অক্টোবর ৪, ২০২৬, ১২:২৬ পিএম
মৌলভীবাজারে গ্রাফটিং পদ্ধতিতে আগাম ও রবি মৌসুমে টমেটো চাষে ফলন বাড়লেও ন্যায্যমূল্য না পেয়ে চরম হতাশায় পড়েছেন স্থানীয় কৃষকরা। চড়া সুদে ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করেও কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে মাঠপর্যায়ে কোনো কার্যকর পরামর্শ ও সহায়তা মিলছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। সার, কীটনাশক ও শ্রমিকের মজুরির পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও স্থানীয় বাজারে উৎপাদিত পণ্যের কাঙ্ক্ষিত দর না থাকায় বড় অঙ্কের লোকসানের আশঙ্কায় ভুগছেন প্রান্তিক চাষি ও তরুণ উদ্যোক্তারা। একই সঙ্গে বিদেশি টমেটো ও কাঁচামরিচ আমদানির নেতিবাচক প্রভাবে স্থানীয় পাইকারি ও খুচরা বাজারে দেশি সবজির দর অস্বাভাবিক হারে কমে গেছে।
জেলায় টমেটো উৎপাদনের মূল কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত কমলগঞ্জ উপজেলা। এখানে উৎপাদিত সুস্বাদু টমেটো এবং বিশেষভাবে প্রস্তুতকৃত গ্রাফটিং চারার ব্যাপক চাহিদা রয়েছে দেশজুড়ে। কিন্তু রাসায়নিক সার ও বালাইনাশকের মূল্যবৃদ্ধি উৎপাদন ব্যয়কে ঠেলে দিয়েছে বহুগুণে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ফসল সংরক্ষণের অবকাঠামোগত সংকট। জেলায় টমেটো দীর্ঘমেয়াদে সংরক্ষণের জন্য কোনো বিশেষায়িত হিমাগার বা প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা নেই। ফলে ভরা মৌসুমে বাজারে পণ্যের সরবরাহ বাড়লেই পচনশীল এই ফসল পানির দরে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষকেরা।
কমলগঞ্জে পলিথিন মালচিং পেপার ব্যবহার করে ক্লাস্টার বা দলভিত্তিক চাষাবাদে সাফল্য আসার পর তা ছড়িয়ে পড়ে জেলার অন্যান্য উপজেলাতেও। বর্তমানে খরিপ এক, রবি ও গ্রীষ্ম—এই তিন মৌসুমেই জমিতে টমেটোর আবাদ চলছে, যার মধ্যে খরিপ এক মৌসুমে আগাম জাতের আবাদে সবচেয়ে বেশি লাভের সম্ভাবনা তৈরি হয়। কৃষি বিভাগের তথ্যানুযায়ী, চলতি বছর জেলায় মোট এক হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে রবি মৌসুমে টমেটো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হয়েছে। এর বাইরে খরিপ এক মৌসুমে আগাম জাতের আবাদ হয়েছে ১৩০ হেক্টরে এবং গ্রীষ্মকালীন টমেটো লাগানো হয়েছে ১৯ হেক্টর জমিতে। পুরো মৌসুমে উৎপাদিত হয়েছে ৬৫ লাখের বেশি গ্রাফটিং চারা, যার প্রতিটি চারা নার্সারি থেকে ১২ থেকে ১৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
তবে মাঠের বাস্তবতায় ক্ষোভ প্রকাশ করছেন স্থানীয় কৃষকেরা। বাজার থেকে কেনা চড়া দামের কীটনাশক ছিটিয়েও গাছের রোগবালাই দমন করা যাচ্ছে না। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা ক্ষেতে এসে কোনো তদারকি করেন না কিংবা পরামর্শ দেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। সরকারি সার-বীজের প্রণোদনা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন বাস্তব চাষিরা। ফলে যাবতীয় আর্থিক ঝুঁকি বহন করতে হচ্ছে কৃষককেই। তার ওপর ধলাই ও গোপলা নদীর ভাঙনে অনেকের বীজতলা ও মূল ক্ষেত নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। পাতামরা ও কুঁকড়ে যাওয়া রোগের প্রাদুর্ভাবে অনেক ক্ষেতের গাছ তুলে ফেলে নতুন চারা লাগাতে গিয়ে উৎপাদন ব্যয় আকাশচুম্বী হয়েছে।
চাষিদের দাবি, সীমান্ত দিয়ে টমেটো ও কাঁচামরিচ আমদানির শুল্ক শিথিল করার ফলেই দেশীয় বাজার ধসে পড়েছে। গত বছর এই সময়ে যেখানে আগাম টমেটো প্রতি কেজি ১০০ থেকে ১১০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল, এবার তা নেমে এসেছে মাত্র ৫০ থেকে ৬০ টাকায়।
কমলগঞ্জ উপজেলার শুকুরউল্লাগাঁও গ্রামের তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা আব্দুল মান্নান চলতি মৌসুমে প্রায় ১৩ বিঘা জমিতে আগাম জাতের টমেটো চাষ করেছেন। এই প্রকল্পে তার মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৬ লাখ টাকা। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, চাষের খরচ দ্বিগুণ হলেও গতবারের চেয়ে অর্ধেক দামে ফসল বিক্রি করতে হচ্ছে। সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ ও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা না পেলে এই ক্ষতি পুষিয়ে ওঠা সম্ভব হবে না। তার মতে, শুধু কমলগঞ্জ থেকেই টমেটো ও চারা বিক্রি বাবদ বছরে প্রায় এক হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ অর্থনৈতিক লেনদেন সৃষ্টি হয়, যা জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
কমলগঞ্জের আদমপুর, মাধবপুর ও ইসলামপুরসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের মাঠজুড়ে এখন টমেটোর আবাদ ও চারার শেড গড়ে উঠেছে। স্থানীয় আব্দুল করিম, জলিল ও আব্দুল মতিন জানান, বুনো তিত বেগুনের চারার সঙ্গে উন্নত জাতের টমেটোর কাণ্ড জোড়া লাগিয়ে তৈরি করা এই গ্রাফটিং চারা সহজে হেলে পড়ে না, ভেঙে যায় না এবং ফলন দেয় অনেক বেশি। নিজের চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় এই চারা বিক্রি করে বহু পরিবার এখন অর্থনৈতিক সচ্ছলতার মুখ দেখছে।
এই কৃষি বিপ্লবকে কেন্দ্র করে গ্রামীণ জনপদে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় চা-বাগানগুলোর নারী ও পুরুষ শ্রমিকরা অবসরে এসব ক্ষেতে শ্রম দিচ্ছেন। নারী শ্রমিকেরা দিনে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা এবং পুরুষ শ্রমিকেরা ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত দৈনিক মজুরি পাচ্ছেন, যা তাদের দৈনন্দিন সংসার পরিচালনায় নতুন সহায়ক শক্তি হয়েছে।
কমলগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রাকিবুল ইসলাম জানিয়েছেন, চলতি মৌসুমে শুধু এই উপজেলায় ৬০ হেক্টর জমিতে আগাম আবাদ হয়েছে এবং কৃষকরা ৬০ থেকে ৬৫ লাখ গ্রাফটিং চারা দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করেছেন। তিনি জানান, তিত বেগুনের শক্ত মূল ও কাণ্ডের কারণে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বহুগুণ বাড়ে। চাষিদের সরকারি সহায়তা দিতে তালিকা প্রণয়নের কাজ চলছে।
অন্যদিকে কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সন্দ্বীপ কুমার তালুকদার জানান, ক্ষতিগ্রস্ত টমেটো চাষিদের পুনর্বাসনে সরকারি সহায়তা এবং নদীর ভাঙনকবলিত বাঁধ মেরামতে প্রশাসনিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ পর্যন্ত প্রণোদনার জন্য ৩৮০ জন কৃষকের তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে এবং এই কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
মৌলভীবাজার জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ জালাল উদ্দিন জানান, জেলায় একটি আধুনিক হিমাগার নির্মাণের জন্য স্থানীয় সংসদ সদস্যদের সাথে প্রাতিষ্ঠানিক আলোচনা চলছে। উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের জনবল সংকট থাকলেও সর্বোচ্চ তদারকি নিশ্চিতের চেষ্টা করা হচ্ছে। তিনি সতর্ক করেন যে কোনো ডিলারের বিরুদ্ধে ভেজাল ও নিম্নমানের কীটনাশক বিক্রির সত্যতা মিললে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আক্রান্ত গাছ উপড়ে ফেলে নির্দিষ্ট অনুমোদিত ওষুধ ব্যবহারের জন্য কৃষকদের পরামর্শ দেন তিনি।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন