সেপ্টেম্বর ৩০, ২০২৬, ১০:৪৮ এএম
হাতের কব্জিতে থাকা আধুনিক স্মার্টওয়াচ এখন কেবল সময় দেখা কিংবা দৈনন্দিন পদক্ষেপ গণনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। প্রযুক্তির ব্যাপক অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে এই পরিধেয় যন্ত্রগুলো হৃদস্পন্দন পর্যবেক্ষণ, অনিয়মিত হার্ট রিদম শনাক্তকরণ এবং বিশেষ ক্ষেত্রে ইসিজি বা ইলেক্ট্রোকার্ডিওগ্রাম রেকর্ডের সক্ষমতা অর্জন করেছে। এর ফলে শরীরের অভ্যন্তরীণ জটিলতা বা হৃদযন্ত্রের কোনো অস্বাভাবিক সংকেত এই ঘড়িগুলো আগেভাগে জানাতে পারে কি না, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। অনেক ডিভাইসে নিয়মিত পালস পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি বিশেষ মডেলে সিঙ্গল-লিড ইসিজি সুবিধা যুক্ত করা হয়েছে। এর মাধ্যমে হৃদযন্ত্রের বৈদ্যুতিক কার্যকলাপের একটি তাৎক্ষণিক চিত্র পাওয়া যায়, যদিও এই তথ্যকে চিকিৎসকের পেশাদার রোগ নির্ণয় বা ক্লিনিক্যাল পরীক্ষার সমতুল্য মনে করা ঠিক নয়।
স্মার্টওয়াচের সেন্সর মূলত প্রাথমিক স্বাস্থ্য সংকেত ট্র্যাক করে। অধিকাংশ ডিভাইসে হৃদস্পন্দন পর্যালোচনার কাজে ফটোপ্লেথিসমোগ্রাফি বা পিপিজি প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। ঘড়ির নিচে থাকা অপটিক্যাল সেন্সর থেকে ত্বকের অভ্যন্তরে বিশেষ আলো নিক্ষেপ করা হয়। রক্তপ্রবাহের ওঠানামার সঙ্গে সেই আলোর প্রতিফলনে যে রূপান্তর ঘটে, তা বিশ্লেষণ করে অ্যালগরিদম হৃদস্পন্দনের সামগ্রিক গতি নির্ধারণ করে। এই প্রযুক্তির সাহায্যে একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে হৃদস্পন্দনের ছন্দে কোনো প্রকার বিচ্যুতি রয়েছে কি না, তার সাধারণ অনুমান পাওয়া সম্ভব। দীর্ঘ সময় ধরে কব্জিতে বাঁধা থাকার সুবাদে দৈনন্দিন স্বাভাবিক কাজকর্মের ফাঁকে মাঝেমধ্যে তৈরি হওয়া ছন্দপতনও এসব সেন্সরের নজরে আসার সুযোগ থাকে। বিশেষ করে অ্যাট্রিয়াল ফিব্রিলেশনের মতো গুরুতর ও অনিয়মিত হার্ট রিদমের প্রাথমিক ঝুঁকি শনাক্ত করতে পারে কিছু আধুনিক মডেল। স্বাভাবিক ছন্দের বাইরে কোনো ধারা পরিলক্ষিত হলে যন্ত্রটি ব্যবহারকারীকে স্ক্রিনে নোটিফিকেশন দিয়ে সতর্ক করে। তবে ঘড়ির এই সংকেত কোনোভাবেই চূড়ান্ত অসুস্থতার প্রমাণ নয়, বরং চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়ে ল্যাবরেটরি পরীক্ষার মাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া দরকার।
ইসিজি সুবিধাযুক্ত ঘড়ির নির্দিষ্ট অংশে কিছুক্ষণ আঙুল স্পর্শ করে রাখলে হৃদযন্ত্রের বৈদ্যুতিক তরঙ্গের একটি সংক্ষিপ্ত রূপরেখা সংরক্ষিত হয়। এই তথ্য চিকিৎসকদের কাছে রোগীর হার্ট রিদম পর্যালোচনার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ক্লু হিসেবে কাজ করতে পারে। বিশেষ করে যেসব ক্ষেত্রে সমস্যাটি ক্ষণস্থায়ী এবং হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই তা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে, সেখানে এই ডিজিটাল হিস্ট্রি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র জোগায়। উদাহরণস্বরূপ, গভীর রাতে ঘুমের মধ্যে ঘড়িতে যদি কোনো ছন্দপতনের রেকর্ড ধরা পড়ে এবং পরদিন সকালে হাসপাতালে সাধারণ ইসিজিতে কোনো অসংগতি না মেলে, তবুও সেই রাতের সংরক্ষিত ডেটা চিকিৎসকের পরবর্তী পর্যবেক্ষণ বা বিশদ পরীক্ষার সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে এসব সংবেদনশীল সেন্সর থেকে বিভ্রান্তিকর বা ভুল অ্যালার্ট আসার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। শরীর অতিরিক্ত নড়াচড়া করলে, কব্জির সঙ্গে ঘড়ির স্ট্র্যাপ সঠিকভাবে আঁটসাঁট না থাকলে কিংবা ত্বকের নিচে রক্তপ্রবাহে সাময়িক তারতম্য দেখা দিলে রিডিংয়ে ত্রুটি দেখা দিতে পারে। ফলে শারীরিক কোনো বাস্তব সংকট না থাকা সত্ত্বেও কখনো কখনো ত্রুটিপূর্ণ বিপদাশঙ্কা তৈরি হতে পারে। ঘড়ির পর্দায় আকস্মিক কোনো অস্বাভাবিক রিডিং দেখে আতঙ্কিত হওয়া যেমন অনুচিত, তেমনি সেটিকে সম্পূর্ণ অবহেলা করাও নিরাপদ নয়। বারবার এ ধরনের সতর্কবার্তা দেখা দিলে অথবা বুক ধড়ফড়, বুকে চিনচিনে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, হঠাৎ মাথা ঘোরা কিংবা তীব্র শারীরিক দুর্বলতার মতো উপসর্গ প্রকাশ পেলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া বাধ্যতামূলক। সার্বিকভাবে স্মার্টওয়াচকে শরীরের প্রাথমিক সতর্কবার্তা পাওয়ার একটি আধুনিক সহায়ক যন্ত্র হিসেবে বিবেচনা করাই সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন