২০০৬ সালে শুরু হয়েছিল অভাব জয়ের এক নীরব লড়াই। সংসারের টানাপোড়েনের মধ্যে জাতিসংঘের একটি কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় বিনা মূল্যে পাওয়া সামান্য কিছু স্পন বীজ নিয়ে মাশরুম চাষ শুরু করেছিলেন মোহাম্মদ ওলিউর রহমান। কোনো জমানো নগদ পুঁজি ছাড়া শুরু হওয়া সেই উদ্যোগ দুই দশকের ব্যবধানে বদলে দিয়েছে পুরো পরিবারের ভাগ্য। টিনের ছাপড়া ঘর পেরিয়ে গড়ে উঠেছে চারতলা ভিতের পাকা বাড়ি। খামারটিতে বর্তমানে স্থায়ী সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৮ থেকে ২৯ লাখ টাকায়।

বাবার হাতে গড়া সেই খামারকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন অনার্স তৃতীয় বর্ষের ২৩ বছর বয়সী শিক্ষার্থী নাঈম। এলাকার মানুষের কাছে তিনি এখন পরিচিত ‍‍`মাশরুম নাঈম‍‍` নামে। প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার পাশাপাশি খামারে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি প্রয়োগ করে তিনি প্রতি মাসে গড়ে দেড় লাখ টাকার বেশি মূল্যের মাশরুম ও বীজ বিক্রি করছেন। মৌসুমে এই বিক্রির পরিমাণ আরও বৃদ্ধি পায়। মাশরুম চাষে সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো নামমাত্র পুঁজিতে ঘরের এক কোণেও এর উৎপাদন শুরু করা যায়। মাত্র এক হাজার টাকা বিনিয়োগ করেই যে কেউ বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করতে পারেন। খামার থেকে প্রতিটি প্রস্তুতকৃত স্পন প্যাকেট বিক্রি হয় ৫০ টাকায়। বিশটি প্যাকেট একটি ঘরের মেঝেতে রেখে আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণের জন্য নিয়মিত পানির ঝাপটা দিলেই দুই থেকে আড়াই সপ্তাহের মধ্যে মাশরুমের ফলন চলে আসে। শীতকালে সময় লাগে আরও কম, মাত্র দেড় সপ্তাহ। প্রতিটি প্যাকেট থেকে দফায় দফায় মোট চার থেকে পাঁচবার ফলন তোলা যায় এবং গড়ে ৫০০ গ্রাম পর্যন্ত তাজা মাশরুম পাওয়া যায়। স্থানীয় ও জাতীয় বাজারে প্রতি কেজি তাজা ওয়েস্টার মাশরুম বিক্রি হচ্ছে ৩০০ টাকায়। ফলে মাত্র ৫০ টাকা ব্যয়ে একটি প্যাকেট থেকে প্রায় ১৫০ টাকার মাশরুম পাওয়া যায়, যাতে সব খরচ বাদ দিয়ে চাষির নিশ্চিত মুনাফা থাকে অন্তত ৫০ শতাংশ।

পুঁজি আরও কম থাকলে খড় প্রক্রিয়াজাতকরণ পদ্ধতিতে সিলিন্ডার বানিয়ে উৎপাদন খরচ আরও অর্ধেকে নামিয়ে আনা সম্ভব। দেড়শ টাকায় এক কেজি মাতৃবীজ বা মাদার স্পন কিনে তা দিয়ে তৈরি করা যায় আটটি খড়ের সিলিন্ডার। প্রতিটি সিলিন্ডার থেকে শীত মৌসুমে পাওয়া যায় প্রায় এক কেজি মাশরুম। ঘরের অতিরিক্ত উষ্ণতা কমাতে শেডের চালে সাধারণ টিনের বদলে ব্যবহার করা হয়েছে তাপনিরোধক অ্যাসবেস্টস টিন। উৎপাদন ব্যবস্থাকে শ্রমমুক্ত করতে ঘরের ভেতরে স্থাপন করা হয়েছে স্বয়ংক্রিয় স্প্রিংকলার বা পানি ছিটানোর পাইপলাইন, যা মোবাইল ফোনের নির্দেশনায় বা বৈদ্যুতিক সুইচের মাধ্যমে দূর থেকেই নিয়ন্ত্রণ করা যায়। খামারের মূল শেডগুলোর ভেতরে ওয়েস্টার ও মিল্কি মাশরুমের পাশাপাশি ফলানো হচ্ছে বিশ্বের দ্বিতীয় শীর্ষ মূল্যবান ঔষধি মাশরুম গ্যানোডার্মা লুসিডাম, যা স্থানীয়ভাবে ‍‍`ঋষি মাশরুম‍‍` নামে সুপরিচিত। তীব্র পুষ্টিগুণ ও রোগ প্রতিরোধক বৈশিষ্ট্যের কারণে বিশ্ববাজারে এই মাশরুমের শুকনা প্রতি কেজির আন্তর্জাতিক দর প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ ডলার বা সাড়ে ছয় হাজার টাকার বেশি। সাধারণত একটি বীজ প্যাকেট থেকে দুইবার ফলন এলেও শক্তিশালী বীজের কারণে তৃতীয়বারের মতো সফলভাবে ফলন সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে। মাশরুমের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সহায়ক ভূমিকা রয়েছে এবং প্রক্রিয়াজাত পাউডার বিভিন্ন স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ব্যবহৃত হচ্ছে।

খামারের উপার্জিত অর্থ পুনর্বিনিয়োগ করে নাঈম এখন মাশরুমভিত্তিক বৃহৎ খাদ্য ও প্রসাধন কারখানা গড়ার উদ্যোগ নিয়েছেন। পাশের একটি ভরাট করা পুকুরের জমিতে তৈরি হচ্ছে এই প্রক্রিয়াজাতকরণ ইউনিট, যেখানে উৎপাদিত মাশরুম দিয়ে সাবান, টুথপেস্ট, শ্যাম্পু, ফেসওয়াশ এবং পুষ্টিকর বিস্কুট, কেক ও চানাচুর তৈরি হবে। একই সঙ্গে খামারের উচ্ছিষ্ট জৈব বর্জ্য কাজে লাগিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে টেকসই ভার্মিকম্পোস্ট বা কেঁচো সার উৎপাদন কেন্দ্র।