বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর, ২০২৬,
দ্বীপে ভ্রমণ নীতিমালা

সেন্টমার্টিন ভ্রমণে বিধিনিষেধ শিথিলের উদ্যোগ সরকারের

জাতীয় ডেস্ক

অক্টোবর ১, ২০২৬, ০৮:১৬ পিএম

সেন্টমার্টিন ভ্রমণে বিধিনিষেধ শিথিলের উদ্যোগ সরকারের

কক্সবাজারের প্রবালসমৃদ্ধ সেন্টমার্টিন দ্বীপে পর্যটকদের ভ্রমণ ও রাত্রিযাপনের ওপর জারি করা বিধিনিষেধ শিথিল করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। পরিবেশবিদ, স্থানীয় বাসিন্দা এবং পর্যটন খাতের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে মতবিনিময় করে আগামী ১৫ অক্টোবরের মধ্যে একটি সমন্বিত নীতিমালা চূড়ান্ত করা হবে। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আগের জারি করা কঠোর ১২ দফা বিধিনিষেধের কিছু অংশে বাস্তবসম্মত পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে। দ্বীপের সার্বিক পরিবেশ রক্ষা ও পর্যটন খাতের ভারসাম্য ফেরাতে এই পদক্ষেপ।

এর আগে ২০২৪ সালের অক্টোবরে অন্তর্বর্তী সরকার সেন্টমার্টিনের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায় ১২টি সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা জারি করেছিল। ওই বিধিমালার অধীনে ফেব্রুয়ারি মাসে পর্যটকদের যাতায়াত পুরোপুরি বন্ধ রাখা হয়। রাত্রিযাপনের সুযোগ কেবল ডিসেম্বর ও জানুয়ারি এই দুই মাসে সীমাবদ্ধ ছিল। নতুন নির্দেশনায় এই সময়সীমা এবং রাত্রিযাপনের সুযোগের ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনার বিষয়টি সক্রিয় বিবেচনায় রয়েছে।

প্রায় ১০ হাজার স্থায়ী বাসিন্দার এই দ্বীপে প্রতিবছর অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারির মধ্যে বিপুলসংখ্যক পর্যটকের সমাগম ঘটে। পর্যটকদের আবাসন নিশ্চিত করতে স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি বাইরের উদ্যোক্তারাও বাণিজ্যিক ভিত্তিতে হোটেল ও রিসোর্ট গড়ে তুলেছেন। সেন্টমার্টিন হোটেল-মোটেল-রিসোর্ট মালিক সমিতির তথ্যমতে, দ্বীপে প্রায় দেড়শটির মতো আবাসিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেখানে অন্তত পাঁচ হাজার পর্যটকের থাকার ব্যবস্থা আছে। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিমালায় নভেম্বর মাসে পর্যটকদের শুধু দিনের বেলায় ভ্রমণের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল, রাতে অবস্থান পুরোপুরি নিষিদ্ধ ছিল।

বর্তমান সরকার রাত্রিযাপন সংক্রান্ত এই কড়াকড়ি তুলে নেওয়ার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম জানান, সাধারণ পর্যটকদের জন্য ছয় থেকে সাত ঘণ্টা নৌপথ পাড়ি দিয়ে দ্বীপে গিয়ে মাত্র দুই থেকে তিন ঘণ্টা থেকে আবার ফিরে আসা অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর ও অযৌক্তিক একটি চর্চা। তিনি উল্লেখ করেন যে পরিবেশমন্ত্রী আব্দুল আউয়াল মিন্টুর সঙ্গে আলোচনা করে তারা এই নিয়ম পরিবর্তনের বিষয়ে একমত হয়েছেন। যারা দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে যাবেন, তাদের যৌক্তিকভাবে রাত্রিযাপনের সুযোগ দেওয়াই ইতিবাচক পদক্ষেপ হবে।

ট্যুর অপারেটরদের পক্ষ থেকেও এই নিয়ম সংস্কারের দাবি জোরালো হয়েছে। বাংলাদেশ ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ রাফিউজ্জামানের মতে, রাত্রিযাপনের ওপর কড়াকড়ির কারণে পর্যটকরা মারাত্মকভাবে নিরুৎসাহিত হয়েছেন। বিপুল অর্থ ও দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে মাত্র কয়েক ঘণ্টার জন্য কেউ দ্বীপে যেতে চান না। তাই নীতিমালায় দ্রুত পরিবর্তন এনে পর্যটনকে সচল করার দাবি জানান তিনি।

তবে পর্যটক সংখ্যা ও ভ্রমণের সামগ্রিক সময়সীমা কতটা বাড়বে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। আগের নিয়মানুযায়ী ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে প্রতিদিন সর্বোচ্চ দুই হাজার পর্যটক রাত্রিযাপনের জন্য নির্ধারিত ওয়েবসাইটের মাধ্যমে অনুমোদন পেতেন। টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম অনীক চৌধুরী জানান, আগের নীতিমালা অনুযায়ী এখনও দৈনিক দুই হাজারের বেশি পর্যটক দ্বীপে গিয়ে অবস্থান করার সুযোগ নেই, কারণ নতুন কোনো সরকারি প্রজ্ঞাপন এখনো কার্যকর হয়নি। প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, দ্বীপের পরিবেশগত সীমাবদ্ধতা ও ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা সমন্বয় করে শুনানি শেষে ১৫ অক্টোবরের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ গাইডলাইন ঘোষণা করা হবে।

ভ্রমণ বিধিনিষেধ কিছুটা শিথিল হলেও পরিবেশ সুরক্ষায় প্লাস্টিক ও পলিথিন ব্যবহারে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। আগের নির্দেশনার আলোকেই রাতে সৈকতে বারবিকিউ পার্টি, আলোকসজ্জা, তীব্র শব্দ তৈরি, কেয়াবনে প্রবেশ এবং সামুদ্রিক কাছিম, প্রবাল, রাজকাঁকড়া ও ঝিনুকের ক্ষতিসাধন নিষিদ্ধ থাকছে। একইসঙ্গে সৈকতে যেকোনো ধরনের মোটরচালিত যানবাহন বা সি-বাইক চলাচলেও নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে। জাহাজ ছাড়ার আগেই পর্যটকদের তল্লাশি করে সিঙ্গেল পলিথিন ও প্লাস্টিক সামগ্রী জব্দ করার নির্দেশ দেওয়া হবে এবং কোস্টগার্ডসহ পরিবেশকর্মীরা এ দায়িত্ব কঠোরভাবে পালন করবেন।