অক্টোবর ৩০, ২০২৬, ১২:০৫ পিএম
স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বের হয়ে আসার প্রস্তুতির সুবিধার্থে বাংলাদেশকে অতিরিক্ত তিন বছর সময় দিয়েছে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ। এর ফলে এলডিসি উত্তরণের পূর্ণ প্রস্তুতির জন্য ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত বাড়তি সময় পাচ্ছে বাংলাদেশ। একই প্রস্তাবে সমান সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে প্রতিবেশী দেশ নেপালের জন্যও।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে সর্বসম্মতিক্রমে এই ঐতিহাসিক প্রস্তাবটি গৃহীত হয়।
উত্তরণ প্রক্রিয়ার কারণে দেশ দুটির বিদ্যমান উন্নয়ন পরিকল্পনা, দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি ও চলমান প্রকল্পগুলো যাতে কোনোভাবেই বাধাগ্রস্ত না হয় এবং কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়, সেই বিবেচনায় এই বাড়তি সময় মঞ্জুর করা হয়েছে। সাধারণ পরিষদের এই অধিবেশনে `গ্রুপ অব ৭৭ ও চীন`-এর পক্ষে প্রস্তাবটি আনুষ্ঠানিকভাবে উত্থাপন করে লাতিন আমেরিকার দেশ উরুগুয়ে।
পূর্বনির্ধারিত সময়সূচি অনুসারে, ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের চূড়ান্ত উত্তরণ ঘটার কথা ছিল। তবে জাতিসংঘে গৃহীত নতুন প্রস্তাবে সুস্পষ্টভাবে স্বীকার করা হয়েছে যে, উত্তরণের নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণ করলেই একটি দেশের অন্তর্নিহিত কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে দূরীভূত হয়ে যায় না।
প্রস্তাবে অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক ও নীতিগত সংস্কারের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান ও তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতি অর্জনের জন্য বাংলাদেশকে তাগিদ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নেপালকে তাদের সামগ্রিক উত্তরণ কৌশল নতুন করে সাজাতে এবং অগ্রাধিকার নির্ধারণে একটি সুনির্দিষ্ট ও সময়াবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি।
প্রস্তাবটি উত্থাপনকালে উরুগুয়ে জানায়, বিগত বছরগুলোতে করোনাভাইরাস মহামারি, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খলে ধারাবাহিক বিঘ্ন ঘটার মতো একের পর এক অভিঘাত দেশগুলোর উত্তরণ প্রক্রিয়াকে মারাত্মক জটিল করে তুলেছে। গ্রুপ অব ৭৭ ও চীন আরও উল্লেখ করে, প্রবাসী কর্মীদের কর্মসংস্থান সংকট, রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়ের ওঠানামা এবং পর্যটন খাতের দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তার মতো বাহ্যিক ধাক্কাগুলো অভ্যন্তরীণ দুর্বলতাকে বহুলাংশে বাড়িয়ে দিয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষে আয়ারল্যান্ড এই সময়সীমা বৃদ্ধির সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানালেও স্পষ্ট করে বলেছে, এটি একটি ব্যতিক্রমী ও সুনির্দিষ্ট সময়াবদ্ধ পদক্ষেপ হওয়া বাঞ্ছনীয়। একই সাথে পুরো বিষয়টি `কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি` (সিডিপি)-এর বাস্তবভিত্তিক সংকট মূল্যায়নের ভিত্তিতেই নির্ধারিত হতে হবে। এক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট ও পরিমাপযোগ্য সংস্কার বাস্তবায়নের ওপর বিশেষ জোর দিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। জোটটি সতর্ক করে জানায়, উত্তরণের মানদণ্ড অর্জনের পরও দীর্ঘ সময় ধরে কোনো দেশকে এলডিসি তালিকায় রেখে দিলে সার্বিক আন্তর্জাতিক কাঠামোর কার্যকারিতা দুর্বল হতে পারে এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের ইতিবাচক বার্তা ও অন্যান্য সুবিধা পেতে অনাকাঙ্ক্ষিত বিলম্ব ঘটতে পারে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন আরও উল্লেখ করে, বিদ্যমান প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো অনুযায়ী কেবল অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পটপরিবর্তন কোনো সময়সীমা বাড়ানোর যুক্তিসঙ্গত কারণ হতে পারে না; তবে বাংলাদেশ ও নেপালের ক্ষেত্রে বিরাজমান বিশেষ পরিস্থিতি ও চ্যালেঞ্জগুলোকে তারা বিবেচনায় নিয়েছে।
এদিকে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের পক্ষে অবস্থান জানিয়ে কানাডা উভয় দেশকে সংস্কার কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে নিতে, সমন্বিত কৌশল বাস্তবায়ন করতে এবং নিয়মিত বিরতিতে অগ্রগতির আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদন জমা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশের জাতীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক বহুমুখীকরণ এবং বৈশ্বিক সহনশীলতা জোরদার করতে টেকসই সংস্কারের তাগিদ দিয়েছে ফ্রান্স।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি ড. খলিলুর রহমান এই সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে স্পষ্টভাবে বলেন, এই সময়সীমা বাড়ানোর অর্থ কোনোভাবেই হাত গুটিয়ে বসে থাকার সুযোগ তৈরি হওয়া নয়।
তিনি বাংলাদেশ সরকারকে জাতীয় অগ্রাধিকারের সঙ্গে সংগতি রেখে এবং উত্তরণ প্রক্রিয়ার ফলে জীবিকার সম্ভাব্য ঝুঁকিতে পড়তে যাওয়া সাধারণ মানুষের প্রকৃত চাহিদার সঙ্গে সমন্বয় করে নিশ্চিত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি সহায়তা প্রদানের জোরালো আহ্বান জানান।
জাতিসংঘের রেকর্ডে দেখা যায়, স্বাধীনতার পর ১৯৭৫ সালের ডিসেম্বর মাসে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকায় প্রথম অন্তর্ভুক্ত হয় বাংলাদেশ। পরবর্তীতে ২০১৮ ও ২০২১ সালের ধারাবাহিক আনুষ্ঠানিক পর্যালোচনায় এলডিসি থেকে উত্তরণের নির্ধারিত তিনটি মানদণ্ডই সফলভাবে পূরণ করতে সক্ষম হয় দেশটি। এই সূচকগুলোর মধ্যে ছিল মাথাপিছু মোট জাতীয় আয়, মানব সম্পদ সূচক এবং অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ভঙ্গুরতা সূচক।
এরই ধারাবাহিকতায় ২০২১ সালের নভেম্বর মাসে সাধারণ পরিষদ বাংলাদেশের উত্তরণের প্রস্তাবটি চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছিল। সে সময় বৈশ্বিক মহামারি পরিস্থিতির অভিঘাত বিবেচনায় দেশকে পাঁচ বছর মেয়াদি একটি বিশেষ প্রস্তুতিমূলক সময় দেওয়া হয়েছিল। তবে পরবর্তীতে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক প্রতিকূল পরিস্থিতি ও ধারাবাহিক সংকটের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে ধরে ২০২৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘে অতিরিক্ত আরও তিন বছর সময় বৃদ্ধির আনুষ্ঠানিক অনুরোধ পেশ করেছিল বাংলাদেশ।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন