সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২৬, ০৩:৩৬ পিএম
কক্ষপথে কৃত্রিম উপগ্রহে জ্বালানি সরবরাহের যুগান্তকারী উদ্ভাবন মহাকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় নিঃশব্দ বিপ্লবের সূচনা করেছে। স্যাটেলাইটকে দীর্ঘদিন সচল রাখার এই বৈজ্ঞানিক সক্ষমতা বিশ্ব পরাশক্তিগুলোর মহাকাশ প্রতিরক্ষা কৌশল ও দ্বন্দ্বে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই এই প্রযুক্তি মহাকাশ যুদ্ধকৌশলকে সম্পূর্ণ নতুন যুগে নিয়ে যাচ্ছে। চীনা গবেষকেরা সম্প্রতি তাদের একটি নেভিগেশন স্যাটেলাইটে কক্ষপথেই সফলভাবে জ্বালানি ভরার আনুষ্ঠানিক দাবি করেছেন।
চীনা অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেস ও দেশটির মহাকাশ গবেষণা ল্যাবরেটরির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে তাদের `শিজিয়ান-২৫` নামের একটি সার্ভিসিং স্পেসক্রাফট `বেইদৌ-২ জি৭` স্যাটেলাইটে ১৪২ কেজি জ্বালানি পাঠায়। এর ফলে ওই কৃত্রিম উপগ্রহটির সামগ্রিক কার্যকাল আরও আট বছর বেড়ে গেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের স্পেস ফোর্স এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানী জোনাথন ম্যাকডওয়েলের মতে, সেই সময়ে শিজিয়ান-২৫ এবং বেইদৌ-২ জি৭-এর কক্ষপথীয় অবস্থান ও পারস্পরিক দূরত্ব পর্যবেক্ষণ করে সরাসরি সংযুক্ত হওয়ার কোনো ভৌগোলিক প্রমাণ নথিপত্রে পাওয়া যায়নি। এরপরও এই প্রযুক্তি বাস্তবায়িত হলে তা বৈশ্বিক সামরিক ও প্রযুক্তিগত ভারসাম্যে গভীর রূপান্তর ঘটাবে।
মহাকাশে চলাচলে নিজস্ব স্বকীয়তা ও কৌশলগত নমনীয়তা কেবল বাণিজ্যিক উপগ্রহগুলোর স্থায়িত্ব বাড়াবে না, বরং সামরিক পরিসরে অভূতপূর্ব সুবিধা নিশ্চিত করবে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এতদিন পর্যন্ত স্যাটেলাইটগুলোর জন্য অত্যন্ত নির্দিষ্ট পরিমাণ জ্বালানি বরাদ্দ থাকত, যা দিয়ে কেবল কক্ষপথের নির্ধারিত অবস্থানে স্থির থাকা এবং কার্যকাল শেষে নিচে নেমে আসার কাজ চালানো হতো। তবে মাঝপথে জ্বালানি ভরার সুযোগ তৈরি হওয়ায় স্যাটেলাইটগুলো এখন যেকোনো সময় অপ্রত্যাশিতভাবে গতি ও পথ পরিবর্তন করতে পারবে। ২০২৬ সালে প্রকাশিত প্রতিরক্ষা গবেষণায় দেখা যায়, শত্রুপক্ষ যদি কৃত্রিম উপগ্রহে হামলার ভান করে আক্রমণাত্মক মহড়া চালায়, তবে সাধারণ স্যাটেলাইটগুলোকে আত্মরক্ষার্থে গতিপথ পরিবর্তন করতে হয়, যা তাদের সীমিত জ্বালানি দ্রুত নিঃশেষ করে ফেলে। কিন্তু পুনরায় জ্বালানি ভরার সুবিধা নিশ্চিত হলে উপগ্রহগুলো আর জ্বালানি সংকটের সীমাবদ্ধতায় আটকে থাকবে না।
এর ফলে মহাকাশে দীর্ঘমেয়াদি নিরবচ্ছিন্ন টহল পরিচালনা, প্রতিপক্ষের ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি চালানো এবং হঠাৎ স্থান পরিবর্তন করে প্রতিপক্ষকে বিভ্রান্ত করা সহজ হবে।
চীন তাদের শিজিয়ান প্রকল্পের মাধ্যমে ইতিমধ্যে এই ধরনের জটিল রোবোটিক সক্ষমতা প্রদর্শন করেছে। এর আগে তাদের শিজিয়ান-২১ স্যাটেলাইট একটি নিষ্ক্রিয় নেভিগেশন উপগ্রহকে সরাসরি আঁকড়ে ধরে তিন হাজার কিলোমিটার দূরে মহাকাশের বর্জ্য ফেলার কক্ষপথে সরিয়ে দিয়েছিল। মহাকাশ গবেষক আলান দুগার ও পল সিমানস্কির মতে, পুরো মহাকাশ এখন একটি নীরব ও ঝুঁকিপূর্ণ গ্রে জোন বা ধূসর যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। এখানে ধ্বংসাত্মক হামলা চালিয়ে মহাকাশে ক্ষতিকর বর্জ্য তৈরি না করেই সূক্ষ্ম কৌশলের মাধ্যমে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হচ্ছে। অন্য স্যাটেলাইটের কাছাকাছি পৌঁছে সেটির সংকেত জ্যাম করা, গতিবিধি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা কিংবা রোবোটিক বাহুর মাধ্যমে কক্ষপথ থেকে বিচ্যুত করে দেওয়া আধুনিক মহাকাশ সংঘাতের মূল হাতিয়ার হয়ে উঠছে।
চীনের এই বহুমুখী কৌশলগত সক্ষমতার জবাবে কক্ষপথীয় প্রতিরক্ষা জোরদার করতে তৎপরতা বাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্রও।
স্থলভিত্তিক তড়িৎ-চুম্বকীয় অস্ত্র মোতায়েনের পাশাপাশি মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগ গোপনীয় চালকহীন স্পেসপ্লেন তৈরি করছে, যা মহাকাশে ক্ষুদ্র ড্রোন বা উপ-স্যাটেলাইট মোতায়েন করতে এবং অন্য উপগ্রহের কাছাকাছি গিয়ে অভিযান চালাতে বা জ্বালানি সরবরাহ করতে সক্ষম। এর অংশ হিসেবে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের সামরিক বাহিনী চীনের `শিয়ান-১২-০১` স্যাটেলাইটের কাছাকাছি যৌথ সামরিক অভিযান চালিয়ে নিজেদের মহাকাশ প্রতিরোধ সক্ষমতার মহড়া সম্পন্ন করেছিল। এ ছাড়া ওয়াশিংটনের প্রস্তাবিত `গোল্ডেন ডোম` ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাটিকেও ভবিষ্যতে মহাকাশে আক্রমণাত্মক তৎপরতায় ব্যবহারের সম্ভাব্য বিকল্প হিসেবে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। কক্ষপথে গতিশীল উপস্থিতি ও নিরবচ্ছিন্ন রিফুয়েলিং ব্যবস্থার এই প্রতিযোগিতায় যারা এগিয়ে থাকবে, ভবিষ্যতের মহাকাশ অর্থনীতি ও বৈশ্বিক সুরক্ষার মূল চাবিকাঠি কার্যত তাদের দখলেই থাকবে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন