বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২৬,
ইসরায়েলে রাজনৈতিক অচলাবস্থা

ইসরায়েলের নির্বাচনে আরব দলগুলোর সমঝোতায় ঝুলছে নেতানিয়াহুর ভবিষ্যৎ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

অক্টোবর ২৯, ২০২৬, ১০:৪১ পিএম

ইসরায়েলের নির্বাচনে আরব দলগুলোর সমঝোতায় ঝুলছে নেতানিয়াহুর ভবিষ্যৎ

ছবি: সংগৃহীত

ইসরায়েলের জাতীয় সংসদ নেসেটের সাধারণ নির্বাচনে কোনো একক রাজনৈতিক দল বা প্রতিষ্ঠিত জোট সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় জাদুকরি সংখ্যা স্পর্শ করতে না পারায় দেশটিতে এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্স এবং দ্য জেরুজালেম পোস্টের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ১২০ আসনের পার্লামেন্টে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ডানপন্থি ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী জোট কিংবা সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোট ও জাইর লাপিদের নেতৃত্বাধীন বিরোধী শিবির; কোনো পক্ষই সরকার গঠনের জন্য ন্যূনতম ৬১টি আসনের কোরাম পূরণ করতে পারেনি।

এই গাণিতিক সমীকরণের ভেতরেই উঠে এসেছে দেশটির রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে নাটকীয় পরিবর্তন।

দশকের পর দশক ধরে ইসরায়েলি রাজনীতিতে নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত, প্রান্তিক ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কাঠামো থেকে বর্জিত ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত ইসরায়েলি আরব রাজনৈতিক দলগুলো হঠাৎ করেই জেরুজালেমের সরকার গঠনের মূল চাবিকাঠি বা ‍‍`কিংমেকার‍‍` ভূমিকায় আবির্ভূত হয়েছে। বিশেষ করে মনসুর আব্বাসের ইউনাইটেড আরব লিস্ট বা রা‍‍`আম এবং আয়মান ওদেহ ও আহমদ তিবিদের নেতৃত্বাধীন হেদাশ-তা‍‍`আলের জয়েন্ট লিস্টের ওপর এখন নির্ভর করছে আগামী দিনের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভারসাম্য।

ইসরায়েলের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এখন তার বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের সবচেয়ে সংবেদনশীল ও চরম দ্বিমুখী অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি হয়েছেন।

আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) রাজনৈতিক বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে, নিজের রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে এবং ক্ষমতা ধরে রাখতে হলে নেতানিয়াহুকে যেকোনো উপায়ে ৬১টি আসনের সমর্থন নিশ্চিত করতেই হবে। কিন্তু তার সামনে থাকা দুটি বিকল্পের প্রতিটিই তার নিজস্ব রাজনীতির জন্য আত্মঘাতী।

প্রথমত, নেতানিয়াহুর বর্তমান জোটের মূল শক্তি হলো কট্টর ইহুদিবাদী অতি-অর্থোডক্স ও উগ্র ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী দলগুলো, যারা ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত কোনো আরব দলের সাথে রাজনৈতিক আপস করার সম্পূর্ণ বিরোধী।

দ্বিতীয়ত, নিজের সরকার বাঁচাতে নেতানিয়াহু যদি কোনোভাবে মনসুর আব্বাসের রা‍‍`আম পার্টির সাথে গোপন সমঝোতা করেন কিংবা সংসদে তাদের ভোটদানে বিরত থাকার নীরব সহায়তা নেন, তবে তার উগ্র ডানপন্থি শরিকরা মুহূর্তের মধ্যে জোট ভেঙে বেরিয়ে যাবে।

এই রাজনৈতিক জটিলতার সাথে সরাসরি যুক্ত হয়েছে নেতানিয়াহুর ব্যক্তিগত আইনি ভবিষ্যৎ। দেশটির আদালতে বিচারাধীন একাধিক দুর্নীতির মামলা ও বিচারিক প্রক্রিয়ার কারণে ক্ষমতাচ্যুত হওয়া মাত্রই তার বিরুদ্ধে কারাদণ্ডের মতো চরম আইনি পদক্ষেপের বাস্তব ঝুঁকি রয়েছে। ফলে একসময় যাদের তিনি চরম রাজনৈতিক শত্রু বিবেচনা করতেন, সেই ফিলিস্তিনি আরব দলগুলোর দরকষাকষির ওপরই এখন নেতানিয়াহুর টিকে থাকা বা নিশ্চিত পতন সরাসরি নির্ভর করছে।

ইসরায়েলের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২১ শতাংশ ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত আরব নাগরিক, যাদেরকে আইনগতভাবে ইসরায়েলি আরব হিসেবে গণ্য করা হয়।

দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে মূলধারার রাজনীতিতে তাদের ভূমিকা কেবল বিরোধী দলের নীরব আসনেই সীমাবদ্ধ ছিল। তবে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক সাময়িকী ফরেন পলিসি এবং কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার মূল্যায়ন বলছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক রণকৌশলের মৌলিক পরিবর্তন তাদেরকে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে এনে দাঁড় করিয়েছে।

রা‍‍`আম দলের প্রধান মনসুর আব্বাস কোনো ধরনের আদর্শিক সংঘাতে না গিয়ে আপাদমস্তক বাস্তববাদী ও সুবিধাবাদী কৌশলের পথ বেছে নিয়েছেন। তার রাজনৈতিক বার্তা অত্যন্ত স্পষ্ট—যে পক্ষ ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ আরব অধ্যুষিত শহরগুলোর আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, অবকাঠামো সংস্কার, আবাসন সংকট সমাধান এবং শত কোটি শেকেলের রাষ্ট্রীয় বাজেট বরাদ্দের আনুষ্ঠানিক নিশ্চয়তা দেবে, তাদের সাথেই তিনি সরকার গঠনে কৌশলগত সমঝোতায় যাবেন।

এর সম্পূর্ণ বিপরীতে অবস্থান নিয়েছে হেদাশ-তা‍‍`আল বা জয়েন্ট লিস্ট। তারা নিছক স্থানীয় নাগরিক সুযোগ-সুবিধা ও অর্থ বরাদ্দের বিনিময়ে কোনো আপস করতে নারাজ। তাদের মূল শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে অধিকৃত পশ্চিম তীরে সামরিক দখলদারিত্ব ও বসতি স্থাপন বন্ধ করা, ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের বিষয়ে কার্যকর নীতিগত পরিবর্তন এবং ইসরায়েলের ভেতরে বসবাসকারী আরব নাগরিকদের সমান নাগরিক অধিকারের পূর্ণ পুনর্বহাল।

আরব দলগুলোর এই ভিন্নমুখী কৌশলের কারণে সরকার গঠনের পুরো আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া বর্তমানে গভীর অনিশ্চয়তায় আটকে গেছে।

পরিস্থিতি পর্যালোচনাকারী বিশ্লেষকেরা তিনটি সম্ভাব্য দৃশ্যপট সামনে আনছেন।

প্রথম দৃশ্যপটে, গাদি আইজেনকোট বা জাইর লাপিদের বিরোধী জোট যদি অভ্যন্তরীণ বিরোধ ভুলে মনসুর আব্বাসের উন্নয়ন শর্তগুলো মেনে নেয়, তবে আরব দলগুলোর সরাসরি বা পরোক্ষ সমর্থনে নেতানিয়াহু যুগের অবসান ঘটিয়ে তেল আবিবে নতুন একটি বহুত্ববাদী কোয়ালিশন সরকার গঠিত হতে পারে।

দ্বিতীয় দৃশ্যপটে, নেতানিয়াহু তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন রাজনৈতিক চাতুর্য খাটিয়ে বিরোধী শিবিরে ভাঙন ধরাতে পারেন অথবা কট্টর ডানপন্থিদের চাপ দিয়ে কোনো মধ্যবর্তী চুক্তিতে সম্মত করাতে পারেন, যদিও বর্তমান বাস্তবতায় তা প্রায় অসম্ভব।

তৃতীয় দৃশ্যপটে, কোনো পক্ষই যদি শেষ পর্যন্ত আরব দলগুলোর দাবি মানতে প্রস্তুত না হয় এবং কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়, তবে ইসরায়েল আবারো আরেকটি ব্যয়বহুল আগাম সংসদীয় নির্বাচনের দিকে ধাবিত হবে, যা দেশটিকে দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার মুখে ঠেলে দেবে।

পর্যবেক্ষকদের মতে, নেতানিয়াহু ক্ষমতায় থাকুন বা বিদায় নিন, এই নির্বাচন ইসরায়েলি রাজনীতির ঐতিহাসিক মেরুকরণকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। যাদেরকে রাষ্ট্র এতদিন পরোক্ষ শত্রু হিসেবে কোণঠাসা করে রেখেছিল, ক্ষমতার মসনদ টিকিয়ে রাখতে তাদের শরণাপন্ন হওয়াই এখন ইসরায়েলি রাজনীতির নতুন বাস্তবতা।