সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৬, ০৩:৩২ পিএম
আবাদি জমি আটকে না রেখে পতিত জায়গা বা ফলবাগানের ফাঁকে বস্তায় আদা চাষ করে প্রতিটি বস্তা থেকে দেড় থেকে সর্বোচ্চ তিন কেজি পর্যন্ত ফলন পাওয়া সম্ভব । দীর্ঘমেয়াদি ফসল হওয়ায় জমিতে আদা করতে গিয়ে অন্যান্য রবি বা খরিপ সবজি চাষ ব্যাহত হওয়ার যে শঙ্কা কৃষকদের থাকে, এই পদ্ধতিতে তা পুরোপুরি দূর হয় । একই সঙ্গে মাঠে আদা চাষের সবচেয়ে বড় শত্রু কন্দপচা রোগও বস্তা পদ্ধতিতে অত্যন্ত কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায় ।
বগুড়ার শিবগঞ্জে অবস্থিত মসলা গবেষণা কেন্দ্রের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. আশিকুল ইসলাম এই তথ্য জানিয়েছেন । দেশে একসময় আদা রপ্তানি হলেও বর্তমানে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে তা আমদানি করতে হচ্ছে । জমিতে আদা পরিপক্ব হতে প্রায় দশ থেকে এগারো মাস সময় লাগে । সাধারণ চাষের জমিতে এই দীর্ঘ সময় একটি মাত্র ফসল ফেলে রাখলে কৃষকরা পাঁচ থেকে ছয়টি অন্য শাকসবজির আবাদ থেকে বঞ্চিত হন । এর পাশাপাশি জমিতে কন্দপচা রোগের আক্রমণ হলে ফলন প্রায় ৮০ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং অনেক সময় পুরো ক্ষেতের ফসল নষ্ট হয়ে যায় । মাটিবাহিত ও বীজবাহিত এই রোগের জীবাণু জমিতে একবার ছড়ালে তা শোধন করা কঠিন এবং পাশের গাছগুলোতে দ্রুত সংক্রমণ ঘটে । কিন্তু বস্তায় আবাদ করলে রোগাক্রান্ত কোনো বস্তা দেখা মাত্রই তা সরিয়ে ফেলা যায়, যার ফলে আশপাশের অন্য গাছগুলো পুরোপুরি নিরাপদ থাকে ।
বস্তায় আদা চাষের জন্য তিন থেকে চার টাকা দামের সিমেন্টের পুরনো বস্তা সবচেয়ে উপযোগী । পশুখাদ্যের ফিডের বস্তা পাতলা হওয়ায় বর্ষা ও রোদে দ্রুত ছিঁড়ে যায়, তাই তা ব্যবহার না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে । প্রতি বস্তায় চাষের জন্য ১০ থেকে ১২ কেজি বেলে-দোআঁশ মাটি, ৩ থেকে ৪ কেজি পচা গোবর সার, সম্ভব হলে ২ কেজি ভার্মিকম্পোস্ট এবং ১ কেজি ছাই ভালোভাবে মেশাতে হবে । মাটিবাহিত রোগ ও ক্ষতিকর জীবাণু শোধনের জন্য এর সাথে ১০ গ্রাম ফুরাডান বা কার্বোফুরান গ্রুপের ওষুধ মেশানো জরুরি । রাসায়নিক সারের ক্ষেত্রে প্রতি বস্তার মিশ্রণে ২০ গ্রাম ইউরিয়া, ১৫ গ্রাম এমওপি, ২০ গ্রাম টিএসপি এবং ৫ গ্রাম করে বোরন ও জিংক প্রয়োজন হয় । তবে রোপণের সময় ইউরিয়া ও এমওপি সারের অর্ধেক অর্থাৎ ১০ গ্রাম ইউরিয়া এবং সাড়ে সাত গ্রাম এমওপি প্রাথমিক মিশ্রণে দিতে হবে । সার মেশানোর পর পুরো মাটির স্তূপটি পলিথিন দিয়ে ঢেকে ২০ থেকে ২৫ দিন রেখে দিতে হয় । এর ফলে মিশ্রণের ভেতরে উচ্চ তাপমাত্রা সৃষ্টি হয়ে ক্ষতিকর জীবাণু নষ্ট হয় এবং উপাদানগুলো আবাদের জন্য প্রস্তুত হয় ।
প্রস্তুতকৃত মাটি বস্তায় ভরে প্রতিটি বস্তায় একটি মাত্র ৪৫ থেকে ৫০ গ্রামের সুস্থ রাইজোম বা আদার বীজ বসাতে হবে । কিছু কৃষক তিন থেকে চারটি বীজ দেন, যা বাড়তি খরচের কারণ হয় এবং ফলন আশানুরূপ বাড়ে না । একটি মাত্র বীজ থেকেই গাছ বেড়ে উঠে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫টি শাখা বা কুশি তৈরি করে । রোপণের পর গাছগুলো পর্যাপ্ত আলো-বাতাস পাওয়ার জন্য এক বস্তা থেকে অন্য বস্তার দূরত্ব কমপক্ষে ১২ থেকে ১৪ ইঞ্চি রাখতে হবে । সারিবদ্ধভাবে বস্তা সাজানোর ক্ষেত্রেও দুই লাইনের মাঝে একই দূরত্ব বজায় রাখা আবশ্যক । গাছ ঘন হয়ে ছায়া পড়লে সালোকসংশ্লেষণ ব্যাহত হয় এবং ফলন কমে যায় । চারা রোপণের ৫০ দিন পর বাকি থাকা ইউরিয়া থেকে ৫ গ্রাম উপরিপ্রয়োগ করতে হয় । অবশিষ্ট ইউরিয়া ও এমওপি সার সমান দুই ভাগে ভাগ করে গাছ লাগানোর ৮০ দিন ও ১১০ দিন পর দুই কিস্তিতে বস্তায় প্রয়োগ করলে ফলন সর্বোচ্চ মাত্রায় পৌঁছায় । আদা গাছ অতিরিক্ত রোদ বা অতিরিক্ত ছায়া পছন্দ করে না । দিনের বেলায় সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ হালকা ছায়া থাকলে গাছ সতেজ থাকে । তাই নতুন ফলবাগান, বাড়ির আনাচকানাচ বা আঙিনায় যেখানে হালকা রোদ ও আলো-ছায়ার খেলা থাকে, সেখানে এই আবাদ সবচেয়ে সফল হয় ।
বাণিজ্যিকভাবে এই পদ্ধতিতে চাষ করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষকরা ব্যাপক সাফল্য পাচ্ছেন । লালমনিরহাটের এক কৃষক ইতোমধ্যে ২৮ হাজার বস্তায় এবং ময়মনসিংহের ফুলপুরের এক কৃষক ৮ হাজার বস্তায় এই আদা চাষ করেছেন । পতিত জমিতে স্বল্প ব্যয়ে এই আধুনিক প্রযুক্তির বিস্তার ঘটিয়ে পারিবারিক মসলার চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি দেশের আমদানি নির্ভরতা অনেকাংশে কমানো সম্ভব ।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন