সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি ৭ মাসে তিন দফায় বাড়ল কত?

জাতীয় ডেস্ক

সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৬, ০৩:৫৯ পিএম

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি ৭ মাসে তিন দফায় বাড়ল কত?

ছবি: দিনাজপুর টিভি গ্রাফিক্স

দেশের বাজারে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম আরেক দফা বাড়িয়েছে সরকার। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ডিজেল, কেরোসিন, অকটেন ও পেট্রোলের দাম প্রতি লিটারে ২০ টাকা করে বৃদ্ধি করা হয়েছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা এক আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপনে এই মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণা দেওয়া হয়। রোববার দিবাগত রাত ১২টা অর্থাৎ সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) প্রথম প্রহর থেকেই এই নতুন বর্ধিত দর দেশব্যাপী কার্যকর হয়েছে। বর্তমান সরকারের সাত মাসের মেয়াদে এ নিয়ে মোট তিন দফা জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হলো।

এই সাত মাসের ব্যবধানে দেশে গড়ে প্রতি লিটার জ্বালানি তেলে প্রায় ৪০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে। এর আগে বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের শাসনামলে জ্বালানি তেল কিংবা বিদ্যুতের দাম একবারও বাড়ানো হয়নি। মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ প্রজ্ঞাপন অনুসারে, প্রতি লিটার ডিজেলের দাম পূর্বের ১১৫ টাকার পরিবর্তে নতুন করে ১৩৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সাথে প্রতি লিটার পেট্রোলের দাম ১৪০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৬০ টাকা এবং অকটেনের দাম ১৪৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৬৫ টাকা নির্ধারণ করেছে সরকার। এছাড়া প্রতি লিটার কেরোসিনের নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১৫৫ টাকা, যা ইতিপূর্বে ১৩৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল।এর আগে চলতি বছরের ১৮ এপ্রিল প্রথম দফায় জ্বালানির দামে বড় ধরনের সমন্বয় এনেছিল সরকার।

সে সময় ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১৫ টাকা বাড়িয়ে ১০০ টাকা থেকে ১১৫ টাকা করা হয়। একই সাথে অকটেনের দাম ১২০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৪০ টাকা, পেট্রোলের দাম ১১৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা এবং কেরোসিনের দাম ১১২ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৩০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। পরবর্তীতে দেড় মাসের ব্যবধানে গত ৩১ মে দ্বিতীয় দফায় আবারও অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিনের দাম লিটারে আরও পাঁচ টাকা করে বৃদ্ধি করা হয়।উড়োজাহাজের জ্বালানি এবং ভারী শিল্পকারখানার জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রেও চলতি বছর দফায় দফায় দাম বেড়েছে। গত ৭ এপ্রিল সরকারের পক্ষ থেকে জেট ফুয়েলের মূল্য বৃদ্ধি করা হয়। 

এতে দেশের অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট পরিচালনার জন্য প্রতি লিটার জেট ফুয়েলের দর ২২৭ টাকা আট পয়সা নির্ধারণ করা হয়। আন্তর্জাতিক রুটের ফ্লাইটের ক্ষেত্রে জেট ফুয়েলের মূল্য ধরা হয় প্রতি লিটার এক দশমিক ৪৮০৬ মার্কিন ডলার। এর পরপরই গত ১২ এপ্রিল বিদ্যুৎকেন্দ্র ও শিল্পে ব্যবহৃত ফার্নেস অয়েলের দাম প্রতি লিটার ৭০ টাকা ১০ পয়সা থেকে এক লাফে বাড়িয়ে ৯৪ টাকা ৬৯ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছিল। আন্তর্জাতিক বাজারের ব্যাপক অস্থিরতার প্রেক্ষাপট তুলে ধরে জাতীয় সংসদে ৩০০ বিধিতে এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিয়েছিলেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।তিনি জানিয়েছিলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে গত ফেব্রুয়ারির গড় দরের তুলনায় মার্চে ডিজেলের মূল্য ৯৮ শতাংশ এবং অকটেনের মূল্য ২৬ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। 

এই পরিস্থিতিতে দেশের অর্থনীতিকে সুরক্ষা দিতে সরকার নিজস্ব কোষাগার থেকে বিশাল অঙ্কের আর্থিক ভর্তুকি প্রদান করছে। জ্বালানিমন্ত্রীর তুলে ধরা সরকারি হিসাব অনুযায়ী, মার্চ থেকে জুন প্রান্তিকে জ্বালানি খাতে সরকারের মোট ভর্তুকির প্রয়োজনীয়তা দাঁড়ায় ১৬ হাজার ৪৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে এককভাবে ডিজেলে ১৫ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা এবং অকটেনে ৬৩৬ কোটি টাকা ভর্তুকি গুনতে হয়েছে। এর বাইরে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান পেট্রোবাংলার মাধ্যমে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি আমদানির জন্য এপ্রিল থেকে জুন প্রান্তিকে অতিরিক্ত আরও ১৫ হাজার ৭৭ কোটি টাকা ভর্তুকির প্রয়োজন পড়ে।বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে জ্বালানি তেলের বার্ষিক মোট চাহিদা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭৫ লাখ টন।

এই চাহিদার সিংহভাগ অর্থাৎ প্রায় ৭৫ শতাংশই এককভাবে ডিজেল। অবশিষ্ট ২৫ শতাংশ চাহিদা মেটানো হয় পেট্রোল, অকটেন, কেরোসিন, উড়োজাহাজের জেট ফুয়েল ও বিদ্যুৎকেন্দ্রের ফার্নেস অয়েলসহ অন্যান্য জ্বালানি পণ্য দিয়ে।দেশে জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণের আইনি প্রক্রিয়াও পৃথক কাঠামোর আওতাধীন।উড়োজাহাজে ব্যবহৃত জেট ফুয়েল এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত ফার্নেস অয়েলের মূল্য সমন্বয় করে থাকে স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। 

অন্যদিকে নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে সরাসরি প্রজ্ঞাপন জারি করে গণপরিবহন ও কৃষিতে ব্যবহৃত ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম নির্ধারণ করে থাকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ।বাংলাদেশের ইতিহাসে এক দফায় জ্বালানি তেলের সর্বোচ্চ মূল্যবৃদ্ধির নজির তৈরি হয়েছিল ২০২২ সালের আগস্ট মাসে। সে সময় রাশিয়া ও ইউক্রেনের যুদ্ধ শুরুর পর আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিতিশীলতার মুখে দেশে এক লাফে ডিজেলের দাম সাড়ে ৪২ শতাংশ বাড়িয়ে প্রতি লিটার ১১৪ টাকা করা হয়েছিল।