অক্টোবর ১, ২০২৬, ০৯:৩১ পিএম
চলতি ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে ১২ দশমিক ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এই প্রবৃদ্ধির হার ১০ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি বলে নিশ্চিত করেছে ঢাকায় অবস্থিত চীনা দূতাবাস। বৃহস্পতিবার গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠার ৭৭তম বার্ষিকী উপলক্ষে প্রকাশিত এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে দূতাবাস ব্যবসা-বাণিজ্য, প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ, জাতীয় অবকাঠামো এবং স্বাস্থ্যসেবায় দুই দেশের ক্রমবর্ধমান অংশীদারিত্বের সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরে।
দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় প্রবেশ করেছে। বিবৃতিতে জানানো হয়, ২০১০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত টানা ১৬ বছর ধরে বাংলাদেশের একক বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদারের অবস্থান ধরে রেখেছে চীন। বাণিজ্যিক সুবিধা সম্প্রসারণের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের তাজা আম ও কাঁঠাল ইতিমধ্যে দেশটির মূল বাজারে প্রবেশাধিকার পেয়েছে। এর পাশাপাশি দেশীয় পেয়ারা ও সুগন্ধি চালের জন্য শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া জোরদার করা হয়েছে। বাংলাদেশের সামগ্রিক রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের বৈষম্য নিরসনে উভয় দেশ একটি সুনির্দিষ্ট যৌথ কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে।
ক্রমবর্ধমান পণ্য বিনিময়ের পাশাপাশি বিনিয়োগের পরিসরও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৬ সালের জুন মাস পর্যন্ত বাংলাদেশে চীনের পুঞ্জীভূত সরাসরি বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে। এর আগে ২০২৫ সালে বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছিল। নতুন সরকার গঠনের পর চীনা অর্থায়নে পরিচালিত পাঁচটি বৃহৎ প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে ১০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি নতুন বিনিয়োগ নিশ্চিত করেছে, যার মাধ্যমে প্রায় ২০ হাজার স্থানীয় কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।
চলতি বছরের জুলাইয়ে চট্টগ্রামে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হওয়া ‘চীন অর্থনৈতিক ও শিল্প অঞ্চল’ ইতিমধ্যে মোট ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাব আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। এই বিশেষায়িত শিল্পাঞ্চলে মূলত তৈরি পোশাক ও বস্ত্র, ভারী যন্ত্রপাতি উৎপাদন, ইলেকট্রনিক্স ও তথ্যপ্রযুক্তি, বায়োমেডিসিন এবং পরিবেশবান্ধব সবুজ শক্তি উৎপাদন খাতের বিকাশকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
বৃহৎ অবকাঠামো নির্মাণে চীনের কারিগরি ও আর্থিক সহযোগিতাকে অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে উল্লেখ করেছে দূতাবাস। চীনা প্রতিষ্ঠানের নির্মিত পদ্মা বহুমুখী সেতু রাজধানীর সাথে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলাকে যুক্ত করেছে, যা দেশের বার্ষিক মোট দেশজ উৎপাদনে ১ দশমিক ২৩ শতাংশীয় পয়েন্ট অবদান রাখবে এবং জাতীয় দারিদ্র্যের হার শূন্য দশমিক ৮৪ শতাংশ কমিয়ে আনবে বলে সমীক্ষায় উঠে এসেছে। এছাড়া চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো দেশে কয়লা, সৌর ও বায়ুভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে, যার সম্মিলিত জাতীয় গ্রিড সরবরাহ ক্ষমতা এক হাজার মেগাওয়াটের বেশি।
বর্তমানে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চীন-সহায়তাপুষ্ট উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলেছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিট ও বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতু-৬ সংস্কারকাজ চলমান রয়েছে। একই সাথে একটি পূর্ণাঙ্গ সাধারণ হাসপাতাল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীদের জন্য বিশেষায়িত আবাসিক হল, বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতু-৯ এবং একটি আধুনিক জরুরি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার কাজ প্রক্রিয়াধীন। স্বাস্থ্য ও মানবিক সহায়তা খাতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশকে ৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি মূল্যের অনুদান দিয়েছে চীন।
এই সহায়তার অংশ হিসেবে ডেঙ্গু ও করোনাভাইরাস পরীক্ষার কিট, জীবনরক্ষাকারী ওষুধ, আগুনে পোড়া রোগীদের জন্য ভেন্টিলেটর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর রোবোটিক পুনর্বাসন সরঞ্জাম এবং দেশের বন্যাদুর্গতদের জন্য বিপুল পরিমাণ জরুরি ত্রাণসামগ্রী সরবরাহ করা হয়েছে। একই সঙ্গে এক হাজার শয্যার জেনারেল হাসপাতাল নির্মাণেও দেশটি সক্রিয় ভূমিকা রাখছে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন