অক্টোবর ২৩, ২০২৫, ০৬:৩৬ পিএম
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচনী আইন, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও)-তে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী চূড়ান্তভাবে অনুমোদন করেছে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ। এই সংশোধনীর মাধ্যমে নির্বাচনে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং একটি সুষ্ঠু নির্বাচনী পরিবেশ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে যুগান্তকারী কিছু বিধান যুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো, আদালত কর্তৃক পলাতক ঘোষিত কোনো ব্যক্তি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন না।
এছাড়া, প্রার্থীদের সম্পদ বিবরণী হলফনামার মাধ্যমে জমা দেওয়া এবং তা জনসমক্ষে প্রকাশের বিধান বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। একইসঙ্গে, ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহারের বিতর্কিত বিধান বাতিল করা হয়েছে এবং নির্বাচনী দায়িত্ব পালনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংজ্ঞায় সশস্ত্র বাহিনীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমির মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এক ব্রিফিংয়ে আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল এই গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনীগুলোর বিস্তারিত তুলে ধরেন।
ব্রিফিংয়ে ড. আসিফ নজরুল দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে জানান, ‘বিভিন্ন মামলায় পলাতক ব্যক্তিরা নির্বাচন করতে পারবেন না। আদালত যাদের পলাতক বলবেন, তারা নির্বাচন করতে পারবেন না।’ তিনি আরও স্পষ্ট করেন যে, কেবল চূড়ান্ত রায়ের পরই নয়, ‘বিচার চলাকালীনও পলাতক হয়।’ অর্থাৎ, বিচারাধীন মামলায় আদালত যদি কোনো ব্যক্তিকে পলাতক ঘোষণা করেন, তবে তিনিও নির্বাচনের জন্য অযোগ্য বিবেচিত হবেন।
আইন উপদেষ্টা জানান, এই সুনির্দিষ্ট বিধানটি সংশোধিত গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ বা আরপিওতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই পদক্ষেপটি দেশের বিচার ব্যবস্থা এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মধ্যে একটি দৃঢ় সংযোগ স্থাপন করল, যা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হবে বলে মনে করা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরেই পলাতক আসামিদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ নিয়ে রাজনৈতিক ও নাগরিক সমাজে ব্যাপক সমালোচনা ছিল। এই সংশোধনী সেই বিতর্কের অবসান ঘটালো।
নির্বাচনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রার্থীদের আর্থিক অবস্থার তথ্য জনসমক্ষে আনার একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আইন উপদেষ্টা বলেন, ‘প্রধান উপদেষ্টা নির্দেশ দিয়েছেন— নির্বাচনে যারা প্রার্থী থাকবেন, তাদের দেশি উৎস ও বিদেশি উৎস থেকে আয়, সম্পত্তি, সবকিছুর বিবরণ নির্বাচন কমিশনকে দিতে হবে।’ এই তথ্য কেবল জমা নিলেই হবে না, তা জনসাধারণের জানার জন্য উন্মুক্ত করে দিতে হবে। আসিফ নজরুল বলেন, ‘এটা আমরা ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে দেব (পাবলিশ)।
সবাই জানবে। আপনাদের এলাকার যে প্রার্থী আছে, কার কত আয়, কোথা থেকে আয়, কী সম্পত্তি— এটা সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়ার নির্দেশ তিনি (প্রধান উপদেষ্টা) দিয়েছেন। এ-সংক্রান্ত একটা বিধান এই আইনে থাকবে।’ এই বিধান কার্যকর হলে ভোটাররা তাদের প্রার্থীদের আর্থিক স্বচ্ছতা সম্পর্কে জেনেবুঝে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন, যা নির্বাচনী সংস্কৃতিতে একটি বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি, নির্বাচনে জামানতের পরিমাণও বৃদ্ধি করা হয়েছে। পূর্বে যেখানে জামানত ছিল ২০ হাজার টাকা, তা বাড়িয়ে এখন ৫০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে বলে আইন উপদেষ্টা জানান।
আরপিও’র এই সংশোধনীতে আরও দুটি বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে। প্রথমত, বিগত নির্বাচনগুলোতে বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন বা ইভিএম ব্যবহারের যে বিধান আরপিওতে যুক্ত করা হয়েছিল, তা সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত করা হয়েছে। আইন উপদেষ্টা বলেন, ‘আরপিওর ক্ষেত্রে যে গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী আনা হয়েছে, সেটা হচ্ছে, ইভিএম-সংক্রান্ত যে বিধান ছিল, সেগুলো বিলুপ্ত করা হয়েছে।’ এই সিদ্ধান্তের ফলে আগামী নির্বাচনগুলোতে ব্যালট পেপারের মাধ্যমেই ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে, যা অধিকাংশ রাজনৈতিক দলেরই দাবি ছিল।
দ্বিতীয়ত, নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত বাহিনীর সংজ্ঞায় পরিবর্তন আনা হয়েছে। আসিফ নজরুল বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যে সংজ্ঞা, সেখানে আর্মি, নেভি এবং এয়ারফোর্সকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।’ এর ফলে নির্বাচনকালীন সময়ে প্রয়োজন অনুযায়ী সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের মোতায়েন এবং তাদের ম্যাজিস্টেরিয়াল ক্ষমতা প্রদানের পথটি আরও সুগম হলো, যা একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ তৈরিতে সহায়ক হতে পারে।
এছাড়াও, সংশোধিত আরপিওতে জেলা পর্যায়ের নির্বাচন অফিসগুলোর প্রশাসনিক কাঠামোতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। আইন উপদেষ্টা জানান, ‘জেলায় যে নির্বাচন অফিসগুলো আছে, সেটা জেলা নির্বাচন কর্মকর্তার অধীনে থাকবে, এটা বিধান করা হয়েছে।’ এই পদক্ষেপ জেলা পর্যায়ে নির্বাচনী কার্যক্রম পরিচালনায় আরও শৃঙ্খলা ও সমন্বয় আনবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ড. আসিফ নজরুল পুরো ব্রিফিং জুড়েই এই সংশোধনীগুলোকে একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং স্বচ্ছ নির্বাচন আয়োজনের পথে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরেন। উপদেষ্টা পরিষদের চূড়ান্ত অনুমোদনের পর এখন এই সংশোধিত আরপিও অধ্যাদেশ আকারে জারি হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে, যা আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আইনি ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।




দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন