বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২৬,
পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে পাওয়ার স্টার্টআপের অনুমোদন

জাতীয় ডেস্ক

অক্টোবর ২৯, ২০২৬, ০৮:৫৬ পিএম

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে পাওয়ার স্টার্টআপের অনুমোদন

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে বাণিজ্যিকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং জাতীয় গ্রিডে পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ সরবরাহের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছাতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ সবুজ সংকেত মিলেছে। প্রয়োজনীয় ফিজিক্যাল স্টার্টআপের কারিগরি ধাপ সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার পর কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিটে ‍‍`স্টেজ-সি‍‍` বা পাওয়ার স্টার্টআপ কার্যক্রম শুরুর চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (বায়েরা)।

বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) সন্ধ্যায় নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. জাহেদুল হাসান এই আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। বায়েরার চেয়ারম্যান এম মাহমুদুল হাসান প্রথম ইউনিটের এই গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রক্রিয়ার অনুমোদন সংক্রান্ত চিঠিতে স্বাক্ষর করেন।

এই নিয়ন্ত্রক অনুমোদনের ফলে কেন্দ্রটির রিঅ্যাক্টরের তাপীয় ক্ষমতা ধাপে ধাপে বৃদ্ধি, অভ্যন্তরীণ টারবাইন ও জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং পরবর্তীতে জাতীয় সঞ্চালন লাইনে পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ সরবরাহের মহড়া পরিচালনার পথ উন্মুক্ত হলো। প্রকল্প সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা আশা করছেন, চলমান পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও কমিশনিংয়ের কাজ নির্ধারিত সময়সূচি মেনে সম্পন্ন হলে আগামী মাসেই জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হতে পারে রূপপুরের উৎপাদিত প্রথম বিদ্যুৎ।

এর আগে প্রথম ইউনিটের বি-২ ধাপের ফিজিক্স টেস্টসহ প্রয়োজনীয় সব পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন করে কেন্দ্রটির পরিচালনা কর্তৃপক্ষ। সেই সব কারিগরি পরীক্ষার বিশদ ফলাফল ও মূল্যায়ন প্রতিবেদন বায়েরার কাছে জমা দেওয়ার পরই সার্বিক নিরাপত্তা ও কাঠামোগত সক্ষমতা যাচাই করে স্টেজ-সি পর্যায়ের এই ট্রায়াল অপারেশনাল বা পরীক্ষামূলক পরিচালনার লাইসেন্স দেওয়া হয়।

এনপিসিবিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. জাহেদুল হাসান জানান, ফিজিক্যাল স্টার্টআপের সফল সমাপ্তির পর কেন্দ্রটি এখন সরাসরি বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রাথমিক স্তরে প্রবেশ করছে।

তিনি উল্লেখ করেন, স্টেজ-সি কার্যক্রমে রিঅ্যাক্টরের কার্যক্ষমতা, প্রাথমিক ও দ্বিতীয় পর্যায়ের কুল্যান্ট ব্যবস্থার তাপ নিয়ন্ত্রণ, টারবাইন-জেনারেটর ব্যবস্থা, পুরো প্ল্যান্টের বৈদ্যুতিক বিতরণ গ্রিড, আধুনিক যন্ত্রপাতি ও কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং সংবেদনশীল সুরক্ষা ব্যবস্থার ধারাবাহিক কার্যকারিতা সরেজমিনে নিরীক্ষা করা হবে। এই পরীক্ষার মূল লক্ষ্য হলো কোনো জরুরি পরিস্থিতিতে সমস্ত সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা একে অপরের সাথে নিখুঁতভাবে সমন্বয় বজায় রেখে কাজ করছে কিনা এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রটি দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ, স্থিতিশীল ও নির্ভরযোগ্যভাবে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ পাঠাতে সক্ষম কিনা তা নিশ্চিত করা।

ড. জাহেদুল হাসান আরও জানান, এ ধাপে রিঅ্যাক্টরের ক্ষমতা একবারে না বাড়িয়ে নিয়ন্ত্রিত উপায়ে ধাপে ধাপে বৃদ্ধি করা হবে। একই সাথে টারবাইনের স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং জেনারেটর পরিচালন প্যারামিটার সার্বক্ষণিক নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হবে। পুরো কমিশনিং পর্বে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, বায়েরা, জাতীয় গ্রিড পরিচালনাকারী সংস্থা পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং পারমাণবিক জরুরি পরিস্থিতি ব্যবস্থাপনা সংস্থাগুলোর সাথে নিরবচ্ছিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় রক্ষা করা হবে।

স্টেজ-সি ধাপের সবচেয়ে ঐতিহাসিক মুহূর্ত হবে যখন রূপপুরের জেনারেটরটিকে প্রথমবারের মতো জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের ফ্রিকোয়েন্সির সাথে সিঙ্ক্রোনাইজ বা সংযুক্ত করা হবে।

প্রকল্পের কারিগরি সূত্র জানিয়েছে, প্রাথমিক পর্যায়ে রিঅ্যাক্টরের ক্ষমতা সর্বনিম্ন মাত্রায় রেখে পরীক্ষা শুরু হবে। এরপর প্রাপ্ত তথ্যের বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের ভিত্তিতে পর্যায়ক্রমে ক্ষমতা বাড়ানো হবে। রিঅ্যাক্টরের তাপীয় ক্ষমতা ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশে উন্নীত হলেই জেনারেটর জাতীয় গ্রিডের সাথে যুক্ত হবে এবং পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করা যাবে।

পাবনার ঈশ্বরদীতে বাস্তবায়নাধীন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে এক হাজার ২০০ মেগাওয়াট উৎপাদনক্ষমতার দুটি ইউনিট নির্মাণ করা হচ্ছে। দুটি ইউনিটই পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে জাতীয় গ্রিডে মোট দুই হাজার ৪০০ মেগাওয়াট পরিবেশবান্ধব ও নিরবচ্ছিন্ন বেসলোড বিদ্যুৎ যুক্ত হবে। কেন্দ্রটির বাণিজ্যিক যাত্রা বাংলাদেশকে বিশ্বের ৩৩তম বাণিজ্যিক পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশের অভিজাত তালিকায় আনুষ্ঠানিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করবে।

উল্লেখ্য, রূপপুর প্রকল্পের প্রাথমিক নির্মাণ মেয়াদ ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্ধারিত ছিল। পরবর্তীতে দুই দফায় সময়সীমা বৃদ্ধি করে তা ২০২৮ সালের জুন মাস পর্যন্ত পুনর্নির্ধারণ করা হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে মার্কিন ডলারের বিনিময় হারের বড় ধরনের উল্লম্ফন এবং অন্যান্য বৈশ্বিক আর্থিক জটিলতার কারণে প্রকল্পটির সার্বিক নির্মাণ ব্যয় বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকায়।