এপ্রিল ২৪, ২০২৬, ১০:২১ এএম
দেশের বিদ্যমান জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় সরকার ও বিরোধী দলের সমন্বয়ে জাতীয় ঐক্যের এক অনন্য নজির স্থাপিত হয়েছে জাতীয় সংসদে। একই সঙ্গে রাজধানী ঢাকায় পরিকল্পিতভাবে লোডশেডিং করে সেই বিদ্যুৎ গ্রামীণ কৃষি খাতে সরবরাহের ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শিক্ষা খাতের দীর্ঘদিনের দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে শ্বেতপত্র প্রকাশের প্রতিশ্রুতিসহ এই অধিবেশনটি দেশের সংসদীয় ইতিহাসে একটি তাৎপর্যপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
বৃহস্পতিবার বিকেলে শুরু হওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ২০তম দিনে সংসদীয় কার্যক্রমে এই অভাবনীয় পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। অধিবেশনের শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী দেশের বর্তমান জ্বালানি পরিস্থিতিকে একটি জাতীয় সংকট হিসেবে অভিহিত করেন।
তিনি বলেন, এই মুহূর্তের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কোনো একক পক্ষের পক্ষে সমাধান সম্ভব নয়। সংকট সমাধানে তিনি সরকার ও বিরোধী দলের ১০ জন সদস্যের সমন্বয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন।
প্রধানমন্ত্রীর এই সাহসী ও ঐক্যের আহ্বানকে স্বাগত জানিয়ে বিরোধী দলও সংকটের টেকসই সমাধানে পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে।সবচেয়ে আলোচিত বিষয়টি ছিল শহর ও গ্রামের মধ্যে বিদ্যুতের সুষম বণ্টন। বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী সংসদে জানান, বর্তমানে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ও উৎপাদনের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান বিদ্যমান। এই বৈষম্য কমাতে এবং বোরো মৌসুমে কৃষকদের নিরবচ্ছিন্ন সেচ সুবিধা নিশ্চিত করতে রাজধানী ঢাকায় পরীক্ষামূলকভাবে প্রতিদিন ১১০ মেগাওয়াট লোডশেডিং করা হবে। ঢাকার সাশ্রয় হওয়া এই বিদ্যুৎ সরাসরি গ্রামীণ কৃষি উৎপাদনশীল খাতে পাঠানো হবে। সরকারের এই পদক্ষেপকে অনেকেই বৈষম্যবিরোধী এবং বাস্তবধর্মী বলে প্রশংসা করছেন।
জ্বালানি খাতের পাশাপাশি শিক্ষা সংস্কার নিয়ে অধিবেশনে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে আসে। শিক্ষামন্ত্রী তার বক্তব্যে স্পষ্ট জানিয়েছেন, গত ১৬ বছরের শিক্ষা খাতে জেঁকে বসা দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা তদন্তে একটি পূর্ণাঙ্গ শ্বেতপত্র প্রকাশ করা হবে। ইতোমধ্যে জাল সনদের দায়ে ২০২ জন শিক্ষকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ঝুলে থাকা শূন্য পদগুলোতে দ্রুত নিয়োগ কার্যক্রম শুরু এবং মাদ্রাসা শিক্ষায় কারিগরি কোর্স চালুর মাধ্যমে বেকারত্ব দূর করার কর্মপরিকল্পনাও তুলে ধরেন তিনি।
গ্যাস সংকট নিয়েও সরকারের পক্ষ থেকে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। প্রতিমন্ত্রী জানান, বর্তমানে দেশে গ্যাসের দৈনিক চাহিদা ৩৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট হলেও সরবরাহ রয়েছে মাত্র ২৬৩৬ মিলিয়ন ঘনফুট। অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে তাৎক্ষণিকভাবে গ্যাস আমদানি বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। তবে আগামী ১৮০ দিনের মধ্যে উন্নয়ন কার্যক্রম দৃশ্যমান হবে এবং স্থানীয় গ্যাসের অগ্রাধিকার নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।
অধিবেশন চলাকালে সংসদ সদস্যরা নিজ নিজ এলাকার সমস্যাগুলো জোরালোভাবে উপস্থাপন করেন। উত্তরবঙ্গের সাথে সরাসরি রেল সংযোগ স্থাপন, শিল্প প্রতিষ্ঠানের আধুনিকায়ন এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নের দাবিগুলো গুরুত্বের সাথে নেওয়া হয়। আলোচনার শেষ পর্যায়ে স্পিকার সংসদীয় শিষ্টাচার বজায় রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন। অধিবেশনে সংসদ সদস্যদের মোবাইল ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ এবং কার্যপ্রণালী বিধি কঠোরভাবে মেনে চলার নির্দেশনা দেওয়া হয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে সংকট মোকাবিলায় এমন জাতীয় ঐক্য ও স্বচ্ছতা দেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রাকে আরও বেগবান করবে।


দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন