সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২৬, ১০:৫৬ এএম
বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক বালুকাময় সমুদ্রসৈকত, পাহাড়, বন আর সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য থাকার পরও কাঙ্ক্ষিত আন্তর্জাতিক পর্যটন গন্তব্য হতে পারেনি কক্সবাজার। বিমানবন্দর, রেল ও সড়ক যোগাযোগের পাশাপাশি শত শত হোটেল-রিসোর্ট গড়ে উঠেছে। প্রতিবছর লাখ লাখ দেশি পর্যটকও ভিড় করছেন। তবুও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করার মতো কার্যকর সক্ষমতা গড়ে ওঠেনি এই পর্যটনশহরের।
আজ রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) বিশ্ব পর্যটন দিবস। দিবসটি ঘিরে স্থানীয় ব্যবসায়ী, পর্যটন বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশকর্মীদের আলোচনায় কক্সবাজার আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছাতে না পারার গভীর কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো সামনে এসেছে। সমস্যাটি কেবল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের নয়।
ইন্দোনেশিয়ার বালি কিংবা থাইল্যান্ডের পাতায়ার চেয়ে প্রাকৃতিক রূপ কোনো অংশে কম নয় কক্সবাজারের। কিন্তু বৈচিত্র্যে পিছিয়ে। গত ২০২৫ সালে বালিতে গেছেন প্রায় ৭০ লাখ বিদেশি পর্যটক। থাইল্যান্ডের পাতায়ায় বছরজুড়ে ম্যারাথন, সংগীত, চলচ্চিত্র, আতশবাজি, জলক্রীড়া ও আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ী সম্মেলন মিলিয়ে পঞ্চাশটিরও বেশি বড় আসর বসে। অন্যদিকে কক্সবাজারে বেড়াতে এসে একজন পর্যটকের পুরো ভ্রমণ সীমাবদ্ধ থাকে কেবল সমুদ্রসৈকত, হোটেল, রেস্তোরাঁ আর স্থানীয় বাজারের গণ্ডিতে। জলক্রীড়া, স্নরকেলিং, স্কুবা ডাইভিং কিংবা কায়াকিংয়ের মতো রোমাঞ্চকর কর্মকাণ্ডের আনুষ্ঠানিক সুযোগ একেবারেই অপ্রতুল। হিমছড়ি, ইনানী, পেচারদ্বীপ, পাটুয়ারটেক, রামু, টেকনাফ, মহেশখালী ও সোনাদিয়ার মতো ইতিহাস ও সংস্কৃতিসমৃদ্ধ পর্যটনকেন্দ্রগুলোকে আন্তর্জাতিক মানের সমন্বিত পর্যটনপণ্যে রূপান্তর করা সম্ভব হয়নি।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার কক্সবাজার গন্তব্য উন্নয়ন পরিকল্পনা ২০২৫–২০২৭-এ এসব এলাকার কথা উল্লেখ থাকলেও সেখানে নিরাপত্তা, পরিবহন, মানসম্মত আবাসন ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার ব্যাপক অভাব রয়েছে। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, হয়রানি বন্ধ এবং অনুমতি ছাড়া ছবি তোলা ঠেকাতে না পারলে বিদেশি পর্যটক ধরে রাখা সম্ভব নয় বলে মনে করেন জেলা আইনজীবী সমিতির নেতারা।
বিমানবন্দর আন্তর্জাতিক মানের করলেই কি আন্তর্জাতিক পর্যটক আসবে। সংশ্লিষ্টদের মতে, কেবল রানওয়ে বা টার্মিনাল নির্মাণ যথেষ্ট নয়। দরকার সরাসরি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট, সহজ ভিসাব্যবস্থা, বহুভাষিক তথ্যকেন্দ্র, মানসম্পন্ন আবাসন ও প্রশিক্ষিত গাইড। পর্যটনপণ্যের কোনো দীর্ঘমেয়াদি বিপণন আন্তর্জাতিক বাজারে নেই।
দিনের আলোর পর শহরের বিনোদন প্রায় পুরোপুরি থমকে যায়। আন্তর্জাতিক গন্তব্যগুলোতে দিনের ভ্রমণের পর রাতের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সংগীত ও নিরাপদ কেনাকাটার সুযোগ থাকে। কক্সবাজারে রাতে সুস্থ পারিবারিক বিনোদনের কোনো কাঠামো গড়ে ওঠেনি। গত ১৮ সেপ্টেম্বর সুগন্ধা পয়েন্টের একটি রেস্তোরাঁয় পর্যটকদের ডিজে পার্টি আয়োজনকে কেন্দ্র করে স্থানীয়দের অভিযোগে পুলিশি অভিযান চলে। সেখানে কোনো অনিয়ম না পেলেও পাশের কটেজ এলাকা থেকে অনৈতিক কার্যকলাপে জড়িত থাকার অভিযোগে একুশজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। অপরাধ দমন অবশ্যই প্রয়োজন, তবে বৈধ ও নিরাপদ বিনোদনের নীতিগত সুযোগ থাকা জরুরি বলে মনে করছেন হোটেল মালিকদের প্রতিনিধিরা।
বর্জ্য সংকট সৈকতকে আরও মলিন করছে। কক্সবাজার শহরে দৈনিক প্রায় ১৮০ টন বর্জ্য তৈরি হয়। গত ঈদুল ফিতরের পর মাত্র তিন দিনে সৈকত এলাকা থেকেই এক টনের বেশি প্লাস্টিক ও অন্যান্য ময়লা অপসারণ করা হয়েছে। শহরের বেশিরভাগ হোটেলেই কার্যকর পয়ঃবর্জ্য শোধনাগার নেই। অপরিশোধিত নোংরা পানি সরাসরি সাগরে গিয়ে পড়ছে। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অপরিকল্পিত নগরায়ণ আর জলাবদ্ধতা।
বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের হিসাব অনুযায়ী প্রতিবছর প্রায় ৬০ থেকে ৮০ লাখ দেশি-বিদেশি পর্যটক কক্সবাজারে আসেন। এই খাতকে ঘিরে বছরে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা আবর্তিত হয়। অথচ এই বিপুল সংখ্যার মধ্যে প্রকৃত বিদেশি পর্যটকের উপস্থিতি কত, তাদের অবস্থানকাল কত দিন এবং মাথাপিছু গড় ব্যয় কত—তার কোনো পৃথক হালনাগাদ তথ্য নেই। দুই দশক আগের চেয়ে সৈকতে বিদেশি পর্যটক কমেছে বলেই স্থানীয়দের পর্যবেক্ষণ।
সৈকত পরিচালনা, পরিবেশরক্ষা, নিরাপত্তা, পরিবহন ও পর্যটন প্রচারের দায়িত্ব আলাদা আলাদা সরকারি দপ্তরের হাতে থাকায় সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ব্যাহত হচ্ছে। শুধু পর্যটক আগমনের সংখ্যার আত্মতুষ্টিতে না থেকে কক্সবাজারকে কেন বিদেশি পর্যটকরা বেছে নেবেন এবং বারবার ফিরে আসবেন, সেই প্রশ্নের স্থায়ী সমাধান খোঁজার দাবি জানাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন