অক্টোবর ২৯, ২০২৬, ০৮:৪২ পিএম
জাপানের অভ্যন্তরীণ শ্রমবাজারের ক্রমবর্ধমান চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে দেশটিতে প্রতি বছর এক লাখ দক্ষ জনশক্তি পাঠানোর সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ। এ প্রক্রিয়ায় কারিগরি প্রশিক্ষণার্থী, নির্দিষ্ট দক্ষতাসম্পন্ন কর্মী এবং উচ্চশিক্ষিত পেশাজীবীদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সুযোগ দেওয়া হবে বলে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে।
চার দিনের সরকারি সফর সম্পন্ন করে বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) দেশে ফেরার পথে নারিতা বিমানবন্দরে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা আটকে ছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তাকে বহনকারী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিশেষ ফ্লাইটে হঠাৎ কারিগরি ত্রুটি দেখা দেওয়ায় এই বিলম্ব ঘটে। পরবর্তীতে প্রকৌশলীরা উড়োজাহাজের ত্রুটি পুরোপুরি মেরামত করলে স্থানীয় সময় রাত ১০টা ৪৫ মিনিটে ফ্লাইটটি ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের উদ্দেশে যাত্রা করে।
এর আগে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে গত ২৬ অক্টোবর রাষ্ট্রীয় সফরে টোকিও পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী। ওই সফরে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণের পাশাপাশি জ্বালানি, অবকাঠামো উন্নয়ন, তথ্যপ্রযুক্তি এবং কর্মসংস্থান খাতে অংশীদারত্ব বৃদ্ধির বিষয়ে উচ্চপর্যায়ের বিস্তারিত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
প্রধানমন্ত্রীর এই ঐতিহাসিক সফরে দুই দেশের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক অংশীদারত্বকে অনন্য উচ্চতায় নিতে ছয়টি দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা দলিল স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে চারটি সহযোগিতা স্মারক, একটি আনুষ্ঠানিক অনুদান চুক্তি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় যৌথভাবে কাজ করার একটি লিখিত অভিপ্রায়পত্র।
এছাড়া বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ দুটি গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্পে প্রায় ৪৬৫ কোটি ৬০ লাখ জাপানি ইয়েন ঋণ সহায়তা প্রদানের আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতি দিয়েছে জাপান সরকার। এই ঋণের অর্থ বিনিয়োগ পরিবেশের গুণগত উন্নয়ন প্রকল্প এবং উপজেলা পরিচালন ও উন্নয়ন প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায় বাস্তবায়নে ব্যয় করা হবে।
সরকারি সমঝোতার সমান্তরালে বেসরকারি খাতেও বিপুল সাড়া মিলেছে। জাপান বৈদেশিক বাণিজ্য সংস্থার যৌথ উদ্যোগে দুই দেশের শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ১৭টি পৃথক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে।
এই সমন্বিত বাণিজ্যিক উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো দুই দেশের সরাসরি বাণিজ্য সম্প্রসারণ, জাপানি পুঁজি বিনিয়োগের পথ সুগম করা এবং নতুন বহুমুখী কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা। একই সাথে বাংলাদেশে আগামী পাঁচ বছরে জাপানি বেসরকারি খাতের পক্ষ থেকে প্রায় এক লাখ কোটি ইয়েন বিনিয়োগের বিপুল সম্ভাবনা নিয়েও নীতিগত আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণ এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিসহ সম্ভাবনাময় শিল্পগুলোতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির আগ্রহ প্রকাশ করেছে উভয় পক্ষ।
সফরের দ্বিতীয় অংশে প্রধানমন্ত্রী জাপানের সর্বাধুনিক শিল্পকারখানা, জ্বালানি অবকাঠামো এবং আধুনিক সরবরাহ ব্যবস্থার মাঠপর্যায়ের কর্মপদ্ধতি প্রত্যক্ষ করেন।
তিনি ফুতসু এলাকায় অবস্থিত জেরা প্রতিষ্ঠানের সর্বাধুনিক তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস টার্মিনাল ও তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং ইচিকাওয়ায় বহুজাতিক নিটসু লজিস্টিকস হাব পরিদর্শন করেন। বৃহস্পতিবার নাগোয়া শহরে বিশ্বখ্যাত টয়োটা মোটর করপোরেশনের মোটোমাচি কারখানা এবং শিল্প ও প্রযুক্তির ইতিহাস সংরক্ষণকারী টয়োটা স্মারক জাদুঘর ঘুরে দেখেন তিনি। এসব সরেজমিন পরিদর্শনের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয় গাড়ি উৎপাদন, ভারী প্রকৌশল প্রযুক্তি এবং আধুনিক জাপানি শিল্প ব্যবস্থাপনার বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ সৃষ্টি হয়।
জাপানে বাৎসরিক এক লাখ কর্মী পাঠানোর সরকারি এই পরিকল্পনা পূর্ণাঙ্গ রূপ পেলে তা বাংলাদেশের অর্থনীতি ও দক্ষ জনশক্তির জন্য এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করবে। তবে এই বিশাল লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নে কোন কোন নির্দিষ্ট শিল্পে কতজন কর্মী নিয়োগ পাবেন, তাদের জাপানি ভাষা ও কারিগরি দক্ষতার মান কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, সে সংক্রান্ত বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করছেন শ্রম অভিবাসন বিশ্লেষকেরা।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন