বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,

ভবিষ্যৎ নিয়ে অতিচিন্তা ও তাওয়াক্কুলের বিধান

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

সেপ্টেম্বর ৩০, ২০২৬, ১০:৩৪ এএম

ভবিষ্যৎ নিয়ে অতিচিন্তা ও তাওয়াক্কুলের বিধান

ছবি: Ai

বর্তমান তীব্র প্রতিযোগিতাপূর্ণ পুঁজিবাদী সমাজ ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মাঝে মানুষের দিন কাটছে এক অন্তহীন উদ্বেগে। ভবিষ্যৎ নিয়ে অতিরিক্ত উৎকণ্ঠা এখন আধুনিক জীবনের অন্যতম বড় মানসিক সংকটে পরিণত হয়েছে। জীবিকা, কর্মজীবনের প্রতিষ্ঠা এবং বৈষয়িক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নিরন্তর চেষ্টায় বহু মানুষ নিজের মানসিক ভারসাম্য হারাচ্ছেন। এমন অন্ধ প্রতিযোগিতায় জড়িয়ে অনেকে নীতি, নৈতিকতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধ বিসর্জন দিচ্ছেন।

এই ক্রমাগত অতৃপ্তির মূল উৎস হলো পার্থিব জীবনের অর্জনের মধ্যেই মানুষের চিন্তাকে বন্দি করে ফেলা। ইসলামের মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, একজন বিশ্বাসীর যাবতীয় চিন্তা ও আকাঙ্ক্ষা কেবল নশ্বর পার্থিব জীবনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা অনুচিত। যখন আখিরাতের চিরস্থায়ী জীবনের প্রস্তুতি ভুলে কেবল বৈষয়িক অর্জনের পেছনে সব শক্তি ক্ষয় করা হয়, তখন হৃদয়ের প্রশান্তি চিরতরে নষ্ট হয়ে যায়। পার্থিব বিষয়কে জীবনের একমাত্র ধ্যানজ্ঞান বানানোর পরিণতি সম্পর্কে সতর্কবার্তা এসেছে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদিসে। 

তিরমিজি শরিফের এক বর্ণনায় তিনি উল্লেখ করেছেন, যে ব্যক্তির একমাত্র চিন্তা হবে আখিরাত, আল্লাহ তার অন্তরে প্রাচুর্য দান করবেন এবং তার বিষয়গুলো গুছিয়ে দেবেন। তখন দুনিয়া নিজেই তার সামনে নত হয়ে আসবে। বিপরীতভাবে যার একমাত্র চিন্তা থাকবে পার্থিব জীবন, তার দুই চোখের সামনে দারিদ্র্য এঁকে দেওয়া হবে এবং তার কাজগুলো বিশৃঙ্খল হয়ে পড়বে। আর তকদিরে নির্ধারিত অংশের বাইরে সে অতিরিক্ত কিছুই অর্জন করতে পারবে না।

ইবনে মাজাহ শরিফের অপর এক হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি তার সব দুশ্চিন্তাকে এক চিন্তায় অর্থাৎ পরকালের চিন্তায় রূপান্তর করবে, তার পার্থিব যাবতীয় চিন্তার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট হবেন। কিন্তু যে ব্যক্তি পার্থিব উদ্বেগের সাগরে নিমজ্জিত থাকবে, সে ধ্বংসের মুখে পড়লে তার দায়ভার সৃষ্টির নিয়ন্তা গ্রহণ করবেন না। এই শিক্ষা স্পষ্ট করে যে, অতিমাত্রায় দুনিয়ার চিন্তা মানুষের মনের ভেতর অভাবের ভয় বাড়িয়ে দেওয়া ছাড়া কোনো কল্যাণ বয়ে আনে না। তবে তাওয়াক্কুল বলতে বাস্তব কর্ম ও চেষ্টা পরিত্যাগ করে হাত গুটিয়ে বসে থাকাকে বোঝায় না।

শরিয়াহ ও আকিদার দৃষ্টিতে তাওয়াক্কুল হলো, কোনো লক্ষ্য অর্জনে বৈধ উপায় ও উপকরণ পুরোপুরি গ্রহণ করার পর ফলাফলের জন্য সম্পূর্ণভাবে মহান আল্লাহর ওপর নির্ভর করা। সুরা তালাকের তৃতীয় আয়াতে আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করে, তার জন্য তিনিই যথেষ্ট। উপায় অবলম্বন ও তাওয়াক্কুলের বাস্তব ভারসাম্য বুঝিয়ে দিতে গিয়ে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক বেদুইনকে স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছিলেন, আগে তোমার উটটিকে শক্ত রশি দিয়ে বাঁধো, তারপর আল্লাহর ওপর ভরসা করো।

পরিশ্রম বা উপকরণের ব্যবহার বর্জন করে ঘরে বসে অলস সময় পার করার নাম তাওয়াক্কুল নয়। এই পৃথিবী মূলত মানুষের জন্য একটি পরীক্ষাগার, যেখানে নানা প্রতিকূলতার মাধ্যমে মানুষকে পরীক্ষা করা হয়। সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য বর্তমানের দায়িত্ব নিষ্ঠার সাথে পালন করা, সৎপথে জীবিকা অন্বেষণ করা এবং চূড়ান্ত ফায়সালার চাবিকাঠি পরম করুণাময়ের ওপর ছেড়ে দেওয়াই ভবিষ্যৎ নিয়ে অতিরিক্ত মানসিক উদ্বেগ কাটিয়ে ওঠার একমাত্র পথ।