সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৬, ০৩:৫৯ পিএম
দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলার বড়হাট গ্রামের মাঠে উচ্চফলনশীল নতুন জাতের হাইব্রিড ঢেঁড়স আবাদ করে ব্যাপক সাফল্য পেয়েছেন স্থানীয় প্রান্তিক চাষিরা । দীর্ঘ চার দশক ধরে প্রচলিত কৃষিকাজে যুক্ত থেকেও এমন দ্রুতবর্ধনশীল ও রোগমুক্ত ফলন আগে দেখেননি বলে জানিয়েছেন এলাকার কৃষকরা ।
অনুকূল উৎপাদন দেখে আশপাশের কৃষকরাও এখন এই নতুন জাতের আবাদে আগ্রহী হয়ে উঠছেন ।
মালভেসি পরিবারের সপুষ্পক উদ্ভিদ ঢেঁড়সের আদি নিবাস আফ্রিকার ইথিওপিয়ার উচ্চভূমি এলাকায় । সেখানে উদ্ভব হয়ে লোহিত সাগর পেরিয়ে আরব ও ইউরোপ হয়ে ভারতীয় উপমহাদেশে ছড়িয়ে পড়া এই সবজিটিতে প্রচুর ভিটামিন সি, আয়োডিন ও প্রয়োজনীয় খনিজ উপাদান রয়েছে । নিয়মিত এই সবজি গ্রহণে রক্তে ইনসুলিনের মাত্রা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি হজমশক্তি বৃদ্ধি পায় । মাঠপর্যায়ে বীরগঞ্জের বড়হাট ময়নামতী সবজি উৎপাদক দলের চাষিরা ২০২১ সালে বেসরকারি সংস্থা ওয়ার্ল্ড ভিশনের সহযোগিতায় দল গঠন করেন । পরের বছর এ আর মালিক সিডস প্রাইভেট লিমিটেডের সাথে যুক্ত হয়ে পরীক্ষামূলকভাবে নান ২০০৬ নামের উচ্চফলনশীল হাইব্রিড ঢেঁড়সের বীজ সংগ্রহ করেন দলের সভাপতি মো. সামসুল হক । সুসংগঠিত দলীয় চাষাবাদের সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে এই দলটি ২০২২ সালে সেরা গুচ্ছ বা সমবায় কৃষি বিভাগে জাতীয় কৃষি সম্মাননাও অর্জন করে । চাষি সামসুল হক চলতি মৌসুমে তার ১৫ শতক জমিতে ৩০০ গ্রাম বীজ বপন করেন । এপ্রিল মাসের তীব্র দাবদাহের মধ্যে বীজ রোপণ করা হলেও শতভাগ চারা গজায় । জমি প্রস্তুতের সময় ২০ কেজি সুষম রাসায়নিক সার প্রয়োগের পর লাইন থেকে লাইনের দূরত্ব ২৩ ইঞ্চি এবং চারা থেকে চারার দূরত্ব ১০ ইঞ্চি রেখে রোপণ করা হয় । মাঠের অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশনের জন্য তৈরি করা হয় পরিকল্পিত নালা । চারা গজানোর মাত্র ৪০ দিনের মাথায় গাছে ফুল আসতে শুরু করে এবং ৫০ দিনের মাথায় শুরু হয় নিয়মিত ফল সংগ্রহ । গাছে ফুল ফোটার পর প্রতিটি ফুল ঝরে পড়ার সাথে সাথে নতুন ফল দ্রুত বাড়ে এবং প্রতিদিন গড়ে পর্যায়ক্রমে ফল তোলা যায় । প্রচলিত অন্যান্য জাতের ঢেঁড়সে হলুদ মোজাইক ভাইরাস, পাতা কোঁকড়ানো এবং ফল ছিদ্রকারী পোকার ব্যাপক উপদ্রব থাকে । কিন্তু এই নতুন জাতটিতে পোকা ও ভাইরাসের আক্রমণ প্রায় নেই বললেই চলে, যার ফলে জমিতে কীটনাশক ব্যবহারের প্রয়োজন পড়ে না বললেই চলে । এমনকি বর্ষায় এক হাঁটু পানির নিচে ডুবে থাকার পরও গাছের কোনো ক্ষতি হয়নি । সাধারণ জাতের ঢেঁড়স গাছে বেশি দিন থাকলে শক্ত ও আঁশযুক্ত হয়ে পড়ে এবং গায়ে অতিরিক্ত শুয়ো বা রোঁয়া থাকায় হাতমোজা ছাড়া তোলা যায় না । বিপরীতে এই জাতটির ফল বেশ নরম, অত্যন্ত মিষ্টি এবং গাছে আকার বড় হলেও ভেতরের শাঁস কচি ও রসালো থাকে । সংগ্রহের পর ঘরে দুই থেকে তিন দিন সংরক্ষণ করলেও এর সতেজতা ও ঔজ্জ্বল্য নষ্ট হয় না ।
উৎপাদন খরচের তুলনায় এই জাতের লাভ প্রায় দ্বিগুণ । ১৫ শতক জমিতে বীজ, সার ও শ্রমিক বাবদ মোট খরচ হয়েছিল মাত্র ৬ হাজার টাকা । অথচ ফলন তোলার মাঝামাঝি সময়েই বাগান থেকে ১৫ হাজার টাকার বেশি ঢেঁড়স বিক্রি হয়ে গেছে । পাইকারি মোকামে সাধারণ জাতের ঢেঁড়স যেখানে ২০ থেকে ২৫ টাকায় বিক্রি হয়, সেখানে এই জাতের ঢেঁড়স প্রতি কেজি ৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে । গড়ে ১৫ থেকে ২০টি ঢেঁড়সেই ওজন এক কেজিতে পৌঁছায় । পুরো মৌসুমে এই সামান্য জমি থেকেই ২০ হাজার টাকার বেশি ঢেঁড়স বিক্রির প্রত্যাশা করা হচ্ছে, যা আরও দুই মাস ধরে টানা তোলা যাবে ।
উৎপাদিত সবজি বিক্রির জন্য কৃষকদের দূরে যেতে হয় না । ময়নামতী কৃষক দলের নিজস্ব সংগ্রহ কেন্দ্রে ডিজিটাল স্কেলে মেপে সরাসরি পাইকারদের ট্রাকে সবজি তুলে দেওয়া হয় । বড়হাট ময়নামতী সবজি উৎপাদক দলের সাধারণ সম্পাদক দীপক চন্দ্র মহন্ত জানান, দলের মাধ্যমে সংঘবদ্ধভাবে আবাদ ও বাজারজাত করায় কৃষকরা ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন । বীজ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের এরিয়া ম্যানেজার মো. লুৎফর রহমান জানান, পরিবর্তিত জলবায়ু ও উচ্চ তাপমাত্রার সাথে মানানসই এই জাতটি প্রতি গাছে ৩০ থেকে ৩৫টি ফল নিশ্চিত করে । মাঠ পর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে সফল মাঠ দিবস উদযাপনের পর স্থানীয় কৃষকরা আগামী মৌসুমে এক বিঘা করে জমিতে এই জাতের আবাদ সম্প্রসারণের চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছেন ।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন