সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,
সফল কৃষি উদ্যোগ

সূর্যমুখী চাষে চার একরে দ্বিগুণ লাভের হাতছানি

কৃষি ডেস্ক

সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৬, ০৩:৪৫ পিএম

সূর্যমুখী চাষে চার একরে দ্বিগুণ লাভের হাতছানি

সৌদি আরবে সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে দেশে ফিরে নিঃসঙ্গতায় ভুগছিলেন ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার দক্ষিণ চর চান্দিয়া গ্রামের যুবক মো. আবু সাঈদ রুবেল । প্রবাসে থাকা বাবার পাঠানো রেমিট্যান্সের অর্থে কেনা ১৯ একর পৈতৃক জমি পড়ে ছিল উপকূলের বিস্তীর্ণ চরে । অধিকাংশ স্থানীয় বাসিন্দা বিদেশে থাকায় উপকূলীয় এ অঞ্চলে কৃষিকাজে মানুষের সম্পৃক্ততা ছিল অত্যন্ত কম । সোনাগাজী উপজেলা কৃষি অফিসের উপসহকারী কর্মকর্তা আশরাফ হোসেন পাটোয়ারীর সাথে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের এক মাঠ দিবসে পরিচয়ের পর কৃষি প্রশিক্ষণে অংশ নেন তিনি । যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর থেকে ভুট্টা ও সয়াবিন চাষের ওপর সাত দিনের প্রশিক্ষণ শেষে প্রথমে বোরো ধান এবং পরবর্তীতে তেলজাতীয় ফসল আবাদে নামেন । সেই উদ্যোগের পথ ধরে ২০২০ সালে জাতীয়ভাবে সেরা মাঠ ফসলের স্বীকৃতিও অর্জন করেন এই চাষি ।

প্রবাসফেরত সেই উদ্যোক্তা এখন বাণিজ্যিক সূর্যমুখী চাষে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন । গত পাঁচ বছর ধরে কৃষিতে সক্রিয় থাকার পর তিন বছর আগে মাত্র এক বিঘা জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে সূর্যমুখী চাষ শুরু করেছিলেন রুবেল । পরের ধাপে দুই বিঘা এবং চলতি মৌসুমে তা বাড়িয়ে চার একর বা প্রায় নয় বিঘা জমিতে সম্প্রসারিত করেছেন । এই জমিতে তিনি রোপণ করেছেন আমদানি করা নতুন উচ্চফলনশীল হাইব্রিড জাত RDX 275, যা সোনাগাজী উপজেলায় প্রথমবারের মতো আবাদ হয়েছে । চারা রোপণের আগে বাজার থেকে কেনা বীজ নোহিন নামের তরল শোধনকারী উপাদানে ২৫ মিনিট ভিজিয়ে রেখে ছায়ায় দুই থেকে তিন ঘণ্টা শুকিয়ে সরাসরি মাঠে বপন করা হয় । জমি প্রস্তুতের জন্য পরপর তিনবার গভীর চাষ দিয়ে বিঘা প্রতি ৪০ কেজি ট্রাইকো কম্পোস্ট ও জৈব সার, দুই কেজি ম্যাগনেসিয়াম, সালফার, ডিএপি ও টিএসপির সুষম মিশ্রণ প্রয়োগ করতে হয় । বীজ বপনের পর মাত্র সাত থেকে আট দিনের মাথায় চারা গজায় । চারা গজানোর ১৫ থেকে ১৬ দিনের মাথায় কোদাল দিয়ে গোড়ার মাটি আলগা ও ঝুরঝুরে করে দেওয়া হয় । এর ঠিক ১৫ দিন পর জমিতে হালকা প্রথম সেচ দিতে হয় । চারাগুলোর চার ইঞ্চি দূরত্বে সারি করে মাটি তুলে নালার মতো তৈরি করে সেখানে ইউরিয়া প্রয়োগ ও পানি দেওয়া হয় । গাছ রোপণের ২৫ থেকে ২৬ দিন পর এবং গাছে ফুল ফোটার ঠিক আগ মুহূর্তে আরও দফায় দফায় সেচ দিতে হয় । পুরো মৌসুমে চারবার পরিমিত সেচ দিলে ফুলের গঠন মজবুত হয় এবং বীজে তেলের মাত্রা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পায় । স্থানীয় খাল ও নালা থেকে পানি সেচের ব্যবস্থা করা হলেও উপকূলীয় চরাঞ্চলে সমন্বিত ও সুপরিকল্পিত সরকারি সেচ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা গেলে এ অঞ্চলে তেল ফসলের উৎপাদন বহুগুণ বাড়ানো সম্ভব ।

উপকূলীয় চরাঞ্চলে মাটির লবণাক্ততা সূর্যমুখী চাষের ক্ষেত্রে একটি বড় চ্যালেঞ্জ । যে অংশে লবণাক্ততার মাত্রা বেশি, সেখানে গাছের উচ্চতা কিছুটা খাটো হলেও মূল কাণ্ড বা ডাটা বেশ মোটা হয়েছে । তবে ট্রাইকো কম্পোস্ট ও ভার্মিকম্পোস্টের পাশাপাশি জিপসাম এবং দস্তা ব্যবহার করে লবণাক্ততা অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা গেছে । গাছের গোড়া থেকে বের হওয়া বাড়তি শাখা ফুল বা কুশি কেটে ফেলা হয়েছে, যাতে মূল ফুলটি পর্যাপ্ত খাদ্য উপাদান পেয়ে আকারে বড় হতে পারে । বর্তমানে তার চার একর জমিতে প্রায় ৫৩ হাজার সুস্থ সূর্যমুখী গাছ দাঁড়িয়ে রয়েছে  ডিসেম্বর থেকে জানুয়ারি মাসে বীজ বোনার পর এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময়ে ফসল ঘরে তোলা যায় । ফলে মাত্র সাড়ে তিন থেকে চার মাসের মধ্যেই পুরো উৎপাদন চক্র সম্পন্ন হয় । প্রতিটি ফুল থেকে গড়ে ১০০ থেকে শুরু করে ২০০ থেকে ২৫০ গ্রাম পর্যন্ত বীজ পাওয়া যায় । গড়ে প্রতি ফুল থেকে ১০০ গ্রাম হারে বীজ হিসাব করলেও ৫৩ হাজার গাছ থেকে প্রায় ৫ হাজার ৩০০ কেজি সূর্যমুখী বীজ উৎপাদিত হবে । এই পরিমাণ বীজ মাড়াই করে প্রতি কেজিতে ৩৫০ গ্রাম হিসেবে অন্তত ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার লিটার বা প্রায় দুই টন কোল্ড-প্রেসড বিশুদ্ধ ভোজ্যতেল পাওয়ার আশা করা হচ্ছে । উৎপাদিত তেল স্থানীয় পর্যায়ে খামার থেকেই প্রতি লিটার ২৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে । মধ্যস্বত্বভোগী ও পাইকাররা তা কিনে বাজারে ৩৫০ টাকা লিটার দরে বিক্রি করে বাড়তি মুনাফা করছেন । বীজ থেকে তেল নিষ্কাশনের পর অবশিষ্ট খৈল স্থানীয় মাছ ও ডেইরি খামারিদের কাছে উচ্চমূল্যে বিক্রি করা হয়, যা মাছের রেনু পোনার অত্যন্ত পুষ্টিকর খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয় । এছাড়া গাছের শুকনা কাণ্ড ও পাতা রান্নার উৎকৃষ্ট জ্বালানি হিসেবে স্থানীয়দের কাছে বিক্রি করে বাড়তি অর্থ আয় হচ্ছে । রোগবালাই ব্যবস্থাপনায় চারা অবস্থায় ছত্রাকনাশক এবং কাণ্ড ছিদ্রকারী পোকা দমনে ক্যারাটে বা সুমিথিয়ন ব্যবহার করা হয়েছে । জমিতে লেডিবার্ড বিটলের মতো উপকারী বন্ধু পোকা প্রাকৃতিক উপায়ে ক্ষতিকর পোকা ধ্বংস করছে এবং মৌমাছি পরাগায়নে ভূমিকা রাখছে ।

চার একর জমিতে চাষাবাদ, সার, বীজ ও শ্রম বাবদ রুবেলের মোট খরচ হয়েছে ১ লাখ ৫৭ হাজার টাকা, যা ফসল কাটা ও মাড়াই পর্যন্ত সর্বোচ্চ ১ লাখ ৬০ হাজার টাকায় দাঁড়াবে । বিপরীতে উৎপাদিত তেল, খৈল ও জ্বালানি বিক্রি করে সাড়ে পাঁচ লাখ টাকার বেশি আয় হবে, যার ফলে মাত্র চার মাসের পরিশ্রমে কৃষকের নিট মুনাফা থাকবে অন্তত আড়াই থেকে তিন লাখ টাকা । এলাকার বেকার যুবকদের কৃষিতে সম্পৃক্ত করে কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি কৃষিকে লাভজনক শিল্পে রূপান্তরের প্রত্যয় নিয়ে কাজ করছেন এই উদ্যোক্তা ।