সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,

শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ে স্মরণীয় দিন আজ : প্রধান উপদেষ্টা

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

অক্টোবর ২২, ২০২৫, ১০:১৫ পিএম

শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ে স্মরণীয় দিন আজ : প্রধান উপদেষ্টা

ছবি - সংগৃহীত

বাংলাদেশের শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায় এবং কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ইতিহাসে বুধবার, ২২ অক্টোবর, একটি ঐতিহাসিক দিন হিসেবে যুক্ত হলো। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) তিনটি গুরুত্বপূর্ণ কনভেনশনে স্বাক্ষর করেছে, যার মধ্যে দুটি মৌলিক কনভেনশন হিসেবে স্বীকৃত। এই পদক্ষেপের ফলে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র দেশ হিসেবে আইএলওর ১০টি মৌলিক কনভেনশনের সবগুলোতেই অনুস্বাক্ষর করার বিরল গৌরব অর্জন করল।

এই অর্জনকে ‘বাংলাদেশের শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের ইতিহাসে স্মরণীয় দিন’ হিসেবে মন্তব্য করেছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি ২০১৩ সালের রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির কথা স্মরণ করে বলেন, সেই মর্মান্তিক ঘটনার পর যে প্রতিশ্রুতির যাত্রা শুরু হয়েছিল, এই স্বাক্ষরের মাধ্যমে তার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ সম্পন্ন হলো, যদিও আসল কাজ অর্থাৎ বাস্তবায়ন এখনো বাকি।

বুধবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় এক অনাড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের প্রত্যক্ষ উপস্থিতিতে এই কনভেনশন অনুসমর্থনপত্রে স্বাক্ষর করেন শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন। যে তিনটি কনভেনশনে বাংলাদেশ স্বাক্ষর করেছে সেগুলো হলো—পেশাগত নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যবিষয়ক কনভেনশন, ১৯৮১ (নং-১৫৫); কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার মান উন্নয়নে প্রচারণামূলক কাঠামো কনভেনশন, ২০০৬ (নং-১৮৭) এবং কর্মক্ষেত্রে সহিংসতা ও হয়রানি প্রতিরোধবিষয়ক কনভেনশন, ২০১৯ (নং-১৯০)।

এর মধ্যে কনভেনশন ১৫৫ এবং ১৮৭-কে আইএলও ২০২২ সালে তাদের মৌলিক কনভেনশনের মর্যাদা দেয়। এই স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিকবিষয়ক বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী, প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের সচিব মো. মাহমুদুল হোসাইন খান, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মো. সানোয়ার জাহান ভূঁইয়া এবং বাংলাদেশে আইএলওর কান্ট্রি ডিরেক্টর ম্যাক্স টুনোনসহ সংশ্লিষ্ট উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস তার বক্তব্যে রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির মর্মান্তিক স্মৃতিচারণ করেন। তিনি বলেন, ‘রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির পর তৎকালীন সরকার সব কিছুতে রাজি হলো। কিন্তু যা করবে বলেছিল সেগুলো কিছুই হয়নি। শুধু হচ্ছে, হবে করেই চলছিল।’ তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের দৃঢ় অবস্থান তুলে ধরে বলেন, ‘আমরা বললাম যে হচ্ছে- হবে আর নয়, এটা আমরা করেই যাব।’ ড. ইউনূস জানান, প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পরই তার প্রথম দৃষ্টি ছিল শ্রম অধিকার প্রতিষ্ঠার দিকে।

তিনি বলেন, ‘বারবার বৈঠক করলাম। সবখানে বলতে থাকলাম, এটা করতেই হবে। এটাতে স্বাক্ষর করা মানে আমাদের সবার উপকার।’ অতীতে কেন এই গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি তা নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন এবং বোঝার চেষ্টা করেন। তিনি বলেন, ‘আমাকে বলা হলো, আগামী জেনেভা বৈঠকে যেতে হবে। আমি বোঝার চেষ্টা করলাম অতীতে কেন কেউ গেল না।’

প্রধান উপদেষ্টা এই দীর্ঘ যাত্রায় সংশ্লিষ্ট সবাইকে তাদের কঠোর পরিশ্রমের জন্য কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, ‘আমরা এক দীর্ঘ যাত্রার পর গন্তব্যে পৌঁছালাম। এটা প্রথম ধাপ উত্তরণ হলো।’ তবে তিনি স্পষ্টভাবে সতর্ক করে দেন যে, কাগজে সই করেই কাজ শেষ হয়ে যায়নি, বরং আসল কাজ কেবল শুরু হলো। তিনি বলেন, ‘যে ওয়াদা করলাম সেটা পালন করতে হবে। কনভেনশনে কী কথা বলা আছে, কোনো অধিকারের কথা আছে সেটা সবার কাছে পৌঁছে দিতে হবে। সবাইকে সচেতন করতে হবে।’

তিনি দিনটিকে স্মরণীয় উল্লেখ করে বলেন, রানা প্লাজার শ্রমিকরা তাদের জীবন দিয়ে যে মহান দায়িত্ব আমাদের ওপর দিয়ে গেছে, এই স্বাক্ষরের মাধ্যমে সেটার এক ধাপ পার হলো। তিনি বলেন, ‘আমি নিজের কাছে নিজে ওয়াদা করেছিলাম, এটা করবই। আজ আনন্দ পাচ্ছি, একটা পর্যায়ে পৌঁছাতে পেরেছি। আমাদের পরিশ্রম সার্থক হবে সঠিকভাবে সর্বত্র বাস্তবায়ন করতে পারলে।’

শ্রম উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘আজকে অন্তর্বর্তী সরকারের একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিন। এটি আমাদের জন্য অনেক বড় চ্যালেঞ্জ ছিল।’ তিনি জানান, এই কাজে সবাই ভীষণ পরিশ্রম করেছেন এবং প্রধান উপদেষ্টা সার্বক্ষণিক নির্দেশনা দিয়েছেন, যার ফলেই এই সাফল্য এসেছে। তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন যে, শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় অন্তর্বর্তী সরকার শুরু থেকেই আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে। প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকীও এই যাত্রাকে ‘আনন্দদায়ক’ বলে অভিহিত করেন এবং জেনেভা কনভেনশনের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন।

বাংলাদেশে আইএলওর কান্ট্রি ডিরেক্টর ম্যাক্স টুনোন শ্রমিকদের সুরক্ষা নিশ্চিতে এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ কনভেনশন স্বাক্ষর করায় অন্তর্বর্তী সরকারকে আন্তরিক অভিনন্দন জানান। তিনি বলেন, বাংলাদেশ সরকার, শ্রমিক ও আইন প্রয়োগকারীদের সঙ্গে মিলে এই কনভেনশনগুলোর সঠিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে আইএলও প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে।

এর পাশাপাশি, শ্রম আইন সংস্কার কমিশনের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ বাস্তবায়নেও সরকারকে সহযোগিতা প্রদান অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। ম্যাক্স টুনোন একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরামর্শও দেন। তিনি বলেন, আগামী ফেব্রুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনে যেসকল রাজনৈতিক দল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে, তাদের সকলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে একটি ‘শ্রম সনদ’ (লেবার চার্টার) গ্রহণ করা উচিত, যা ভবিষ্যৎ বাংলাদেশকে শ্রম অধিকারের ক্ষেত্রে আরও এগিয়ে নিয়ে যাবে।

এই অনুসমর্থন শ্রমিকদের সুরক্ষায় অন্তর্বর্তী সরকারের দৃঢ় অঙ্গীকারের প্রতিফলন এবং এটি শ্রম খাতের সকল সামাজিক অংশীদারদের আন্তর্জাতিক শ্রমমান যথাযথভাবে অনুসরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।