অক্টোবর ২২, ২০২৫, ০৮:১৭ পিএম
জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫-এর আইনি ভিত্তি এবং বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে যে গভীর সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছে, তার সমাধানে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন দেশের শীর্ষ আইন ও সংবিধান বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পুনরায় নিবিড় আলোচনায় বসেছে। সনদে স্বাক্ষরকারী এবং স্বাক্ষর থেকে বিরত থাকা—উভয় পক্ষের রাজনৈতিক দলগুলোর উত্থাপিত আইনি জটিলতা নিরসনে একটি সর্বজনগ্রাহ্য পথ খুঁজতেই এই জরুরি সভার আয়োজন করা হয়।
বুধবার, ২২ অক্টোবর, জাতীয় সংসদের কমিশন কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে এই গুরুত্বপূর্ণ সভা অনুষ্ঠিত হয়। এই বৈঠকের মধ্য দিয়ে এটা স্পষ্ট যে, জুলাই সনদের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা অর্জিত হলেও, এর সাংবিধানিক বৈধতা দেওয়াই এখন অন্তর্বর্তী সরকারের সামনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে এই সনদের অধীনে গণভোট আয়োজন, গণপরিষদ নির্বাচন এবং সংবিধান সংস্কারের মতো মৌলিক বিষয়গুলো কোন আইনি প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হবে, তা নিয়েই মূল জটিলতা তৈরি হয়েছে।
এই আইনি জটিলতা নিরসনের বিষয়টি বর্তমানে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান রাজনৈতিক এজেন্ডায় পরিণত হয়েছে। গত ১৭ অক্টোবর সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের পর থেকেই এর বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান লক্ষ্য করা গেছে। জুলাই বিপ্লবের প্রধান শক্তি জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সনদের আইনি ভিত্তি স্পষ্ট না হওয়ায় সেই স্বাক্ষর অনুষ্ঠান বর্জন করে। বুধবারই এনসিপি প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বৈঠক করে জানিয়েছে, সনদ বাস্তবায়নের ‘সুনির্দিষ্ট নিশ্চয়তা’ এবং একটি আইনি কাঠামো পাওয়ার পরই কেবল তারা স্বাক্ষর করবে।
অন্যদিকে, সনদে স্বাক্ষরকারী দল জামায়াতে ইসলামীও বুধবার সন্ধ্যায় প্রধান উপদেষ্টার কাছে সনদটিকে আইনি রূপ দিতে ‘প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ আদেশ’ জারির সুনির্দিষ্ট দাবি জানিয়েছে। এর আগে মঙ্গলবার বিএনপিও অন্তর্বর্তী সরকারকে একটি ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারের’ পূর্ণাঙ্গ চরিত্র ধারণ করার আহ্বান জানিয়েছে, যার জন্যও একটি আইনি কাঠামো বা আদেশের প্রয়োজন। এই চতুর্মুখী রাজনৈতিক ও আইনি চাপের মধ্যেই ঐকমত্য কমিশনকে একটি কার্যকর ও টেকসই পথ খুঁজে বের করতে হচ্ছে।
এই জটিল রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক বাস্তবতার নিরসনে বুধবারের বৈঠকে শীর্ষ আইনজ্ঞদের আমন্ত্রণ জানানো হয়। সভায় মূলত এই আইনি পদ্ধতিগুলো নিয়েই চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হয়। কমিশন জানতে চায়, কোন প্রক্রিয়ায় এই সনদকে আইনি সুরক্ষা দেওয়া হলে তা ভবিষ্যতে আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে না এবং একইসাথে তা সব রাজনৈতিক দলের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে। সভায় বিশেষজ্ঞ হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এম এ মতিন এবং ব্যারিস্টার ইমরান সিদ্দিক।
তাদের সঙ্গে ভার্চুয়ালি বা অনলাইনে আলোচনায় অংশ নেন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মঈনুল ইসলাম চৌধুরী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের ডিন মোহাম্মদ ইকরামুল হক এবং বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র অ্যাডভোকেট ড. শরিফ ভূইয়া। এই শীর্ষ আইনজ্ঞরা সনদের প্রতিটি দিক বিশ্লেষণ করে তাদের মূল্যবান পরামর্শ তুলে ধরেন। আলোচনায় ‘ডকট্রিন অফ নেসেসিটি’ বা বিশেষ প্রয়োজনের নীতির প্রয়োগ, গণভোটের আইনি ভিত্তি এবং প্রধান উপদেষ্টার আদেশ জারির সাংবিধানিক ক্ষমতা নিয়ে সুদীর্ঘ পর্যালোচনা করা হয়।
কমিশন সূত্রে জানা গেছে, এই আলোচনা এখনো চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেনি, কারণ বিষয়গুলো অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং দেশের ভবিষ্যৎ সংবিধান ও রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। বুধবারের সভায় সনদ বাস্তবায়নের জন্য বিভিন্ন মহল থেকে আসা সুপারিশগুলো বিস্তারিত পর্যালোচনা করা হয়। পাশাপাশি, উপস্থিত বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে প্রাপ্ত পরামর্শ নিয়েও সুদীর্ঘ আলোচনা হয়। এই জটিল আইনি বিষয়ে কমিশন আগামীকাল, বৃহস্পতিবার, সকালে প্রথমে নিজেদের মধ্যে একটি অভ্যন্তরীণ বৈঠক করবে।
এরপর দুপুর ২টায় বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আবারও চূড়ান্ত আলোচনায় বসার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই ধারাবাহিক বৈঠক প্রমাণ করে, ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে এই সাংবিধানিক জট খোলার জন্য সরকার ও ঐকমত্য কমিশন সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। আজকের গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় কমিশনের পক্ষে অংশ নেন কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ, সদস্য ড. বদিউল আলম মজুমদার, বিচারপতি মো. এমদাদুল হক, ড. ইফতেখারুজ্জামান, সফর রাজ হোসেন ও ড. মোহাম্মদ আইয়ুব মিয়া।
এছাড়া, জাতীয় ঐকমত্য গঠন প্রক্রিয়ায় শুরু থেকেই যুক্ত থাকা প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দারও এই সভায় উপস্থিত ছিলেন। রাজনৈতিক দলগুলোর চোখ এখন এই বিশেষজ্ঞ কমিটির সুপারিশ এবং তার ভিত্তিতে ঐকমত্য কমিশনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকেই নিবদ্ধ রয়েছে।



দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন