অক্টোবর ২২, ২০২৫, ০২:২১ পিএম
দেশে ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রাপ্তির পদ্ধতিতে এক ‘অমূল পরিবর্তন’ আনতে যাচ্ছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এই নতুন ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য দেশব্যাপী দক্ষ চালক তৈরি এবং ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনা কার্যকরভাবে হ্রাস করা। প্রস্তাবিত নতুন নিয়মের আওতায়, ড্রাইভিং লাইসেন্স পেতে হলে একজন আবেদনকারীকে ন্যূনতম ৬০ ঘণ্টার প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলকভাবে গ্রহণ করতে হবে। শুধু তাই নয়, লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) যে একক কর্তৃত্ব ছিল, তাতেও আসছে মৌলিক পরিবর্তন।
বিআরটিএ’র বদলে সরকার মনোনীত প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোই সরাসরি লাইসেন্স প্রদান করবে। বুধবার সকালে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস-২০২৫ উপলক্ষ্যে রাজধানীর হাতিরঝিলের সড়ক ভবন মিলনায়তনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সড়ক পরিবহন ও সেতু উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান এসব যুগান্তকারী সিদ্ধান্তের কথা জানান। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে দেশের সড়ক ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে একটি বড় ধরনের সংস্কারের সূচনা হলো বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান তার বক্তব্যে স্পষ্ট করে বলেন যে, ড্রাইভিং লাইসেন্স পদ্ধতিতে এই ‘অমূল পরিবর্তন’-এর মূল দর্শন হলো পরীক্ষা-সর্বস্ব প্রক্রিয়ার বদলে প্রশিক্ষণ-সর্বস্ব একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা। তিনি বলেন, “এর মূল কাজ হবে প্রশিক্ষণ এবং সেই জন্য যেসব আনুষঙ্গিক কমিটি আছে সেগুলো বাদ দেওয়া হবে।” এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি মূলত লাইসেন্স প্রদান প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত বিভিন্ন অপ্রয়োজনীয় বা বিতর্কিত ধাপগুলো বাদ দেওয়ার ইঙ্গিত দেন, যা প্রক্রিয়াটিকে আরও স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
উপদেষ্টা আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য যোগ করে বলেন যে, লাইসেন্স নিতে হলে শুধু ৬০ ঘণ্টার প্রশিক্ষণই শেষ কথা নয়, প্রশিক্ষণ গ্রহণকারীদের উৎসাহিত করতে বিশেষ ভাতারও ব্যবস্থা করা হবে। তিনি জোরারোপ করে বলেন, “সড়ককে নিরাপদ ও যানজটমুক্ত করতে হলে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চালক লাগবে। আর সেই চালক তৈরির প্রক্রিয়াটিকেই আমরা ঢেলে সাজাচ্ছি।”
নতুন এই পদ্ধতিতে লাইসেন্স প্রদানের কর্তৃত্ব নিয়েও বিস্তারিত জানান সড়ক উপদেষ্টা। তিনি বলেন, লাইসেন্স প্রদানের কেন্দ্রবিন্দু হবে মানসম্মত প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলো। ফাওজুল কবির খান বলেন, “বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও বিআরটিসির (বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্পোরেশন) প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ছাড়াও সরকার মনোনীত বেসরকারি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে এই প্রশিক্ষণ নিতে হবে। আর সেসব প্রতিষ্ঠান থেকেই দেওয়া হবে ড্রাইভিং লাইসেন্স।”
এই সিদ্ধান্তের ফলে বিআরটিএ’র ওপর থেকে লাইসেন্স প্রদানের সরাসরি চাপ কমবে এবং প্রতিষ্ঠানটি নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে তার মূল দায়িত্ব, অর্থাৎ যানবাহনের ফিটনেস ও সার্বিক পরিবহন ব্যবস্থার পালনে আরও মনোযোগ দিতে পারবে। একইসাথে, নির্দিষ্ট মানদণ্ড পূরণ সাপেক্ষে বেসরকারি খাতকে এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করার মাধ্যমে দেশব্যাপী দক্ষ চালক তৈরির প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হবে এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
প্রশিক্ষণের ধরণ ও পরীক্ষা পদ্ধতি সম্পর্কেও অনুষ্ঠানে ধারণা দেন উপদেষ্টা। তিনি জানান, ন্যূনতম ৬০ ঘণ্টার এই প্রশিক্ষণে দুটি বিষয়ের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে। প্রথমত, চালককে অবশ্যই সড়কের সকল চিহ্ন (সাইন), ট্রাফিক আইন এবং নিয়মকানুন সম্পর্কে সুস্পষ্ট তাত্ত্বিক জ্ঞান রাখতে হবে। দ্বিতীয়ত, গাড়ির ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা বা বাস্তব ড্রাইভিংয়ের ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জন করতে হবে।
এই প্রশিক্ষণের পাশাপাশি আবেদনকারীর শারীরিক সামর্থ্য যাচাই এবং ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক করা হবে, যা চালকের মানসিক ও শারীরিক সুস্থতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমাবে। সরকার এই নতুন পদ্ধতি বাস্তবায়নে অত্যন্ত আশাবাদী। ফাওজুল কবির খান বলেন, “সম্ভব হলে আগামী মাসের মধ্যেই আমরা এই নতুন প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু করতে পারব।” এই ঘোষণা প্রমাণ করে যে, অন্তর্বর্তী সরকার সড়ক নিরাপত্তার মতো একটি জরুরি বিষয়ে কালক্ষেপণ না করে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণে আগ্রহী।
‘জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস-২০২৫’ উপলক্ষ্যে আয়োজিত এই গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাগণ এবং পরিবহন খাতের শীর্ষস্থানীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মো. খোদা বখশ চৌধুরী। এ ছাড়াও সেতু বিভাগের সচিব মো. আবদুর রউফ, সড়ক ও জনপথ অধিদফতরের প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ মঈনুল হাসান, বিআরটিএ’র চেয়ারম্যান আবু মমতাজ সাদ
উদ্দিন আহমেদ এবং ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আলমসহ সংশ্লিষ্ট খাতের অনেকেই বক্তব্য রাখেন। উল্লেখ্য, অনুষ্ঠানে বিআরটিএ’র বর্তমান চেয়ারম্যানের উপস্থিতিতেই সংস্থাটির লাইসেন্স প্রদানের একক কর্তৃত্ব বাতিলের এই ঘোষণা দেওয়া হয়। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে সড়ক নিরাপত্তার দাবিতে আন্দোলন, বিশেষ করে ২০১৮ সালের ছাত্র আন্দোলন এবং বিআরটিএ’র লাইসেন্স প্রদান প্রক্রিয়ার জটিলতা ও অনিয়ম নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের এই
‘অমূল পরিবর্তন’-এর সিদ্ধান্তকে সংশ্লিষ্ট মহল একটি সময়োপযোগী ও সাহসী পদক্ষেপ হিসেবেই বিবেচনা করছে। এই ব্যবস্থার সঠিক বাস্তবায়ন হলে তা দেশের বিশৃঙ্খল সড়ক পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে বড় ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা যায়।




দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন