অক্টোবর ২৯, ২০২৬, ০৫:৪১ পিএম
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে টানা আট মাস ধরে চলা তীব্র সংঘাতের অবসান ঘটাতে মধ্যপ্রাচ্যে কূটনৈতিক দৌড়ঝাঁপ নতুন মাত্রা পেয়েছে। নতুন করে যুদ্ধের বিস্তার ঠেকাতে সৌদি আরব, পাকিস্তান, তুরস্ক ও চীনের মতো প্রভাবশালী দেশগুলো তৎপর হলেও স্থায়ী শান্তিচুক্তির রূপরেখা নিয়ে অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি।
তেহরান কোনো ধরনের সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে রাজি নয়।
ইরানের স্পষ্ট অবস্থান—ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বাহিনীর সামরিক হামলা প্রতিরোধের সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর নিশ্চয়তাসহ যুদ্ধের স্থায়ী অবসান ঘটাতে হবে। একই সাথে বিশ্ব অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের আধিপত্য ও সামরিক নিয়ন্ত্রণকে দর-কষাকষির প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে দেশটি।
উত্তেজনা কমাতে বেইজিং শিগগিরই সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে বিশেষ কূটনৈতিক দূত পাঠাবে বলে মঙ্গলবার জানিয়েছে চীন। এর আগে সোমবার সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের জ্যেষ্ঠ প্রতিনিধিরা ইরানের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠক করেন। গত আগস্ট মাসে স্বাক্ষরিত মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির অংশীদার এই তিন দেশ আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ধারাবাহিক আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছে।
কূটনৈতিক মহলের মূল লক্ষ্য হলো সংঘাত কমিয়ে এমন একটি কার্যকর সমঝোতায় পৌঁছানো, যা নতুন করে বড় আকারের যুদ্ধ শুরুর ঝুঁকি কমাবে।
তবে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ইরানের নজর নিছক অস্ত্রবিরতিতে নয়। দেশটি এমন এক কৌশলগত সামরিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়, যাতে ভবিষ্যতে তাদের ওপর নতুন করে হামলা চালানোর আগে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবকে চড়া মূল্য চুকানোর কথা ভাবতে হয়। `দ্য ইরান পডকাস্ট`-এর উপস্থাপক নেগার মোর্তাজাভি কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরাকে জানান, ইরানের প্রধান লক্ষ্য যুদ্ধের চূড়ান্ত অবসান নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতে হামলার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে বাস্তবসম্মত প্রতিরোধ গড়ে তোলা।
সমঝোতার প্রধান অন্তরায় উভয় পক্ষের দীর্ঘদিনের গভীর অবিশ্বাস।
তেহরানের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করতে হবে, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করতে হবে এবং ভবিষ্যতে আর কখনো হামলা চালানো হবে না মর্মে লিখিত নিশ্চয়তা দিতে হবে। এর বিনিময়ে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজের অবাধ চলাচল পুনরায় নিশ্চিত করতে ইরান সহযোগিতা করবে। বিপরীতে ওয়াশিংটনের দাবি, চূড়ান্ত শান্তিচুক্তির আগেই ইরানকে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচিসহ বেশ কয়েকটি কৌশলগত বিষয়ে বড় ধরনের ছাড় দিতে হবে।
বারবার চুক্তিভঙ্গের অতীত অভিজ্ঞতাই ইরানের এই অনড় অবস্থানের মূল কারণ।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ওমানের মধ্যস্থতায় যখন শান্তি আলোচনা চলছিল, ঠিক তখনই ইরানে অতর্কিত সামরিক হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এর আগে ২০২৫ সালের জুন মাসে ইসরায়েলের শুরু করা ১২ দিনের সর্বাত্মক যুদ্ধে সরাসরি অংশ নিয়েছিল মার্কিন বাহিনী। এছাড়া গত জুন মাসে পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতায় হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া, ইরানের বন্দরে মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহার এবং নতুন করে পারমাণবিক আলোচনা শুরুর একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হলেও তা বেশিদিন টেকেনি। নতুন করে দুই পক্ষ পাল্টাপাল্টি বিমান হামলা শুরু করলে পুরো প্রক্রিয়াটি ধসে পড়ে।
সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির গবেষক সিনা তুসির মতে, অতীতের কোনো যুদ্ধবিরতিই পরবর্তী হামলা থেকে ইরানকে রক্ষা করতে পারেনি। ফলে তেহরান এবার কেবল কাগজে-কলমে থাকা চুক্তিতে আস্থা রাখতে পারছে না; তাদের এমন আন্তর্জাতিক গ্যারান্টি প্রয়োজন যা সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি বাস্তবে শূন্যে নামিয়ে আনবে।
যুদ্ধের গতিপথ নির্ধারণে এখন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও ইসরায়েলের আসন্ন নির্বাচন। আগামী ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে যাবে, তা নির্ধারিত হবে। দীর্ঘস্থায়ী এই যুদ্ধের ফলে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং লাগামহীন মূল্যস্ফীতি সাধারণ আমেরিকানদের জীবনযাত্রায় চরম চাপ তৈরি করেছে।
রয়টার্স ও ইপসোসের সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, ইরান যুদ্ধ পরিচালনায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গৃহীত নীতির প্রতি দেশটির মাত্র ৩৪ শতাংশ নাগরিক সমর্থন জানিয়েছেন। একই সময়ে কংগ্রেসে ক্ষমতাসীন রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অত্যন্ত সংকীর্ণ। মধ্যবর্তী নির্বাচনে দলটি কাঙ্ক্ষিত সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে ব্যর্থ হলে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক আগ্রাসন ও পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে ট্রাম্পের রাজনৈতিক ক্ষমতা অনেকটাই সংকুচিত হয়ে পড়বে। অন্যদিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নির্বাচনে হেরে গেলে ওয়াশিংটনের সাথে একযোগে যৌথ হামলা চালানোর প্রক্রিয়া জটিল হয়ে উঠতে পারে। যদিও দেশটির বিরোধী নেতা ও সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকট ক্ষমতায় এলেও ইরানের প্রতি ইসরায়েলের কঠোর সামরিক নীতিতে কোনো শিথিলতা আসবে কিনা, তা নিয়ে গভীর সংশয় রয়েছে।
সংঘাতের সবচেয়ে বিপজ্জনক ভরকেন্দ্র হয়ে দাঁড়িয়েছে হরমুজ প্রণালি।
পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরকে যুক্ত করা এই সরু সমুদ্রপথ দিয়ে সংঘাত শুরুর আগে বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হতো। এই পথে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হলে সরাসরি কেঁপে ওঠে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার।
ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট ফর নিয়ার ইস্ট পলিসির তথ্য বলছে, চলতি অক্টোবর মাসে হরমুজ প্রণালির নিকটবর্তী জলসীমায় বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। গত সপ্তাহে ইরানের একটি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলার পর দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি আক্রমণে অপরিশোধিত ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে ১১৭ ডলার ছাড়িয়ে যায়। যুদ্ধের আগে এই তেলের দর ছিল মাত্র ৭২ ডলারের কাছাকাছি। তেলের আকাশচুম্বী দাম বিশ্বজুড়ে পরিবহন ব্যয় ও উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে অর্থনৈতিক মন্দার ঝুঁকি তৈরি করেছে।
বাজার বিশ্লেষক ক্রিস বিউচ্যাম্পের মতে, দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক চাপকে ইরান তার অন্যতম প্রতিরক্ষা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে। নিজেরা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা মিত্রদের ওপর পাল্টা অর্থনৈতিক সংকট চাপিয়ে দেওয়াই তেহরানের অন্যতম কৌশল।
চীন, সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের চলমান কূটনৈতিক উদ্যোগের মূল পরীক্ষা এখন দুই পক্ষের অনড় অবস্থানের মধ্যে একটি মধ্যবর্তী পথ খুঁজে বের করা। তবে ওয়াশিংটনের অনীহা, পারমাণবিক কর্মসূচির শর্ত এবং হরমুজ প্রণালিতে সামরিক সুবিধা হাতছাড়া না করার সিদ্ধান্তে তেহরান অনড় থাকায় দীর্ঘমেয়াদী শান্তির পথ এখনো চরম অনিশ্চয়তায় বন্দি।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন