অক্টোবর ২৯, ২০২৬, ০৩:৫৪ পিএম
যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচন ঘিরে টেক্সাস অঙ্গরাজ্যে রাজনৈতিক উপস্থিতি জোরালো করতে সংঘবদ্ধ হচ্ছেন দেশটির মুসলিম নাগরিকরা। সেখানকার হিউস্টন শহরের বিভিন্ন মসজিদকে কেন্দ্র করে ভোটার নিবন্ধন কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। স্থানীয় উদ্যোক্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মসজিদভিত্তিক এই উদ্যোগের মাধ্যমে প্রতি সপ্তাহে প্রায় এক হাজার নতুন ভোটার নিবন্ধনের আওতায় আসছেন।
নির্বাচনের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে, মুসলিম জনগোষ্ঠীর অধিকার ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা ততই তীব্র হচ্ছে।
আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে এই তৎপরতা এমন এক প্রেক্ষাপটে গতি পেয়েছে, যখন রিপাবলিকান সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজ্য শিক্ষা বোর্ডের অনুমোদিত নতুন সামাজিক শিক্ষা পাঠ্যক্রম নিয়ে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিভিন্ন মানবাধিকার কর্মীর অভিযোগ, এই পাঠ্যক্রমে ইসলাম ধর্মকে অন্যায্য ও পক্ষপাতমূলকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য তৈরি বিতর্কিত এই পাঠ্যসূচিতে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার মূল কারণ হিসেবে নির্দিষ্ট সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের কার্যকলাপের চেয়ে `উগ্রপন্থি ইসলাম` প্রত্যয়টিকে দায়ী করার নির্দেশনা রাখা হয়েছে। বিপরীতে পাঠ্যক্রমটির সমর্থক মহলের যুক্তি, পশ্চিমা সভ্যতা এবং খোদ যুক্তরাষ্ট্র ও টেক্সাস প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক ভিত্তি সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের স্পষ্ট ধারণা দিতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এই মতবিরোধ মার্কিন মুসলিম সম্প্রদায়ের ভেতর দীর্ঘদিনের একটি মৌলিক প্রশ্নকে নতুন করে সামনে এনেছে। সেটি হলো—নীতিনির্ধারণের টেবিলে প্রভাব বিস্তার এবং প্রশাসনিক বৈষম্য মোকাবিলার জন্য তারা কি একটি সংহত রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে পারবেন?
মার্কিন রাজনীতিতে সুসংগঠিত চাপ সৃষ্টিকারী দলগুলো নির্বাচনের ফলাফল ও রাষ্ট্রীয় নীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তারা ভোটার সংগঠিত করা, জনমত গঠন, প্রার্থীদের তহবিল সরবরাহ এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে দাবি আদায়ের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করে। আমেরিকান ইসরাইল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটির (এআইপ্যাক) মতো প্রভাবশালী প্ল্যাটফর্মগুলো স্পষ্ট দেখিয়েছে কীভাবে সমন্বিত লবিং ও রাজনৈতিক তৎপরতা জাতীয় সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে সক্ষম। মুসলিমদের ক্ষেত্রেও এমন উদ্যোগ বিশেষ করে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনগুলোতে প্রার্থীদের ওপর দাবি আদায়ের সুযোগ তৈরি করতে পারে। তাদের মূল উদ্বেগের ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে নাগরিক অধিকার রক্ষা, অভিবাসন নীতিমালা, কর্মসংস্থান ও অর্থনীতি এবং মধ্যপ্রাচ্য ঘিরে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির গতিপ্রকৃতি।
তবে জনসংখ্যা বা দৃশ্যমান সক্রিয়তা বাড়লেই তা সরাসরি ব্যালটের বিজয়ে রূপ নেবে, বিষয়টি এমন নয়। কারণ মার্কিন মুসলিমরা কোনো একক রাজনৈতিক চিন্তাধারায় বিশ্বাসী নন। তাদের দলীয় সমর্থন ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিতে স্পষ্ট ফারাক রয়েছে।
