জুন ১১, ২০২৬, ১০:৪৯ এএম
দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি হলো ব্যাংকিং খাত। শিল্পায়ন, ব্যবসা-বাণিজ্য, রপ্তানি ও ব্যক্তি সঞ্চয়ের প্রধান বাহক হিসেবে ব্যাংকগুলো কাজ করে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ইসলামি ধারার কিছু ব্যাংকসহ আর্থিক খাতের যে নাজুক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা পুরো অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে নতুন প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। কেবল কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সংকট নয়, এটি এখন পুরো অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই সংকটের পেছনে কোনো আকস্মিক কারণ নেই। দীর্ঘদিনের দুর্বল সুশাসন, রাজনৈতিক প্রভাব ও অনিয়ন্ত্রিত ঋণ বিতরণের ফসল আজ দৃশ্যমান। গ্রাহকদের মনে দীর্ঘস্থায়ী আস্থার ঘাটতি দেখা দিয়েছে। একটি ব্যাংকের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার ভবন বা প্রযুক্তি নয়, বরং আমানতকারীর আস্থা। যখন গ্রাহকরা মনে করেন তাদের সঞ্চিত অর্থ ঝুঁকির মুখে, তখনই বড় ধরনের তারল্য সংকট দানা বাঁধে।
ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলো সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং মডেলটি একসময় জনপ্রিয়তার শীর্ষে ছিল। কিন্তু বর্তমানে এসব ব্যাংকে বড় অঙ্কের ঋণ অনিয়ম ও একই ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর কাছে বিপুল অর্থ কেন্দ্রীভূত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। যাচাই-বাছাই ছাড়া ঋণ দেওয়ার ফলে তারল্য প্রবাহে মারাত্মক চাপ তৈরি হয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে, শক্তিশালী সুশাসন ও জবাবদিহিতা ছাড়া কোনো ব্যাংকিং মডেলই নিরাপদ নয়।
দেশের ব্যাংকিং খাতের এই পরিস্থিতির মূলে রয়েছে রাজনৈতিক অর্থনীতি। অতীতে ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে প্রকল্পের বাস্তবসম্মত যাচাইয়ের চেয়ে রাজনৈতিক সংযোগ ও ব্যক্তিগত সম্পর্ককে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে পরিচালনা পর্ষদ ও পেশাদার ব্যবস্থাপনার মধ্যে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে। পেশাদার ব্যাংকারদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ায় ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও বিনিয়োগ পরিকল্পনায় বড় ত্রুটি থেকে যাচ্ছে।
খেলাপি ঋণের সংস্কৃতি এই সংকটকে আরও গভীর করেছে। বছরের পর বছর বিশেষ সুবিধা ও নীতিগত ছাড়ের মাধ্যমে বড় ঋণখেলাপিদের দায়মুক্তির সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এই ভুল বার্তা বড় খেলাপির সংখ্যা বাড়িয়ে দিয়েছে। অথচ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা বা সাধারণ গ্রাহকদের জন্য নিয়মকানুন ছিল অত্যন্ত কঠোর। ফলে ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি মানুষের স্বাভাবিক আস্থা তলানিতে ঠেকেছে।
অতীতে হলমার্ক, বেসিক ব্যাংক কিংবা পি কে হালদারের মতো বড় ধরনের আর্থিক কেলেঙ্কারিগুলো ব্যাংকিং খাতের ক্ষতগুলোকে বারবার সামনে নিয়ে এসেছে। তদন্ত হয়েছে, সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, কিন্তু কাঠামোগত পরিবর্তন আসেনি। ফলে নতুন নতুন রূপে একই সংকট বারবার ফিরে এসেছে।
সাধারণ মানুষের জন্য এই সংকট অত্যন্ত ভয়াবহ। একজন চাকরিজীবী বা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর সঞ্চয় ব্যাংকের ওপর নির্ভরশীল। ব্যাংক দুর্বল হলে বিনিয়োগ কমে যায়, উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত হয়। আমানতকারীরা যদি টাকা তুলতে গিয়ে ফিরে আসেন, তবে তারল্য সংকট আরও তীব্র হয়। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত বাজারের নিত্যপণ্য থেকে শুরু করে জীবনযাত্রার প্রতিটি ক্ষেত্রে পড়ে।
দুর্বল ব্যাংকগুলোকে একীভূত করার আলোচনা চলছে। তবে শুধু একীভূতকরণই সমাধান নয়। যদি অনিয়ম, দুর্নীতি ও রাজনৈতিক প্রভাবের মতো মৌলিক সমস্যাগুলো দূর করা না হয়, তবে এটি কেবল সাময়িক উপশম হিসেবে কাজ করবে।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতকে স্থিতিশীল করতে সমন্বিত সংস্কার প্রয়োজন। প্রথমত, বড় ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ ব্যাংককে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দিতে হবে যাতে তারা নির্ভয়ে নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে। তৃতীয়ত, পরিচালনা পর্ষদে পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে। চতুর্থত, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী তথ্য প্রকাশ ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা উন্নত করতে হবে।
ব্যাংকিং খাত আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। এটি শুধু কয়েকটি ব্যাংকের সমস্যা নয়, বরং পুরো জাতির ভবিষ্যতের প্রশ্ন। স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং আইনের সমান প্রয়োগের মাধ্যমেই কেবল এই আস্থা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব। সংকটকে আড়াল না করে এটিকে কাঠামোগত সংস্কারের সূচনা বিন্দু হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। অন্যথায় এই আর্থিক চাপ ভবিষ্যতে আরও বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখা দেবে, যার মূল্য দিতে হবে পুরো জাতিকে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন