বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২৬,
নতুন সরকারি বিধিমালা

ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচলে নতুন বিধিমালা জারি করল সরকার

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

অক্টোবর ২৯, ২০২৬, ০৭:৫৬ পিএম

ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচলে নতুন বিধিমালা জারি করল সরকার

দেশের সব সিটি করপোরেশন এলাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশা বা ই-রিকশা চলাচলের জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করে নতুন বিধিমালা জারি করেছে সরকার। এই নতুন নির্দেশনা অনুসারে, আনুষ্ঠানিক নিবন্ধন ছাড়া কোনো অবস্থাতেই সড়কে কোনো ই-রিকশা নামানো যাবে না।

জাতীয় মহাসড়ক, এক্সপ্রেসওয়ে ও প্রধান বাস করিডোরে এসব তিন চাকার বাহন চলাচল পুরোপুরি নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত একটি আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। ‍‍`সিটি কর্পোরেশন এলাকায় তিন চাকার স্বল্পগতির ব্যাটারিচালিত রিকশা (ই-রিকশা) চলাচল বিধিমালা, ২০২৬‍‍` শিরোনামে জারি করা এই প্রজ্ঞাপন অবিলম্বে কার্যকর হবে বলে জানানো হয়েছে।

বিধিমালায় উল্লেখ করা হয়েছে, প্রতিটি সিটি করপোরেশন সরকারের পূর্বানুমতি সাপেক্ষে স্থানীয় ট্রাফিক বিভাগের সঙ্গে সরাসরি পরামর্শ করে নিজ এলাকার মোট ই-রিকশার সর্বোচ্চ সংখ্যা নির্ধারণ করবে। ক্ষেত্রবিশেষে পুরো সিটি করপোরেশন এলাকা অথবা জোনভিত্তিক নির্দিষ্ট সীমানায় এসব যান চলাচলের অনুমতি দেওয়া যাবে।

সড়কে শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা রক্ষায় যানের সর্বোচ্চ গতিবেগ নির্ধারণ করা হয়েছে। সাধারণ সড়কে ই-রিকশার গতিসীমা ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ২৫ কিলোমিটারের মধ্যে রাখতে হবে। তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, উপাসনালয় এবং ঘনবসতিপূর্ণ বা জনবহুল এলাকায় এই গতিসীমা নেমে আসবে ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১৫ কিলোমিটারে। প্রতিটি ই-রিকশায় গতি পরিমাপক স্পিডোমিটার বা ওডোমিটার সংযোজন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

চলাচলের ক্ষেত্রে জাতীয় মহাসড়ক, এক্সপ্রেসওয়ে, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, প্রধান গণপরিবহন করিডোর এবং প্রশাসনিকভাবে নিষিদ্ধ যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ সড়কে ই-রিকশা প্রবেশ করতে পারবে না। ফুটপাতে বাহন চালানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। চালকদের সর্বদা সড়কের বাম দিকের লেন মেনে চলতে হবে। গাড়ি চালানো অবস্থায় মোবাইল ফোনের ব্যবহার, নিয়মবহির্ভূত ওভারটেকিং এবং বারবার ঝুঁকিপূর্ণ লেন পরিবর্তন নিষিদ্ধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

যাত্রী পরিবহনের ক্ষেত্রে চালক ছাড়া আকারভেদে সর্বোচ্চ দুই অথবা চারজন যাত্রী তোলা যাবে। যাত্রীদের ব্যক্তিগত ও বহনযোগ্য মালামাল ছাড়া অন্য কোনো ধরনের ভারী বাণিজ্যিক পণ্য পরিবহন করা যাবে না। একই সঙ্গে নগর এলাকায় শব্দদূষণ রোধে ৪০ ডেসিবেলের বেশি তীব্রতার হর্ন বাজানো নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

নিবন্ধনের ক্ষেত্রে আবেদনকারীকে অবশ্যই বাংলাদেশের বৈধ নাগরিক হতে হবে। আবেদনের সাথে জাতীয় পরিচয়পত্রের সত্যায়িত ফটোকপি, সদ্য তোলা দুই কপি পাসপোর্ট আকারের সত্যায়িত ছবি, নির্ধারিত ব্যাংকে ফি জমার রসিদ এবং উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের ফিটনেস সনদ জমা দিতে হবে। সব শর্ত পূরণ হলে আবেদন যাচাই-বাছাই শেষে ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে চূড়ান্ত নিবন্ধন প্রদান করা হবে।

প্রতিটি অনুমোদিত বাহনে কিউআর কোডযুক্ত স্বতন্ত্র নিবন্ধন নম্বর ও নম্বর প্লেট সরবরাহ করা হবে, যা গাড়ির দৃশ্যমান স্থানে প্রদর্শন করতে হবে। নিবন্ধনের মোট মেয়াদ হবে পাঁচ বছর। একটি জাতীয় পরিচয়পত্রের বিপরীতে এক বা একাধিক সিটি করপোরেশন মিলিয়ে সর্বোচ্চ পাঁচটি ই-রিকশার মালিকানা নেওয়া যাবে। তবে এক সিটি করপোরেশনে নিবন্ধিত বাহন অন্য কোনো সিটি করপোরেশন এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে চালানো যাবে না।

ফি কাঠামোর ক্ষেত্রে দুই যাত্রী ধারণক্ষমতার ই-রিকশার এককালীন নিবন্ধন ফি আট হাজার টাকা এবং বার্ষিক নবায়ন ফি চার হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। চার যাত্রী ধারণক্ষমতার বাহনের জন্য নিবন্ধন ফি ১০ হাজার টাকা এবং প্রতি বছরের নবায়ন ফি পাঁচ হাজার টাকা নির্ধারণ করেছে সরকার। এছাড়া সব ধরনের ই-রিকশার ফিটনেস সনদের সরকারি ফি রাখা হয়েছে এক হাজার টাকা। সিটি করপোরেশন বিনামূল্যে কিউআর কোডযুক্ত নম্বর প্লেট ও ব্লু-বুক সরবরাহ করবে, এবং আদায়কৃত সব অর্থ সংশ্লিষ্ট করপোরেশনের নিজস্ব রাজস্ব আয় হিসেবে গণ্য হবে।

প্রযুক্তিগত নিরাপত্তার প্রশ্নে প্রতিটি ই-রিকশাকে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) নির্ধারিত কারিগরি মানদণ্ড শতভাগ পূরণ করতে হবে। ফিটনেস সনদ এবং ট্রাফিক বিভাগের প্রতিস্বাক্ষর ছাড়া কোনো নিবন্ধন বা নবায়ন কার্যকর হবে না। বর্তমানে যেসব বাহন সড়কে রয়েছে, সেগুলোকে নির্ধারিত প্রকৌশল মানদণ্ড অনুযায়ী কাঠামোগত পরিবর্তন এনে নতুন করে অনুমোদন নিতে হবে। প্রতিটি যানের অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল নির্ধারণ করা হয়েছে নিবন্ধনের তারিখ থেকে সর্বোচ্চ ১২ বছর, যা অতিক্রান্ত হলে নিবন্ধন বাতিল হবে। বাহনগুলোকে পর্যায়ক্রমে বাধ্যতামূলক বিমার আওতায় আনার পরিকল্পনাও রয়েছে।

সিটি করপোরেশন ও সংশ্লিষ্ট ট্রাফিক বিভাগ যৌথভাবে জোনভিত্তিক রুট নির্ধারণ করবে। এক জোনের বাহন অন্য জোনে চলাচল করতে পারবে না এবং জোনভেদে ই-রিকশার জন্য নির্দিষ্ট রং ও সংখ্যা বরাদ্দ থাকবে।

পার্কিং ও চার্জিংয়ের বিষয়ে প্রতিটি ওয়ার্ডে নির্ধারিত পার্কিং এলাকা চিহ্নিত করা হবে। ব্যাটারি চার্জ করার ক্ষেত্রে কেবল অনুমোদিত ও লাইসেন্সধারী পয়েন্ট বা গ্যারেজ ব্যবহার করা যাবে, যেখানে সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবস্থা রাখতে হবে। চোরাই বা অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়ে চার্জ দিলে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পরিবেশ সুরক্ষায় পুরোনো বা নষ্ট ব্যাটারি যত্রতত্র ফেলা, উন্মুক্ত জলাশয় বা মাটিতে ফেলা এবং সাধারণ বর্জ্যের সাথে পোড়ানো নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের আনুষ্ঠানিক ছাড়পত্র ছাড়া ব্যাটারি রিসাইক্লিং বা গলানো সম্পূর্ণ বেআইনি।

যানবাহন উৎপাদনকারী শিল্পপ্রতিষ্ঠান অনুমোদনের জন্য স্থানীয় সরকার বিভাগের একজন অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। এই কমিটি বুয়েটের প্রযুক্তিগত মান যাচাই করে কারখানাগুলোকে অনুমোদন দেবে।

দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে চালকের দায়বদ্ধতা স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে গাড়ি থামিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে আহত ব্যক্তিকে চিকিৎসা সহায়তা দিতে হবে এবং নিকটস্থ পুলিশকে অবহিত করতে হবে।

নিবন্ধনহীন বাহন পরিচালনা, গতিসীমা লঙ্ঘন, অতিরিক্ত যাত্রী বহন, অননুমোদিত ব্যাটারি ও মোটর ব্যবহার, ঝুঁকিপূর্ণভাবে গাড়ি চালানো, ট্রাফিক আইন অমান্য করা কিংবা দুর্ঘটনার পর পালিয়ে যাওয়া শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। ট্রাফিক বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা সমন্বিত বা পৃথকভাবে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে নিয়মিত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।