মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,

সিজারের পর ইনফেকশন বৃদ্ধির কারণ: চিকিৎসকের বিশ্লেষণ

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২৬, ০৫:১৬ পিএম

সিজারের পর ইনফেকশন বৃদ্ধির কারণ: চিকিৎসকের বিশ্লেষণ

সন্তান জন্মদানের ক্ষেত্রে দিন দিন উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের প্রবণতা। স্বাভাবিক প্রসবের তুলনায় অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান জন্মের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে প্রসূতি মায়েদের নানাবিধ শারীরিক জটিলতাও প্রকট আকার ধারণ করছে। এর মধ্যে সবচেয়ে সংকটজনক রূপ নিচ্ছে অস্ত্রোপচারের পর ক্ষতস্থানে তীব্র সংক্রমণ বা ইনফেকশন। অনেক ক্ষেত্রে সিজারের পর ক্ষতস্থানে পুঁজ জমা, তীব্র সংক্রমণ, জ্বর ও অসহনীয় ব্যথাসহ নানাবিধ জটিল উপসর্গ দেখা দিচ্ছে।

এই সংক্রমণের হার বৃদ্ধির কারণ ও ঝুঁকি মোকাবিলায় করণীয় সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও গবেষণাভিত্তিক ব্যাখ্যা তুলে ধরেছেন মেডিসিন ও সার্জারি বিশেষজ্ঞ ডা. মেহেরিন সুলতানা। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের এই চিকিৎসক জানান যে বাংলাদেশে সিজারিয়ান ডেলিভারির সংখ্যা গত দুই দশকে নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। জাতীয় জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপ বা বিডিএইচএস ২০২২-এর তথ্য অনুসারে বর্তমানে দেশে মোট সন্তান প্রসবের ৪৫ শতাংশই সরাসরি সিজারের মাধ্যমে সম্পন্ন হচ্ছে। অথচ ১৯৯৯-২০০০ সালের সমীক্ষায় এই হার ছিল মাত্র ৩ শতাংশ। অর্থাৎ দুই দশকের ব্যবধানে দেশে সিজারের হার ৩ শতাংশ থেকে লাফিয়ে ৪৫ শতাংশে পৌঁছেছে।

পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে এই প্রবণতা সবচেয়ে বেশি লক্ষ্য করা গেছে। একই সরকারি স্বাস্থ্য জরিপ অনুযায়ী বেসরকারি চিকিৎসা খাতে প্রায় ৮৩ শতাংশ প্রসব সিজারের মাধ্যমে হচ্ছে, যেখানে সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এই হার ৩৬ শতাংশ। এছাড়া ভৌগোলিক বিবেচনায় শহরাঞ্চলে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে প্রসবের হার ৫৬ শতাংশ এবং গ্রামাঞ্চলে এই হার ৪০ শতাংশ। ডা. মেহেরিন সুলতানা উল্লেখ করেন যে দেশে যত বেশি অস্ত্রোপচারভিত্তিক প্রসব বাড়বে, অস্ত্রোপচার পরবর্তী জটিলতা বিশেষ করে কাটার স্থানে সংক্রমণ প্রতিরোধের প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বও তত বেশি বৃদ্ধি পাবে।

দেশের বাস্তব পরিস্থিতি অনুধাবনে ২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণার তথ্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। দেশের ছয়টি টারশিয়ারি হাসপাতাল—যার মধ্যে তিনটি সরকারি এবং তিনটি বেসরকারি হাসপাতাল অন্তর্ভুক্ত—সেখানে সিজার করানো এক হাজার ৩৩৫ জন প্রসূতিকে অস্ত্রোপচারের পর টানা ৩০ দিন নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। ওই গবেষণায় দেখা গেছে আক্রান্ত প্রসূতিদের মধ্যে ১৯ দশমিক ১ শতাংশ রোগী সরাসরি অস্ত্রোপচার-পরবর্তী ক্ষত সংক্রমণের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে সরকারি হাসপাতালে সংক্রমণের হার ছিল ২১ দশমিক ৬ শতাংশ এবং বেসরকারি হাসপাতালে ছিল ১১ দশমিক ৮ শতাংশ। আরও আশঙ্কাজনক তথ্য হলো অস্ত্রোপচারের ৭ থেকে ১৪ দিনের মাথায় ৫৪ দশমিক ৮ শতাংশ প্রসূতির শরীরে অন্তত দুটি স্পষ্ট সংক্রমণের লক্ষণ প্রকাশ পায়।

কেন এই ধরনের সংক্রমণের প্রকোপ বৃদ্ধি পাচ্ছে তার চিকিৎসাভিত্তিক কারণ ব্যাখ্যা করেছেন বিশেষজ্ঞরা। ডা. মেহেরিন সুলতানা জানান যে সিজারের সব রোগী একই ধরনের শারীরিক ও ক্লিনিক্যাল পরিস্থিতি নিয়ে অপারেশন থিয়েটারে প্রবেশ করেন না। কেউ আসেন সম্পূর্ণ পূর্বপরিকল্পিত বা ইলেক্টিভ সিজারের অংশ হিসেবে, আবার অনেকেই দীর্ঘ সময় প্রসববেদনায় ভোগার পর জরুরি পরিস্থিতিতে অস্ত্রোপচারের টেবিলে পৌঁছান। অনেক প্রসূতি আগে থেকেই ডায়াবেটিস, রক্তস্বল্পতা কিংবা অতিরিক্ত স্থূলতায় ভোগেন, আবার অনেকের ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় আগেই জরায়ুর জল ভেঙে যায়। একজন প্রসূতি যদি দীর্ঘ সময় প্রসববেদনায় থাকেন, দীর্ঘ সময় ঝিল্লি ভাঙা থাকে এবং সবশেষে জরুরি সিজারিয়ান করাতে হয়, তবে তার সংক্রমণের ঝুঁকি কেবল একটি কারণে বাড়ে না; বরং জটিল প্রসবশ্রম, ঝিল্লি ফেটে যাওয়া, জরুরি অস্ত্রোপচার এবং রোগীর নিজস্ব শারীরিক দুর্বলতা সব একসাথে কাজ করে।

তবে কেবল রোগীর শারীরিক জটিলতা দিয়ে হাসপাতালের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা আড়াল করা সমীচীন নয়। তিনি স্পষ্ট করেন যে বাংলাদেশের বাস্তবতায় সিজারের পর ইনফেকশন কেবল অস্ত্রোপচারের সময় জীবাণু প্রবেশের সরল ব্যাখ্যা দিয়ে নির্ধারণ করা যাবে না। এটি মূলত একটি বহুমুখী ও জটিল সমস্যা—যেখানে সিজারের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি, দীর্ঘ প্রসববেদনা, জরুরি অস্ত্রোপচার, অনিয়ন্ত্রিত অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার, ডায়াবেটিস ও রক্তস্বল্পতার মতো শারীরিক দুর্বলতা এবং সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের নিজস্ব জীবাণুমুক্তকরণ ব্যবস্থার সামগ্রিক ঘাটতি একসাথে কাজ করে। তবে কোনো রোগীর ঝুঁকি থাকা মানেই নিশ্চিত সংক্রমণ হবে এমন নয়, বরং তা শুধু সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়। তাই জটিলতা এড়াতে সিজারের পূর্বেই রোগীর ঝুঁকি মূল্যায়ন করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ মায়েদের ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচার-পরবর্তী নিবিড় পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করাই সংক্রমণ মোকাবিলার প্রধান কার্যকর পথ।