সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬,

বাতিল হলো অন্তর্বর্তী সরকারের মানবাধিকার অধ্যাদেশ

জাতীয় ডেস্ক

এপ্রিল ৯, ২০২৬, ০২:৪২ পিএম

বাতিল হলো অন্তর্বর্তী সরকারের মানবাধিকার অধ্যাদেশ

জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের তীব্র আপত্তির মুখে পাস হয়েছে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (রহিতকরণ ও পুনঃপ্রচলন) বিল-২০২৬। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত সংসদ অধিবেশনে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বিলটি উত্থাপন করেন। পরে কণ্ঠভোটের মাধ্যমে বিলটি পাস হয়। এই নতুন আইন পাসের ফলে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালে জারি করা মানবাধিকার সংক্রান্ত বিশেষ অধ্যাদেশটি বাতিল হয়ে গেল। 

এর পরিবর্তে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রণীত ২০০৯ সালের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইনটি আবার দেশে পুনঃপ্রচলন করা হলো।

বিলটি উত্থাপনের শুরুতেই কুমিল্লা-৪ আসনের এনসিপি সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ এর কঠোর বিরোধিতা করেন এবং নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, আজ যারা সরকারি বেঞ্চে বসে এই বিল পাস করছেন, তারা চব্বিশের জুলাইয়ের আগে হলে নিশ্চিতভাবেই এর বিরোধিতা করতেন। 

তার মতে, এই অধ্যাদেশটি বাতিল করার মাধ্যমে মানবাধিকার কমিশনকে ভবিষ্যতে আবারো রাজনৈতিক দমন-পীড়নের একটি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার পথ প্রশস্ত করা হলো। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, সরকার সংখ্যাগরিষ্ঠতার দোহাই দিয়ে এই পরিবর্তন আনলেও এটি জাতির জন্য একটি ভুল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।সংসদ অধিবেশনে বক্তব্যের জন্য সময় বাড়ানোর দাবি জানিয়ে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, যে কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে বর্তমান সংসদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তার পেছনের ইতিহাস আমাদের ভুলে যাওয়া উচিত নয়। এ সময় আলোচনার জন্য বরাদ্দকৃত সময়কে তিনি অত্যন্ত অপ্রতুল বলে অভিহিত করেন।

 তার বক্তব্যে উঠে আসে ২০০৯ সালের মানবাধিকার আইনের অতীত প্রয়োগের নানা নেতিবাচক দিক। তিনি অভিযোগ করেন, গত ১৭ বছরে এই আইনটি ব্যবহার করে কীভাবে বিরোধী দল ও মতকে দমন করা হয়েছে তা দেশবাসী প্রত্যক্ষ করেছে। বিশেষ করে বিএনপি ও জামায়াতের নেতা-কর্মীদের ওপর দমন-পীড়নের বৈধতা দিতে এই কমিশনকে ব্যবহার করা হয়েছিল বলে তিনি মন্তব্য করেন।

বর্তমান স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের একটি পুরোনো উদ্ধৃতি টেনে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, অতীতে এই কমিশনকে ‍‍`বিরোধী দল দমন কমিশন‍‍` হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছিল। ২০০৯ সালের আইনের কাঠামো অনুযায়ী মানবাধিকার কমিশনের নির্বাচন কমিটিতে যে ব্যবস্থা রয়েছে, তাতে স্বচ্ছতা বজায় রাখা কঠিন। তিনি উল্লেখ করেন, স্পিকারের নেতৃত্বে গঠিত নির্বাচন কমিটিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী এবং সরকারি দলের সংসদ সদস্যসহ মোট ছয়জনের মধ্যে পাঁচজনই থাকেন সরকারদলীয় লোক। এমন একটি দলীয় প্রভাবাধীন বোর্ড থেকে নিরপেক্ষ কাজ আশা করা যায় না।

হাসনাত আবদুল্লাহর বক্তব্যের সময় শেষ হয়ে গেলে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বিষয়টির গুরুত্ব বিবেচনায় আলোচনার সময় বাড়ানোর অনুরোধ জানান। স্পিকার এরপর আরও দুই মিনিট সময় বরাদ্দ করলে হাসনাত পুনরায় আইনটির দুর্বলতা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ২০০৯ সালের আইন অনুযায়ী কোনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে তদন্ত করতে গেলে সেই বাহিনীরই পূর্বানুমতি নেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। যদি সরকার সংশ্লিষ্ট কোনো সংস্থা মানবাধিকার লঙ্ঘন করে, তবে তাদের বিরুদ্ধেই স্বচ্ছ তদন্ত করা এই আইনে প্রায় অসম্ভব।

অধিবেশনে আরও বলা হয়, এই বিলটি পাসের ফলে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ কার্যকারিতা হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে। এর মধ্যে একটি হলো গুম সংক্রান্ত অধ্যাদেশ এবং অন্যটি জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী দায়মুক্তি সংক্রান্ত অধ্যাদেশ। হাসনাত আবদুল্লাহর ভাষায়, আমরা ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিই না বলেই বারবার একই বৃত্তে আবর্তিত হচ্ছি। সময়ের পরিবর্তনে আজ যারা সরকারি দলে আছেন, তারা নিজেদের সুবিধামতো আইনের পরিবর্তন আনছেন যা নৈতিকতার বিচারে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে থাকবে। শেষ পর্যন্ত বিরোধীদের সব যুক্তি ও আপত্তি কণ্ঠভোটে নাকচ হয়ে যায় এবং বিলটি পাস হয়।