নির্বাচনী সময়সূচি অনুযায়ী, ৩ নভেম্বর টেক্সাসের বাসিন্দারা একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদে ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। এর মধ্যে রয়েছে অত্যন্ত আলোচিত একটি মার্কিন সিনেট আসন, গভর্নর পদ এবং মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের পুরো ৩৮টি আসন। সিনেট নির্বাচনে লড়াই করছেন রিপাবলিকান দলের কেন প্যাক্সটন, ডেমোক্র্যাটিক পার্টির জেমস তালারিকো এবং লিবার্টারিয়ান পার্টির টেড ব্রাউন। গভর্নর পদে চতুর্থ মেয়াদে লড়ছেন রিপাবলিকান গ্রেগ অ্যাবট, যার বিপরীতে মাঠে আছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জিনা হিনোজোসা এবং লিবার্টারিয়ান প্যাট ডিক্সন।
এছাড়া টেক্সাস রাজ্য প্রতিনিধি পরিষদের ১৫০টি আসনের সবকটিতে এবং রাজ্য সিনেটের ৩১টি আসনের মধ্যে ১৬টিতে নির্বাচন হচ্ছে। পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ের অন্যান্য প্রশাসনিক পদ, রাজ্য শিক্ষা বোর্ডের সদস্যপদ ও বিচার বিভাগীয় আসনেও ভোটাভুটি হবে।
এমন প্রেক্ষাপটে তৃণমূল পর্যায় থেকে সংঘবদ্ধ হওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছেন আমেরিকান মুসলিম ডেমোক্রেটিক ককাসের সহসভাপতি সৈয়দ হাসান। সংগঠনটির ২০২৬ সালের জাতীয় সম্মেলনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি ২০০৪ সালে ডেমোক্রেটিক পার্টির সম্মেলনে দেওয়া বারাক ওবামার ঐতিহাসিক ভাষণটি স্মরণ করেন। সেখানে ওবামা বলেছিলেন, দেশে কোনো কৃষ্ণাঙ্গ বা শ্বেতাঙ্গ আমেরিকা নেই, কোনো রক্ষণশীল কিংবা উদারপন্থী আমেরিকা নেই, রয়েছে কেবল অখণ্ড যুক্তরাষ্ট্র। হাসান জানান, ওই সময়ে ক্যামব্রিজের একটি মসজিদের ক্ষুদ্র জমায়েত থেকেই মুসলিমদের ডেমোক্রেটিক ককাস গঠনের অনুপ্রেরণা তৈরি হয়েছিল।
হাসানের মতে, গণতন্ত্রের স্বার্থেই রাজনৈতিকভাবে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলোর সংঘবদ্ধ হওয়া উচিত। তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেন, `আমাদের কৌশল অত্যন্ত স্পষ্ট: আমরা ঐক্যবদ্ধ হব, সংগঠিত হব এবং ভোট দেব।` একটি জনগোষ্ঠীর ওপর বিদ্বেষ ছড়ানো হলে পরবর্তীতে যে অন্য জনগোষ্ঠীও রেহাই পাবে না, সেই হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি উল্লেখ করেন, গত নির্বাচনে মেক্সিকান ও লাতিনো জনগোষ্ঠীর ওপর অন্যায্য আক্রমণ চালানো হয়েছিল। এবার মুসলিমদের লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে এবং আগামীতে হয়তো অন্য কাউকে বেছে নেওয়া হবে।
এই ধারার প্রতিনিধিরা দলীয় কাঠামোর ভেতরে থেকেই অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চান। তবে বিপরীত চিত্রও সমানভাবে বিদ্যমান। মুসলিম রিপাবলিকান ও ডানপন্থি ধারার সমর্থকরা হাঁটছেন ভিন্ন পথে।
পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত আমেরিকান উদ্যোক্তা এবং `আমেরিকান মুসলিমস ফর ট্রাম্প` সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সাজিদ তারার ২০২৬ সালের এই নির্বাচনে মুসলিমদের প্রকাশ্যে রিপাবলিকানদের সমর্থনের আহ্বান জানাচ্ছেন। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ এই নেতার ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের মুসলিম সমাজের সামাজিক নিরাপত্তা, মূল্যবোধ রক্ষা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ডেমোক্র্যাটদের চেয়ে রিপাবলিকানদের নীতিতেই সবচেয়ে বেশি সুরক্ষিত হবে।
জনসংখ্যার তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, পিউ রিসার্চ সেন্টারের সেপ্টেম্বর মাসের পরিসংখ্যান অনুসারে যুক্তরাষ্ট্রে সব বয়সী মুসলিমের সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৫৫ লাখে পৌঁছেছে, যা ২০০৭ সালেও ছিল মাত্র ২৪ লাখ। এই বৃদ্ধি ধর্মীয় ও সামাজিক কাঠামোর বিকাশকে নির্দেশ করলেও মোট জনসংখ্যার তুলনায় তা এখনও সীমিত। তবে নির্দিষ্ট কিছু শহর বা হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের নির্বাচনী এলাকায় তাদের একতাবদ্ধ ভোট ফলাফলে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
রাজনৈতিক পছন্দ সংক্রান্ত পিউ রিসার্চ সেন্টারের ২০২৩-২৪ সালের ধর্মীয় জীবন বিষয়ক এক জরিপে দেখা গেছে, উত্তরদাতাদের মধ্যে ১ দশমিক ২ শতাংশ ছিলেন মুসলিম। তাদের ভেতর ৫৩ শতাংশ ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রতি এবং ৪২ শতাংশ রিপাবলিকান পার্টির প্রতি তাদের সমর্থনের কথা জানিয়েছেন।
এই পরিসংখ্যান মুসলিম ভোটারদের এককভাবে ডেমোক্র্যাটপন্থী ভাবার প্রচলিত ধারণাকে পুরোপুরি নাকচ করে দেয়। অভিবাসন নীতি বা সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদের প্রশ্নে তাদের অবস্থান ডেমোক্র্যাটদের কাছাকাছি হলেও ঐতিহ্যবাহী পারিবারিক কাঠামো, ধর্মীয় অনুশাসন কিংবা লিঙ্গভিত্তিক সামাজিক ইস্যুতে তাদের মতাদর্শ রিপাবলিকান অবস্থানের সাথে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ। অভ্যন্তরীণ এই মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েনের ফলেই একটি একক রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা দুরূহ হয়ে পড়ে।
টেক্সাসে এই আদর্শিক সংঘাত এখন দৃশ্যমান রূপ নিয়েছে। হিউস্টনে ইসলামিক সোসাইটি অব গ্রেটার হিউস্টনের সভাপতি এমরান গাজি নিশ্চিত করেছেন যে, তাদের পরিচালিত মসজিদগুলোতে সাপ্তাহিক এক হাজার করে ভোটার তালিকাভুক্তির কাজ সফলভাবে এগোচ্ছে।
একই সময়ে কট্টরপন্থি কিছু রিপাবলিকান নেতার পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করেছে। টেক্সাস প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য ব্রেন্ট মানি সেখানে `শরিয়াহ-ফ্রি টেক্সাস ককাস` গঠন করেছেন। অন্যদিকে ফেডারেল কংগ্রেসে কিথ সেলফ ও চিপ রয় `শরিয়াহ-ফ্রি আমেরিকা ককাস` গড়ে তুলতে নেতৃত্ব দিয়েছেন। গভর্নর গ্রেগ অ্যাবট রাজ্যের দুটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মুসলিমদের অজুর জায়গার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বিচার বিভাগে চিঠি পাঠিয়েছেন। যদিও মুসলিম অধিকার সংস্থাগুলো একে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচার হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।
তবে টেক্সাসের এই বাস্তবতা দিয়েই পুরো আমেরিকার চিত্র বোঝা যাবে না। মিশিগান, নিউইয়র্ক, ইলিনয়, নিউ জার্সি, মিনেসোটা কিংবা ভার্জিনিয়ার মুসলিমরা তুলনামূলক ভিন্ন স্থানীয় রাজনৈতিক আবহে কাজ করছেন।
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এবং বিশেষ করে গাজায় ইসরাইলের সামরিক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে বাইডেন-হ্যারিস প্রশাসনের নীতি মুসলিম ভোটারদের ক্ষোভকে বহুলাংশে উস্কে দিয়েছে। অনেকের কাছে এটিই প্রার্থী বাছাইয়ের প্রধান শর্ত। আবার অনেকের অগ্রাধিকারের তালিকায় রয়েছে দেশীয় অর্থনীতি, স্বাস্থ্যসেবা ও নাগরিক অধিকার।
নিজেদের সম্মেলনে সৈয়দ হাসান অভিযোগ করেন, পুঁজিপতি ও স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর লবিংয়ের বিপরীতে সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করাই এখন মূল চ্যালেঞ্জ। শেষ পর্যন্ত মুসলিমরা ক্ষমতার ভারসাম্যে কতটা প্রভাব ফেলতে পারবেন, তা নির্ভর করবে নির্বাচনের দিন ভোটকেন্দ্রে তাদের প্রকৃত উপস্থিতি এবং অন্যান্য মিত্র জনগোষ্ঠীর সাথে কৌশলগত ঐক্য গড়ে তোলার দক্ষতার ওপর।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন