সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২৬, ১২:৩৮ পিএম
আমন ধান কাটার পর অনাবাদি জমিতে মিষ্টি কুমড়া আবাদ করে অর্থনৈতিক সাফল্যের মুখ দেখছেন উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষকরা। পিরোজপুর জেলার ভাণ্ডারিয়া উপজেলার তেলিখালী ইউনিয়নের দক্ষিণ তেলিখালী গ্রামে কচা নদীর তীরের চরাঞ্চলে এখন চোখে পড়ে দিগন্তজোড়া মিষ্টি কুমড়ার ক্ষেত। নদীর পলিমাটি সমৃদ্ধ উর্বর জমিকে কাজে লাগিয়ে কয়েক বছর ধরে সেখানে বাণিজ্যিকভাবে এই লাভজনক সবজির আবাদ বিস্তার লাভ করেছে।
নদীর চরাঞ্চলে এখন শত শত বিঘা জমিতে কুমড়া চাষ হচ্ছে। স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এক দশক আগে কৃষক এনায়েত হোসেনের হাত ধরে এই চরে মিষ্টি কুমড়ার আবাদ শুরু হয়। পূর্বে আমন ধান ঘরে তোলার পর জমিগুলো ফাঁকা পড়ে থাকত, কিংবা কৃষকরা মরিচ, খেসারি কলাই বা পেঁয়াজ বুনতেন। তবে সেগুলোতে কাঙ্ক্ষিত লাভ না হওয়ায় মিষ্টি কুমড়ার পরীক্ষামূলক চাষ শুরু করা হয়। ফলন ও বাজারমূল্য ভালো পাওয়ায় ধীরে ধীরে পুরো গ্রামের কৃষকরা এই লাভজনক ফসল চাষের দিকে ঝুঁকে পড়েন।
কৃষক রফিকুল হাওলাদার জানান, তিনি চলতি মৌসুমে প্রায় আড়াই বিঘা জমিতে মিষ্টি কুমড়ার আবাদ করেছেন। এতে কিষান খরচ ও সার বাবদ প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। দৈনিক কিষানের মজুরি দিতে হয় ৫০০ টাকা। তিনি উল্লেখ করেন, গত মৌসুমে দুই বিঘা জমিতে আবাদ করতে তার খরচ হয়েছিল ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা, আর বিক্রি হয়েছিল এক লাখ ১৫ হাজার টাকা। চলতি মৌসুমে বাজার অনুকূলে থাকলে একই জমি থেকে দুই থেকে আড়াই লাখ টাকার কুমড়া বিক্রির আশা করছেন তিনি।
ক্ষেতের অধিকাংশ মিষ্টি কুমড়ার ওজন গড়ে সাত থেকে দশ কেজি পর্যন্ত হয়। কৃষক মো. হাসান হাওলাদার প্রায় সাত থেকে আট বিঘা জমিতে মিষ্টি কুমড়ার আবাদ করেছেন। তিনি জানান, চরাঞ্চলের বেলে-দোঁআশ ও পলি মাটিতে সব জমিতেই প্রায় সমান ফলন মেলে। জমি থেকে কুমড়া তোলার পর নৌকায় করে পাইকাররা সরাসরি ক্ষেত থেকেই ফসল কিনে নিয়ে যান। নদীপথে যাতায়াতের সুবিধা থাকায় দূরদূরান্তের পাইকাররা ট্রলার নিয়ে ভিড় জমান। পাইকারদের মধ্যকার প্রতিযোগিতামূলক দরাদরি চাষিদের ভালো দাম পেতে সহায়তা করে।
চাষ পদ্ধতি সম্পর্কে সফল কৃষক এনায়েত হোসেন জানান, ধান কাটার পরপরই জমি থেকে নাড়া ও খড়কুটো সরিয়ে পরিষ্কার করা হয়। এরপর ২০ থেকে ২৫ ইঞ্চি চওড়া ও সমপরিমাণ গভীর গর্ত বা পিট তৈরি করা হয়। গর্তের মাটি গুঁড়ো করে তার সঙ্গে গোবর ও বিভিন্ন সার মিশিয়ে প্রস্তুত করা হয়। আলাদাভাবে পলিথিনের প্যাকেটে মাটি ভরে প্রতিটিতে দুটি করে বীজ পুঁতে চারা তৈরি করা হয়। বীজ বপনের পর কলাগাছের পাতা বা খড় দিয়ে ঢেকে রাখা হয় এবং অঙ্কুরোদগমের পর আবরণ সরিয়ে নিয়মিত ঝাঁঝরি দিয়ে পানি ছিটানো হয়।
চারা আট থেকে বারো ইঞ্চি লম্বা হলে মূল জমিতে তৈরি গর্তে স্থানান্তর করা হয়। রোপণের সপ্তাহখানেক পর থেকে গাছে নিয়মিত সেচ দিতে হয়। পাশেই কচা নদী থাকায় পাম্প মেশিন ও পাইপের মাধ্যমে নদী থেকে সরাসরি মিষ্টি কুমড়ার ক্ষেতে মিষ্টি পানি সেচ দেওয়া হয়। গাছ বড় হয়ে লতা ছড়ানোর সময় গোড়ার মাটি পরিষ্কার করে শুকনো মাটি গুঁড়ো করে দেওয়া হয়। রোপণের ২৫ দিন থেকে এক মাসের মধ্যে গাছে ফুল আসা শুরু হয়।
কৃষকরা সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে হাত দিয়ে পরাগায়ন নিশ্চিত করেন। ভোরবেলা পুরুষ ফুল ছিঁড়ে পাপড়ি ছাড়িয়ে স্ত্রী ফুলের গর্ভমুণ্ডে স্পর্শ করিয়ে পরাগায়ন করা হয়। এনায়েত হোসেন জানান, স্ত্রী ফুল ফুটে থাকা অবস্থায় সকাল ৮টা থেকে ১০টার মধ্যে পরাগায়নের কাজ সম্পন্ন করতে হয়। পরাগায়িত ফুলের পাপড়ি ফেলে দেওয়া হয়, যাতে পচে সেখানে পোকা না জমে। তিনি মায়া ও সুইটিসহ কয়েকটি উচ্চফলনশীল জাতের বীজ সংগ্রহ করে জমিতে লাগিয়েছেন। প্রতিটি গাছ থেকে গড়ে এক থেকে তিনটি করে বড় আকারের মিষ্টি কুমড়া পাওয়া যায়।
শীত মৌসুমে পোকার উপদ্রব একেবারেই থাকে না বলে কোনো কীটনাশক প্রয়োগ করতে হয় না। কৃষক এনায়েত হোসেন বলেন, কোনো ধরনের বিষাক্ত কীটনাশক ছাড়াই সম্পূর্ণ প্রাকৃতিকভাবে মিষ্টি কুমড়া উৎপাদিত হওয়ায় এই ফসল শতভাগ নিরাপদ ও সুস্বাদু। তবে ক্ষেত থেকে কুমড়া পরিবহন ও বাজারজাতকরণের ক্ষেত্রে স্থানীয় সড়ক যোগাযোগ একটি বড় বাধা। প্রত্যন্ত চরাঞ্চল হওয়ায় নৌপথ ছাড়া বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় তারা অনেক সময় ভোগান্তির মুখে পড়েন। সরকারিভাবে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং চরাঞ্চলের কুমড়া চাষিদের অনুকূল সহায়তা ও প্রণোদনা প্রদান করা হলে এ অঞ্চলে মিষ্টি কুমড়া উৎপাদন বহুগুণ বাড়বে বলে প্রত্যাশা স্থানীয় কৃষকদের।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন