অক্টোবর ২৩, ২০২৬, ০৫:৫৫ পিএম
দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলায় হাজার বছরের সুপ্রাচীন শিকড় ও দুইশত বছরের গৌরবময় ঐতিহ্য ধারণ করে গোলাপগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে চলছে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সম্প্রদায়ের দিনব্যাপী মিলনমেলা। শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) সকাল থেকে শুরু হওয়া এই ঐতিহ্যবাহী উৎসব চলবে সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত।
তিল ধারণের ঠাঁই নেই পুরো গোলাপগঞ্জ প্রান্তরে। বীরগঞ্জে আদিবাসী মিলনমেলা মূলত শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলে আসা সাঁওতাল, ওরাঁও, মুন্ডা, মালো, মাহাতো ও পাহানসহ সমতলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী জনগোষ্ঠীর সামাজিক বন্ধন, সৌহার্দ্য ও সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনের এক অনন্য মহাসম্মেলন। বীরগঞ্জ উপজেলা আদিবাসী সমাজ উন্নয়ন সমিতির উদ্যোগে এবারের এই বিশাল মেলাটি আয়োজিত হয়েছে। সংগঠনটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি জোসেফ হেমব্রম এবং সাধারণ সম্পাদক পাথরাজ কিস্কু পুরো আয়োজনের সার্বিক তত্ত্বাবধানে রয়েছেন। সাধারণত প্রতি বছর শারদীয় দুর্গাপূজার বিজয়া দশমীর বা প্রতিমা বিসর্জনের ঠিক পরদিন এই মেলা বসলেও বীরগঞ্জ উপজেলার সবচেয়ে বড় হাট ও সামগ্রিক পরিস্থিতির কারণে এবার নির্ধারিত সময়ের কিছুটা পরিবর্তন ঘটিয়ে শুক্রবার মেলার দিন ধার্য করা হয়।
স্থানীয় প্রবীণ ও বাসিন্দাদের সূত্রে জানা গেছে, বীরগঞ্জ উপজেলার নিজপাড়া, মোহনপুর ও মরিচা ইউনিয়নের কেন্দ্রস্থল গোলাপগঞ্জ এলাকায় যুগ যুগ ধরে এই ঐতিহ্যবাহী আয়োজন টিকে রয়েছে। প্রতিমা বিসর্জনের বাসি দিনে বা পরদিন অনুষ্ঠিত হয় বলে স্থানীয়ভাবে অনেকের কাছে এটি বাসিয়াহাট বা বাসিয়াহাটি মেলা নামেও সমাদৃত। আয়োজক সমিতির সভাপতি শীতল মার্ডী জানান, প্রতিবছর শারদীয় দুর্গাপূজার এক বা দুই দিন পর এই মেলা অনুষ্ঠিত হয় এবং সকাল থেকেই গোলাপগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ ও আশপাশের এলাকায় মানুষের সমাগম বাড়তে থাকে। প্রায় দুই হাজার বছরের প্রাচীন কৃষ্টি এবং দুই শতাব্দীর সুপ্রাচীন এই সামাজিক রীতি মূলত বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী পরিবারের সদস্যদের পারস্পরিক যোগাযোগ নবায়ন, প্রীতি বিনিময় এবং পারিবারিক সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করে নেওয়ার একটি প্রধান অবলম্বন।

জীবনসঙ্গী খোঁজার মেলা ও দেশজুড়ে ভাইরাল উন্মাদনা সারা দেশের মানুষ জানে এটি বুঝি জীবনসঙ্গী খোঁজার মেলা বা বউ মেলা। ‘পছন্দ হলেই বিয়ে’—এমন কথা সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই পুরো দেশজুড়ে এই উৎসবকে ঘিরে এক বিরাট কৌতূহল ও উন্মাদনা তৈরি হয়েছে। বাহ্যিকভাবে এটি জীবনসঙ্গী খুঁজে নেওয়ার মেলা হিসেবে লোকমুখে ও অনলাইনে আলোচিত হলেও বাস্তব চিত্র একেবারেই ভিন্ন। মূলত এটি কোনো পছন্দ বা তাৎক্ষণিক বিয়ের উদ্দেশ্যে গঠিত বাজার নয়, বরং একটি নিখাদ পারিবারিক ও সামাজিক পুনর্মিলনী। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু ইউটিউবার ও কয়েকটি ফেসবুক পেজ থেকে মেলাটিকে পছন্দ হলেই তাৎক্ষণিক বিয়ের মেলা বা জীবনসঙ্গী খোঁজার মেলা হিসেবে চটকদার ও বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে প্রচার করা হয়। এই গুজব ভাইরাল হওয়ার কারণে দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড় ও নীলফামারীর স্থানীয় মানুষের পাশাপাশি এবার উত্তরবঙ্গের বাইরে থেকেও কৌতূহলী মানুষের উপচে পড়া সমাগম ঘটেছে। দিনাজপুর টিভি ডট কম-এর সরেজমিন পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, চট্টগ্রাম, ঢাকা ও রংপুরসহ দেশের বিভিন্ন দূরবর্তী জেলা থেকে অসংখ্য তরুণ এবং উৎসুক মানুষ কেবল এই গুজবের সূত্র ধরে গোলাপগঞ্জ মাঠে এসে উপস্থিত হয়েছেন।
কিন্তু এখানে তাৎক্ষণিক বিয়ের কোনো রীতি বা প্রথা নেই। বীরগঞ্জ উপজেলা আদিবাসী উন্নয়ন সমিতির সাধারণ সম্পাদক কমলা কান্ত হাসদা জানান, মেলায় কোনো তরুণ-তরুণী একে অপরকে পছন্দ করলেই সেখানে তাৎক্ষণিকভাবে বিয়ে সম্পন্ন হয়ে যায় না। তিনি স্পষ্ট করেন যে এটি মূলত পরস্পরের সঙ্গে পরিচিত হওয়া, একে অপরকে বোঝা এবং ভবিষ্যৎ জীবনসঙ্গী নির্বাচনের একটি ঐতিহ্যবাহী সামাজিক পরিসর তৈরি করে মাত্র। অতীতে আঠারো থেকে পঁচিশ বছর বয়সী বিবাহযোগ্য তরুণীরা খোঁপায় বাহারি ফুল ও বর্ণিল পোশাকে এবং তরুণেরা হাতে রুমাল বেঁধে জীবনসঙ্গীর নজর কাড়তে মেলায় আসতেন, আর কাউকে পছন্দ হলে পরবর্তীতে উভয় পরিবারের অভিভাবকদের আলোচনার মাধ্যমে ধুমধাম করে বিয়ের আয়োজন করা হতো। স্থানীয় আদিবাসী নেতা ও অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক হাবিব লাকড়া জানান, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই মেলা স্থানীয় মানুষের সামাজিক জীবনের অংশ হয়ে রয়েছে এবং সময়ের সঙ্গে মানুষের জীবনযাপন ও যোগাযোগব্যবস্থায় পরিবর্তন এলেও মেলাটির প্রতি আকর্ষণ এখনো কমেনি। মেলায় আগত দর্শনার্থী বলাই রানী হাসদা ও লিটন মার্ডি জানান, প্রযুক্তির যুগে এখন মোবাইল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই যোগাযোগ হয়, ফলে মেলায় এসে জীবনসঙ্গী খোঁজার পুরোনো রীতিতে ভাটা পড়লেও প্রজন্মের সেতুবন্ধ হিসেবে মেলাটির ঐতিহ্য এখনো অমলিন।
লোকজ সংস্কৃতির উৎসব ও সর্বজনীন সম্প্রীতি মেলা প্রাঙ্গণে বয়সের কিংবা ধর্মের কোনো বিভেদ নেই। সমতলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নারী, পুরুষ ও শিশুদের পাশাপাশি স্থানীয় হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের সর্বস্তরের মানুষের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠেছে পুরো গোলাপগঞ্জ জনপদ। দীর্ঘদিনের পরিচিতজনদের সঙ্গে পুনর্মিলন, আত্মীয়স্বজনের খোঁজখবর নেওয়া এবং উৎসবের আনন্দ উদযাপনে পুরো এলাকায় এক উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। মেলা উপলক্ষে বিদ্যালয় মাঠ ও আশপাশের এলাকাজুড়ে বসেছে বাহারি গ্রামীণ পণ্যের পসরা। ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি, ফুচকা, চটপটি, জিলাপি ও হরেক রকম পিঠার দোকানের পাশাপাশি নারীদের প্রসাধনী, কাঁচের চুড়ি, ফিতা, খেলনা এবং মাটির ও বাঁশের তৈরি গৃহস্থালি তৈজসপত্রের দোকানে সকাল থেকেই ক্রেতাদের ভিড় দেখা গেছে। দিনভর উৎসবস্থলে পরিবেশিত হচ্ছে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নিজস্ব লোকজ সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, ঐতিহ্যবাহী নৃত্য এবং মাদল, ঢোল ও মন্দিরার মনোমুগ্ধকর সুর।
অতিরিক্ত ভিড়ের চাপে ভোগান্তি ও প্রশাসনিক নিরাপত্তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিরঞ্জিত প্রচারণায় মাঠের ধারণক্ষমতার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি মানুষের সমাগম হওয়ায় মেলা প্রাঙ্গণে তীব্র ভিড় ও জনদুর্ভোগের সৃষ্টি হয়েছে। উপচে পড়া মানুষের চাপে মেলায় আগত প্রকৃত দর্শনার্থী ও পরিবারগুলো চলাফেরায় ভোগান্তিতে পড়েছেন এবং ভিড়ের সুযোগে বেশ কিছু অপ্রীতিকর ঘটনাও ঘটেছে।
ভিড়ের মধ্যে খোয়া গেছে অন্তত সাতটি মুঠোফোন। দিনাজপুর টিভি ডট কম-এর মাঠপর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী, মেলায় পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে একজন সংবাদকর্মী এবং মেলায় আগত কয়েকজন দর্শনার্থীর মোবাইল ফোন চুরি হয়েছে। এখন পর্যন্ত মেলা প্রাঙ্গণ থেকে মোট ৭টি মোবাইল ফোন হারানোর সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেছে।
ঐতিহ্যবাহী এই আয়োজন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় পূর্বপ্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল বলে জানিয়েছেন বীরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুমা খাতুন। বীরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানান, মেলার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা এড়াতে এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ ও আনসার বাহিনীর সদস্যরা মাঠে থেকে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছেন। এদিকে ঐতিহ্যবাহী এই মিলনমেলা প্রাঙ্গণ সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন দিনাজপুর জেলা বিএনপির প্রবাসী কল্যাণবিষয়ক সম্পাদক ও বীরগঞ্জ পৌর বিএনপির সভাপতি আলহাজ্ব মো. আমিরুল বাহারসহ স্থানীয় বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। তারা মেলার শতবর্ষী ঐতিহ্য ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পরিবেশ বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন