এপ্রিল ৭, ২০২৬, ০৯:১৫ পিএম
দিনাজপুরের ফুলবাড়ী সরকারি কলেজে এক ব্যতিক্রমী ও হৃদয়স্পর্শী আয়োজনের মধ্য দিয়ে অবসরজনিত বিদায় জানানো হয়েছে অধ্যক্ষ প্রফেসর খন্দকার মো. হুমায়ুন রেজা কবীরকে। সোমবার বেলা সাড়ে ১১টায় কলেজ প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত এই বিদায় সংবর্ধনা মুহূর্তেই পরিণত হয় ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও অশ্রুসিক্ত স্মৃতির এক আবেগঘন মুহূর্তে। সহকর্মী ও শিক্ষার্থীদের এমন ব্যতিক্রমী সম্মান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বেশ প্রশংসা কুড়াচ্ছে।
কলেজ শিক্ষক পরিষদের উদ্যোগে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন উপাধ্যক্ষ প্রফেসর মো. আহসান হাবীব। শিক্ষক পরিষদের সম্পাদক মো. সাইফুদ্দীন এমরানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে কলেজের শতাধিক শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মচারী উপস্থিত ছিলেন।
প্রিয় অধ্যক্ষকে বিদায়ী সম্মাননা স্মারক প্রদানের পর শুরু হয় সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত। কলেজের সকল বিভাগের সম্মিলিত উদ্যোগে অধ্যক্ষকে ঘোড়ার গাড়িতে বসিয়ে রাজকীয় ঢঙে বিদায় জানানো হয়।
ফুলবাড়ী সরকারি কলেজ প্রাঙ্গণ থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে তাকে দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলার পূর্ব জগন্নাথপুর গ্রামের নিজ বাসভবনে পৌঁছে দেওয়া হয়। ফুলবাড়ীতে এ ধরনের রাজকীয় বিদায়ের আয়োজন এবারই প্রথম, যা উপস্থিত এলাকাবাসীর হৃদয়েও গভীর নাড়া দিয়েছে।১৯৬৭ সালে জন্মগ্রহণকারী প্রফেসর খন্দকার মো. হুমায়ুন রেজা কবীরের কর্মজীবন প্রায় ২৯ বছরের। মজার বিষয় হলো, এই কলেজেরই এক সময়ের শিক্ষার্থী হিসেবে তার শিক্ষাজীবনের পথচলা শুরু হয়েছিল।
পরবর্তীতে তিনি এই কলেজেই দীর্ঘ ১৮ বছর শিক্ষকতা করেন এবং সর্বশেষ প্রায় এক বছর অধ্যক্ষ হিসেবে সফলভাবে দায়িত্ব পালন করেন। শিক্ষার্থীদের সহশিক্ষা কার্যক্রম ও কলেজের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে তার সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল সবসময়ই প্রশংসনীয়। ন্যায়নিষ্ঠা, সততা ও মানবিক গুণাবলির জন্য তিনি সবার কাছে শ্রদ্ধার পাত্র হয়ে উঠেছিলেন। বিশেষ করে দরিদ্র ও অসহায় শিক্ষার্থীদের আর্থিক ও মানসিকভাবে সহায়তা প্রদানের ক্ষেত্রে তার অগ্রণী ভূমিকা সবার মুখে মুখে।
বিদায় বক্তব্যে আবেগাপ্লুত হয়ে প্রফেসর হুমায়ুন রেজা বলেন, এই কলেজ তার জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয়। এখান থেকেই তিনি বড় হয়েছেন এবং এখানেই সেবা করার সুযোগ পেয়েছেন। তিনি সবসময় ন্যায়ের পথে থাকার চেষ্টা করেছেন উল্লেখ করে শিক্ষার্থীদের ভালোবাসাকেই তার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হিসেবে অভিহিত করেন। সহকর্মী শিক্ষকরা তাকে কেবল একজন প্রশাসক নয়, বরং একজন অভিভাবক হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
নীতির প্রশ্নে আপসহীন এবং মানবিকতায় অনন্য এই ব্যক্তিত্বের বিদায়ে কলেজে এক ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়েছে বলে তারা মনে করেন।শিক্ষার্থীরা জানান, অধ্যক্ষ স্যার তাদের কাছে শুধুমাত্র একজন শিক্ষক নন, বরং একজন বন্ধুর মতো ছিলেন। অনার্স তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আমিনুল ইসলাম বলেন, স্যারের কাছে কোনো সমস্যা নিয়ে গেলে কখনো খালি হাতে ফিরতে হয়নি। তিনি সবসময় ন্যায়ের পক্ষে কথা বলতেন।
তার মতো আদর্শ মানুষ জীবনে খুব কমই দেখা যায়। কর্মচারীরাও স্যারের মানবিক আচরণের কথা স্মরণ করে অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়েন। ফুলবাড়ী সরকারি কলেজের প্রাঙ্গণে হয়তো আর প্রতিদিন সেই পরিচিত মুখটি দেখা যাবে না, তবে তার সততা ও ভালোবাসার স্মৃতি চিরকাল শিক্ষার্থীদের হৃদয়ে অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। এক দীর্ঘ শোভাযাত্রার মধ্য দিয়ে বিরামপুরে তার নিজ বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার পর এই অনন্য বিদায় অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে।



দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন