সেপ্টেম্বর ২২, ২০২৬, ১২:৫৮ পিএম
পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার মদনপুরা পালপাড়ায় আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে তৈরি হচ্ছে বিশ্বমানের ঐতিহ্যবাহী মৃৎপণ্য।
উপজেলার মদনপুরা গ্রামের মৃৎশিল্পীরা সেরা এঁটেল মাটির সাথে আধুনিক কলাকৌশল ও শৈল্পিক নকশার সমন্বয় ঘটিয়ে এ অঞ্চলের মৃৎশিল্পকে একটি লাভজনক কুটির শিল্প ও রপ্তানিমুখী বাণিজ্যে রূপ দিয়েছেন। বর্তমানে মদনপুরার এসব মৃৎপণ্য স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে বিশ্বের প্রায় ২৪টি দেশে রপ্তানি হচ্ছে এবং এ খাত থেকে বছরে প্রায় ৫০ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হচ্ছে।
মদনপুরা পালপাড়াটি পটুয়াখালী জেলা শহর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে এবং বাউফল উপজেলা সদর থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত।
বাউফল উপজেলায় কমবেশি ৫০০ কুমার পরিবার থাকলেও শুধু মদনপুরা গ্রামেই রয়েছে ৫০ থেকে ৬০টি মৃৎশিল্পী পরিবার। এ ছাড়া উপজেলার কনকদিয়া, বগা এবং বাউফল ইউনিয়নের পালপাড়াগুলোতেও মৃৎশিল্পের দীর্ঘ ঐতিহ্য টিকে রয়েছে। আবহমান বাংলার প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছরের প্রাচীন ঐতিহ্য ধারণ করে এ অঞ্চলের মৃৎশিল্পীরা বংশপরম্পরায় কাজ করে চলেছেন। প্লাস্টিক ও অ্যালুমিনিয়ামের দাপটে একসময় মাটির তৈজসপত্র অস্তিত্ব সংকটে পড়লেও আধুনিকীকরণ ও পণ্যের বহুমুখীকরণের ফলে মদনপুরা বাণিজ্যিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। উপযুক্ত মাটি তৈরিই এই কাজের প্রথম ধাপ। মৃৎশিল্পীরা মাটি প্রস্তুত করতে পটুয়াখালীর সবচেয়ে উন্নত মানের কালো এঁটেল মাটি ব্যবহার করেন। সাধারণত এক ভাগ বেলে মাটির সঙ্গে দুই ভাগ কালো এঁটেল মাটি মেশালে পাত্র তৈরির উপযোগী কাদা তৈরি হয়। সেই কাদা পা দিয়ে ভালো করে ছেনে নরম ও মসৃণ করে মণ্ড তৈরি করা হয়। এরপর দাঁড়িপাল্লায় মেপে নির্দিষ্ট ওজনের মণ্ড হাত দিয়ে বেলে গোলাকার করা হয়।
আগে হাত দিয়ে ঘোরানো চাক ব্যবহার করা হলেও এখন প্রায় সব কারখানায় বসানো হয়েছে মোটরচালিত বৈদ্যুতিক চাক। ঘূর্ণায়মান মোটরের চাকে কাদার মণ্ড রেখে কারিগরেরা হাতের স্পর্শে কয়েক মিনিটের মধ্যে পছন্দসই আকৃতি দেন। আধাযান্ত্রিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে উৎপাদন গতি বহু গুণে বেড়ে গেছে এবং উৎপাদিত পাত্রের গঠন অনেক বেশি প্রতিসম ও নিখুঁত হচ্ছে। প্রাথমিক রূপ দেওয়ার পর মাটির জিনিসপত্রগুলো তাকে তাকে সাজিয়ে ছায়ায় রেখে শক্ত করা হয়। থালা বা ছড়ানো পাত্র তৈরিতে ব্যবহার করা হয় বিশেষ ধরনের ছাঁচ বা ডাইস।ডাইসের ওপর কাদা বসিয়ে নির্দিষ্ট চাপের মাধ্যমে এক মাপের শত শত প্লেট বা সরা তৈরি করেন শিল্পীরা। যেসব সামগ্রীর গায়ে পরে নকশা আঁকা হবে, সেগুলোকে সরাসরি কড়া রোদে না দিয়ে পলিথিনের ছাউনির নিচে নিয়ন্ত্রিত আলো-বাতাসে শুকানো হয়। মাটির কাঠামো কিছুটা শক্ত হলে নকশা বিভাগের কারিগরেরা কাঠের বা ধাতব বাটালি দিয়ে পাত্রের উপরিভাগ চেঁচে মসৃণ করেন এবং সূক্ষ্ম আঁচড় কেটে নকশার রেখা তৈরি করেন। মদনপুরার বেশিরভাগ কারখানায় সকাল সাতটা থেকে সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত কর্মযজ্ঞ চলে।
পুরুষদের পাশাপাশি পালপাড়ার নারীরাও মাটি প্রস্তুত, ছাঁচ থেকে খোলা, রোদে শুকানো, রঙ করা এবং নকশা আঁকার সব ধাপে সমানভাবে কাজ করেন। কাঁচা মাটির পাত্রগুলোকে আবহাওয়া বুঝে উঠানে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা রোদে শুকানো হয়। এরপর ভেজা সুতি কাপড় দিয়ে মুছে ধুলোবালি দূর করা হয় এবং শুকনো কাপড় দিয়ে ঘষে মসৃণ চকচকে ভাব আনা হয়।
পরবর্তী ধাপে পাত্রের গায়ে প্রলেপ দেওয়া হয় প্রাকৃতিক রঙের। খয়ের, কাপড় কাচার সোডা, গাছের ছাল ও দস্তার মিশ্রণে তৈরি দ্রবণ পাত্রের গায়ে লাগানো হয়। এতে মাটির পাত্রটি উজ্জ্বল রঙের পাশাপাশি টেকসই রূপ পায়। রঙের ওপর দক্ষ শিল্পীরা তুলির আঁচড়ে ফুটিয়ে তোলেন বাহারি ফুল, পাতা ও ঐতিহ্যবাহী জ্যামিতিক নকশা। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক), চারুকলা ইনস্টিটিউট এবং আড়ংয়ের মতো প্রতিষ্ঠানের প্রশিক্ষণ এখানকার নকশার মানে আধুনিক রূপান্তর ঘটিয়েছে।
রং ও নকশার কাজ শেষ হলে শুরু হয় আগুনে পোড়ানোর ধাপ। মদনপুরায় এই বিশেষ চুল্লিকে বলা হয় পুইন, পুন বা পাঁজা। মাটির বিশাল চুল্লির ভেতরে নিচ থেকে ওপর পর্যন্ত শত শত পাত্র স্তরে স্তরে সাজানো হয়। পাত্রের স্তূপ খড়, বিচালি ও কাদার প্রলেপ দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয় যাতে ভেতরের তাপ বাইরে বের হতে না পারে। চুলার নিচের প্রকোষ্ঠে কাঠের গুঁড়ি, লাকড়ি ও তুষ দিয়ে একটানা ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা তীব্র আগুন জ্বালানো হয়। আগুনে পুড়ে কাঁচা মাটির তৈজসপত্র শক্ত ও স্থায়ী সিরামিক বা পোড়ামাটির রূপ ধারণ করে। ঠান্ডা হওয়ার পর চুল্লি থেকে পাত্রগুলো নামিয়ে আনা হয় প্যাকেজিং বিভাগে। সেখানে প্রতিটি তৈজসপত্র কাগজে মুড়িয়ে বাক্সে ভরা হয়। মদনপুরায় এখন সনাতনী হাঁড়ি-পাতিলের চেয়ে আধুনিক রুচির গৃহসজ্জা সামগ্রী বেশি তৈরি হয়। এর মধ্যে রয়েছে ফুলের টব, হাতলযুক্ত জগ, ফুলদানি, চায়ের কাপ-পিরিজ, মগ, গ্লাস, বাটি, সানকি, পেনদানি, পুতুল এবং নানা ধরনের স্মারক।
মদনপুরার চার দশকের অভিজ্ঞ কারিগর বরুণ পাল জানান, অতীতে তারা শুধু বাসন, খোড়া ও কলসের মতো বড় বড় তৈজসপত্র বানাতেন। বিসিক থেকে আধুনিক নকশার প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর কাজের ধরন ও চাহিদা ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে। কোনো কর্মচারী ছাড়া পারিবারিক শ্রম দিয়ে শুরু করা তার প্রতিষ্ঠানে এখন প্রায় ১০০ জন শ্রমিক কাজ করছেন। তিনি জানান, আধুনিক স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রপাতির উচ্চমূল্যের কারণে তারা উৎপাদন আরও বাড়াতে পারছেন না। সহজ শর্তে দীর্ঘমেয়াদি ব্যাংক ঋণ পেলে সরাসরি স্বয়ংক্রিয় মেশিন এনে উৎপাদন কয়েক গুণ বাড়ানো সম্ভব হতো। জটিল কাগজপত্রের কারণে প্রান্তিক মৃৎশিল্পীদের পক্ষে ঋণ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। মদনপুরার পণ্য দেশীয় বাজারে সরাসরি বিক্রির পাশাপাশি অনলাইন অর্ডারের মাধ্যমে সরবরাহ করা হয়।
এ ছাড়া আড়ং, হিট বাংলাদেশ, দ্য কোর দ্য জুট ওয়ার্কস এবং ঢাকা হ্যান্ডিক্রাফটসের মতো বায়িং হাউসের মাধ্যমে এখানকার মৃৎপণ্য নিয়মিত বিদেশে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ইতালি, অস্ট্রেলিয়াসহ এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকার প্রায় ২৪টি দেশে বাউফলের এই মাটির পণ্য রপ্তানি হচ্ছে। বাংলার আবহমান ঐতিহ্য আর আধুনিক শিল্পরীতির সমন্বয়ে টিকে থাকা বাউফলের এই শিল্প দেশের অর্থনীতিতে অনন্য ভূমিকা রাখছে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন