সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৬, ০৩:২০ পিএম
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম (১৩) হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে তদন্তে নতুন চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। এক আসামিকে নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদ এবং তার ব্যবহৃত মুঠোফোনে আসা একটি কলের সূত্র ধরে আরও দুজনকে নিজেদের হেফাজতে নিয়েছে পুলিশ। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে একটি দামি আইফোন এবং পাঁচ হাজার টাকা ধার দেওয়া নিয়ে সৃষ্ট বিরোধের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আটক হওয়ার পর শুরুতে হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ত থাকার বিষয়টি সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছিলেন অভিযুক্ত তুহিন। পরবর্তীতে জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে তিনি ঘটনায় নিজের সম্পৃক্ততার কথা সরাসরি স্বীকার করেন। তবে ঘটনার সাথে জড়িত অন্যান্য সহযোগীদের নাম প্রকাশে অনীহা দেখান তিনি। তদন্তকারী কর্মকর্তাদের তিনি জানান, অপর সহযোগীদের নাম কোনো পরিস্থিতিতেই প্রকাশ না করার বিষয়ে তিনি অন্যদের কাছে ওয়াদাবদ্ধ ছিলেন।
পুলিশ জানিয়েছে, গত শনিবার সকাল নয়টার দিকে তুহিনকে আটকের সময় কিশোরের মরদেহ উদ্ধারের খবর তাদের জানা ছিল না। পরবর্তীতে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে মরদেহ উদ্ধারের সুনির্দিষ্ট তথ্য পায় পুলিশ। তুহিনকে থানা হেফাজতে রেখে জিজ্ঞাসাবাদের সময় তার মুঠোফোনে বারবার একটি নির্দিষ্ট নম্বর থেকে কল আসছিল। অনুসন্ধানে দেখা যায়, নিহত অপ্রতিমের বাবার বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত এক কিশোর কর্মচারী ওই ফোনগুলো করছিল। বিষয়টি গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের নজরে আসার পরপরই অভিযান চালিয়ে সেই কিশোরকে তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়। আটকের সময় তার পরনে নিহত অপ্রতিমের বাবার প্রতিষ্ঠানের নামাঙ্কিত টি-শার্ট ছিল।
পরবর্তীতে তুহিনের দেওয়া সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে ঘটনায় জড়িত সন্দেহে আরও একজনকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, জিজ্ঞাসাবাদে একটি আইফোনের পাশাপাশি পাঁচ হাজার টাকা ধার দেওয়া নিয়ে দুই কিশোরের মধ্যে বিরোধের কথা জানা গেছে। নিহত অপ্রতিমের বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ারের মোবাইল ফোনের যন্ত্রাংশ বিক্রির প্রতিষ্ঠান ইয়েসটেকে ওই কিশোর কাজ করত। সেখান থেকেই তাদের মধ্যে পরিচয় গড়ে ওঠে এবং অপ্রতিম তাকে ব্যক্তিগতভাবে পাঁচ হাজার টাকা ধার দিয়েছিল।
ধার দেওয়া সেই টাকা ফেরত চাওয়াকে কেন্দ্র করে দুজনের মধ্যে তীব্র বিরোধ সৃষ্টি হয়। তদন্তকারীদের প্রাথমিক ধারণা, পাওনা টাকা বারবার ফেরত চাওয়ায় অপ্রতিমের ওপর ওই কিশোর কর্মচারীর চরম ক্ষোভ ও বিরক্তি তৈরি হয়েছিল। একপর্যায়ে অপ্রতিমকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিলে সেই ধারের টাকা আর পরিশোধ করতে হবে না—এমন ভাবনাও তার মাথায় এসে থাকতে পারে। তবে নিছক এই আর্থিক বিরোধই হত্যাকাণ্ডের মূল ও একমাত্র কারণ কি না, তা এখনও চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। পুরো বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তদন্তাধীন রয়েছে।
এর আগে গত শুক্রবার বাসা থেকে স্বাভাবিকভাবে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় ১৩ বছর বয়সী এই স্কুলছাত্র। সন্তান বাসায় ফিরে না আসায় পরিবারের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে স্থানীয় থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়। নিখোঁজ হওয়ার প্রায় ২০ ঘণ্টা পর গত শনিবার দুপুরে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ ফটক সংলগ্ন বিনোদন পার্কের পাশে দক্ষিণ সানন্দা এলাকার একটি নির্জন জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। উদ্ধারকৃত স্থানটি নিহতের বাসা থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের মূল মোটিভ এবং এর সাথে নেপথ্যে আরও কেউ জড়িত রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হতে জোর তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে পুলিশ।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন