অক্টোবর ৪, ২০২৬, ১২:৪৪ পিএম
মসজিদে জামাত বা একাকী নামাজ আদায়ের সময় কোনো কোনো ক্ষেত্রে নামাজরত ব্যক্তির সামনে দিয়ে হাঁটার প্রয়োজন দেখা দেয়। সাধারণ মানুষের মধ্যে বহুল প্রচলিত একটি ধারণা রয়েছে যে নামাজরত ব্যক্তির সামনে দিয়ে যাতায়াত করলে নাকি ওই ব্যক্তির ৪০ দিনের ইবাদত নষ্ট হয়ে যায়। এমনকি বিভিন্ন মসজিদের দেয়ালেও কখনো কখনো এমন বক্তব্য লেখা থাকতে দেখা যায়। তবে পবিত্র কোরআন ও নির্ভরযোগ্য হাদিসের বিশদ বিবরণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি একটি অমূলক ধারণা এবং হাদিসের মূল বক্তব্য এমন নয়। ইসলামী শরিয়তে নামাজির সামনে দিয়ে অতিক্রম করার ব্যাপারে কঠোর হুঁশিয়ারি রয়েছে।
সুনানে আবু দাউদের ৭০১ নম্বর হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, নামাজির সামনে দিয়ে অতিক্রমকারী ব্যক্তি যদি জানত এতে তার কী ধরনের পরিণতি রয়েছে, তবে তার সামনে দিয়ে অতিক্রম করার চেয়ে ৪০ সময় দাঁড়িয়ে থাকাকেই সে উত্তম বলে মনে করত। হাদিসের অন্যতম বর্ণনাকারী আবু নাজর জানিয়েছেন, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি ৪০ দিন, ৪০ মাস নাকি ৪০ বছর বুঝিয়েছেন, তা নির্দিষ্টভাবে জানা যায়নি। অর্থাৎ হাদিসে ৪০ সংখ্যাটির উল্লেখ এসেছে মূলত এই কাজের ভয়াবহতা ও অপরাধের মাত্রা বোঝানোর জন্য। এই ভুলের কারণে কোনো ব্যক্তির পূর্ববর্তী বা পরবর্তী ৪০ দিনের ইবাদত বাতিল বা নষ্ট হয়ে যায়, এমন কোনো কথা কোরআন বা সহিহ হাদিসের কোথাও উল্লেখ নেই।
নামাজ আদায়কারীর জন্য সামনে সুতরা রাখা একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ ও উত্তম আমল।
সুতরা হলো এমন কোনো দৃশ্যমান বস্তু, যা মুসল্লির সামনে চলাচলের একটি সুনির্দিষ্ট সীমারেখা তৈরি করে দেয়। লাঠি, বল্লম, চেয়ার, টুল কিংবা দেয়াল সুতরা হিসেবে ব্যবহারযোগ্য। সহিহ বুখারির ৪৬৯ নম্বর হাদিসে আওন ইবনে আবু জুহাইফা তার পিতার সূত্রে বর্ণনা করেছেন, একবার দুপুরে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অজুর পর জোহর ও আসরের নামাজ আদায় করেন। সে সময় তার সামনে একটি বল্লম পোঁতা ছিল এবং সেই বল্লমের অপর পাশ দিয়ে মানুষ ও পশু চলাচল করছিল। এ থেকে স্পষ্ট হয় যে সামনে সুতরা স্থাপিত থাকলে তার বাইরে দিয়ে যাতায়াত করায় কোনো ধরনের ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞা নেই।
এছাড়া সুনানে ইবনে মাজাহর ৯৪০ নম্বর হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দিকনির্দেশনা দিয়ে বলেছেন, মুসল্লি যখন নিজের সামনে উটের পিঠের কাষ্ঠাসনের পেছনের অংশের মতো উচ্চতার কোনো বস্তু স্থাপন করে, তখন সে নির্দ্বিধায় নামাজ আদায় করতে পারে এবং এর সীমানার বাইরে দিয়ে কেউ গেলে তাতে কোনো অসুবিধা হবে না। নামাজির সামনে যদি কোনো সুতরা রাখা না থাকে, তবে তার ঠিক সম্মুখভাগ দিয়ে হাঁটা সম্পূর্ণ বর্জন করতে হবে। ফিকহ শাস্ত্রের নির্ভরযোগ্য গ্রন্থগুলোতে বলা হয়েছে, মসজিদ যদি অনেক বড় ও প্রশস্ত চত্বরবিশিষ্ট হয় এবং কারও জরুরি প্রয়োজন দেখা দেয়, তবে নামাজির সরাসরি সেজদার স্থান থেকে কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে কয়েক কাতার দূর দিয়ে হেঁটে যাওয়া যেতে পারে।
কোনো মুসল্লির সরাসরি সামনে অবস্থানরত ব্যক্তি যদি সরে যেতে চান, তবে তারও একটি সুন্দর সমাধান সুন্নাহতে রয়েছে। সরাসরি নামাজির বুক বরাবর সামনে দিয়ে অতিক্রম না করে সামান্য ডানে বা বামে সরে যাওয়া যায়। সহিহ বুখারির ৫১১ নম্বর হাদিসে উম্মুল মুমিনিন আয়েশা রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন রাতে নামাজ পড়তেন, তখন তিনি তার ও কিবলার মাঝখানের খাটে শুয়ে থাকতেন। প্রয়োজনে বাইরে যেতে হলে রাসুলুল্লাহর সরাসরি সামনে দিয়ে অতিক্রম করা অপছন্দ করে তিনি নিঃশব্দে খাটের একপাশ দিয়ে সরে যেতেন।
মসজিদের পবিত্রতা রক্ষা এবং নামাজির একাগ্রতা বজায় রাখতে অযথা সামনে দিয়ে চলাফেরা থেকে বিরত থাকা যেমন মুসল্লিদের দায়িত্ব, তেমনি নামাজের শুরুতে নিজের সামনে সুতরা স্থাপন করাও নামাজ আদায়কারীর অন্যতম কর্তব্য।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন