রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,

আধুনিকতার ছোঁয়ায় বিলুপ্তির পথে বীরগঞ্জের মৃৎশিল্প

মোঃ ফরহাদ হোসেন

অক্টোবর ৩০, ২০২৫, ০৪:১৪ পিএম

আধুনিকতার ছোঁয়ায় বিলুপ্তির পথে বীরগঞ্জের মৃৎশিল্প

মানবসভ্যতার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, আদিকাল থেকেই বংশানুক্রমে গড়ে ওঠা গ্রামীণ বাংলার ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প একসময় মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অংশ ছিল। কিন্তু আধুনিক সভ্যতার ছোঁয়ায় প্লাস্টিকসহ বিভিন্ন কৃত্রিম পণ্যের ব্যাপক ব্যবহারের ফলে দিন দিন মাটির তৈরি জিনিসের চাহিদা কমে যাচ্ছে।

ফলে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প আজ বিলুপ্তির পথে। জীবিকার তাগিদে মৃৎশিল্পীরা আজ অসহায় ও নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন। অনেকেই হারাতে বসেছেন তাদের নৈপুণ্য ও শৈল্পিক গুণাবলি। তবু শত কষ্ট উপেক্ষা করে কেউ কেউ বাপ-দাদার ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

সাধারণভাবে এ শিল্পের প্রধান উপকরণ মাটি হওয়ায় একে মৃৎশিল্প বলা হয়। অর্থাৎ মাটি দিয়ে তৈরি সব শিল্পকর্মই মৃৎশিল্প, আর যারা মাটি নিয়ে কাজ করেন তাদের বলা হয় কুমার।

দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় এখনো কিছু পরিবার এ ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, উপজেলার সাতোর ইউনিয়নের পালপাড়া গ্রামে প্রায় ১০টি পরিবার এখনো এ পেশার সঙ্গে জড়িত। তারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মাটির তৈরি নানা পণ্য তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন।

পালপাড়া গ্রামের বাসিন্দা গোবিন্দ পাল (৫৯) বলেন, “মাটি দিয়ে জিনিসপত্র তৈরির জন্য পুকুর, ডোবা বা জমি থেকে বিশেষ ধরনের মাটি সংগ্রহ করি। সেই মাটি দিয়ে তৈরি করি হাড়ি, পাতিল, ফুলের টব, কড়াই, কাসা ইত্যাদি। আগে এসব জিনিসের ভালো চাহিদা ছিল, এখন তা অনেক কমে গেছে। আকারভেদে হাড়ি ১০ থেকে ১০০ টাকা, ফুলের টব ৫ থেকে ৫০ টাকা, কড়াই ২৫ থেকে ৩০ টাকায় বিক্রি হয়। দিনে ৪০০-৫০০ টাকা আয় হয়, যা দিয়ে সংসার চালানো দায়।”

তিনি আরও জানান, “আমাদের পরিবারের ৭ সদস্যের মধ্যে ৫ জনই এই পেশায় যুক্ত। কিন্তু আয় কমে যাওয়ায় এখন ভ্যান চালিয়ে কোনোরকমে সংসার চালাতে হয়। গ্রামের মানুষ এখন প্রায় সবাই প্লাস্টিকের পণ্য ব্যবহার করছে, তাই বিক্রি কমে গেছে।”

একই গ্রামের মৃৎশিল্পী দিপালী রানী (৪০) জানান, “বিয়ে হওয়ার পর থেকেই স্বামীর সঙ্গে এই পেশায় আছি। আগে ভালোই চাহিদা ছিল, সংসার চলত সচ্ছলভাবে। কিন্তু এখন বিক্রি কমে যাওয়ায় সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয়। বাড়িঘর ছাড়া আমাদের আর কোনো সম্পদ নেই।” তার স্বামী চৈতন্য পাল বর্তমানে সংসারের খরচ জোগান দিতে কাজের পাশাপাশি ভ্যান চালান।

স্থানীয়রা জানান, আধুনিকতার ঢেউয়ে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামীণ ঐতিহ্যের এই প্রাচীন শিল্প। সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে যদি মৃৎশিল্প সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়, তাহলে আবারও এ শিল্পে প্রাণ ফিরে আসতে পারে।