সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,

যমুনায় প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে জামায়াতের বৈঠক

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

অক্টোবর ২২, ২০২৫, ০৬:১৬ পিএম

যমুনায় প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে জামায়াতের  বৈঠক

ছবি - সংগৃহীত

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের চলমান সংলাপ প্রক্রিয়ায় বুধবার সন্ধ্যা এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় নিয়েছে। জুলাই সনদ স্বাক্ষর করা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে দ্বিধাবিভক্তি তৈরি হয়েছে, তার নিরসনে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস আজ প্রধান দুটি পক্ষের সঙ্গেই পৃথক বৈঠকে বসছেন।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সঙ্গে বৈঠকের রেশ কাটতে না কাটতেই প্রধান উপদেষ্টার আমন্ত্রণে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় পৌঁছেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিদল। নির্বাচন ও দেশের সমসাময়িক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে এই আলোচনা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বুধবার সন্ধ্যায় দলটির নায়েবে আমির ও সাবেক সংসদ সদস্য ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহেরের নেতৃত্বে চার সদস্যের প্রতিনিধিদলটি যমুনার ফটক দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে।

এই বৈঠকে জামায়াতে ইসলামীর অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তারা জুলাই সনদে স্বাক্ষরকারী অন্যতম প্রধান দল এবং প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে সোচ্চার ভূমিকা পালন করছে।জামায়াতে ইসলামীর প্রতিনিধিদলে দলটির নায়েবে আমির ডা. তাহের ছাড়াও রয়েছেন সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার এবং সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল যথাক্রমে এটিএম মাসুম ও রফিকুল ইসলাম খান। দলীয় সূত্র জানিয়েছে, এই বৈঠকে আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রশাসনের সর্বস্তরে নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার বিষয়টিই সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাবে।

বিশেষ করে জুলাই সনদে স্বাক্ষরকারী দল হিসেবে জামায়াত চাইবে, সনদের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য যে ধরনের পরিবেশ ও সংস্কার প্রয়োজন, তা যেন অন্তর্বর্তী সরকার দ্রুত বাস্তবায়ন করে। জামায়াতে ইসলামী সম্প্রতি আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতির মতো কিছু মৌলিক নির্বাচনী সংস্কারের দাবিও তুলেছিল। আজকের বৈঠকে সেসব প্রস্তাবনা নিয়েও প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

আজকের সন্ধ্যাটি রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনার জন্য ছিল রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত কর্মব্যস্ত। জামায়াতে ইসলামীর বৈঠকের ঠিক আগেই, বিকেলে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে বসে জুলাই বিপ্লবের প্রধান শক্তি জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রতিনিধিদল। এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের নেতৃত্বে চার সদস্যের এই প্রতিনিধিদলে আরও ছিলেন দলটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন, উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম এবং যুগ্ম আহ্বায়ক খালেদ সাইফুল্লাহ।

এই বৈঠকটি ছিল জামায়াতের বৈঠকের সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর। জামায়াত যেখানে জুলাই সনদে স্বাক্ষর করে এর দ্রুত বাস্তবায়ন চাইছে, সেখানে এনসিপি এখন পর্যন্ত এই সনদে স্বাক্ষর করা থেকে বিরত রয়েছে। এনসিপির মূল দাবি, সনদের কোনো সুস্পষ্ট আইনি ভিত্তি বা ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ’ জারি না করে কেবল আনুষ্ঠানিকতায় স্বাক্ষর করা অর্থহীন এবং এটি জাতির সঙ্গে প্রহসন হতে পারে। তাই এনসিপির সঙ্গে আলোচনায় প্রধান উপদেষ্টাকে মূলত সনদের আইনি ভিত্তি নিয়েই বোঝাপড়া করতে হয়েছে।

এই ধারাবাহিক রাজনৈতিক সংলাপের সূচনা হয়েছিল মূলত গতকাল মঙ্গলবার, ২১ অক্টোবর। এদিন বিকেলে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে ওই প্রতিনিধিদলে আরও ছিলেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও সালাহউদ্দিন আহমদ।

ওই বৈঠক শেষে বিএনপি অত্যন্ত শক্ত ভাষায় অন্তর্বর্তী সরকারকে অবিলম্বে একটি নির্দলীয় ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারের’ পূর্ণাঙ্গ চরিত্র ধারণ করার আহ্বান জানায়। একইসঙ্গে বিএনপি প্রশাসন থেকে ‘দলীয় লোকজনকে’ সরিয়ে দিয়ে নির্বাচনের জন্য শতভাগ নিরপেক্ষ পরিবেশ নিশ্চিত করারও জোর দাবি জানিয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বর্তমানে একটি জটিল রাজনৈতিক সমীকরণের মুখোমুখি। একদিকে বিএনপির মতো সনদে স্বাক্ষরকারী দলগুলো প্রশাসনকে ঢেলে সাজানো এবং নির্বাচনকালীন সরকারের ‘তত্ত্বাবধায়ক’ ভূমিকা পালনের জন্য চাপ সৃষ্টি করছে। জামায়াতে ইসলামীও সেই সুরেই কথা বলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অন্যদিকে, এনসিপির মতো শক্তি, যাদের হাত ধরে এই সরকারের সূচনা, তারাই সনদের আইনি ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলে স্বাক্ষর করা থেকে বিরত রয়েছে।

এই পরস্পরবিরোধী অবস্থানগুলোর মধ্যে সমন্বয় সাধন করে জুলাই সনদের বাস্তবায়ন এবং একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাওয়াই এখন ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ। যমুনায় অনুষ্ঠিত এই ধারাবাহিক বৈঠকগুলোর ফলাফলের ওপরই নির্ভর করছে বাংলাদেশের আসন্ন রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভবিষ্যৎ।