বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,

সুন্দরবন উপকূলে জোয়ারের জলে চাঁদনীমুখার জীবনসংগ্রাম

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

সেপ্টেম্বর ৩০, ২০২৬, ১১:০৯ এএম

সুন্দরবন উপকূলে জোয়ারের জলে চাঁদনীমুখার জীবনসংগ্রাম

সাতক্ষীরা জেলা শহর থেকে প্রায় ৭১ কিলোমিটার দক্ষিণে শ্যামনগর উপজেলার বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়ন। সেখান থেকে নীলডুমুর খেয়াঘাট পেরিয়ে নৌপথে উপকূলের নানা প্রান্তে যাতায়াত করতে হয়। খোলপেটুয়া নদীর উত্তর-পশ্চিম পাড়ের এই নীলডুমুর ঘাট থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে গেলে পৌঁছানো যায় গাবুরা ইউনিয়নের হরিশখালি ঘাটে। প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় আইলার ধ্বংসযজ্ঞ আর দৈনন্দিন জোয়ার-ভাটার তীব্র স্রোতে এই ঘাটের অবস্থা এখন অত্যন্ত জরাজীর্ণ। মোটরসাইকেলই এই উপকূলীয় জনপদের প্রধান ভরসা হলেও পিচের পাকা সড়ক নেই বললেই চলে। কিছু রাস্তায় ইটের সোলিং থাকলেও পুরো দ্বীপের মানুষের জীবন ও জীবিকা মূলত দীর্ঘ এক বেড়িবাঁধের সুরক্ষার সাথে বাঁধা।

খোলপেটুয়া নদীর জল বেড়িবাঁধের স্লুইসগেট দিয়ে ভেতরে ঢুকে চাঁদনীমুখা খাল নামে প্রবাহিত হচ্ছে। এই খালের নামেই খালের পাড়ে গড়ে ওঠা গ্রামের নাম রাখা হয়েছে চাঁদনীমুখা। শ্যামনগর উপজেলা সদর থেকে প্রায় ২৮ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত দ্বীপ ইউনিয়ন গাবুরার ১৫টি গ্রামের অন্যতম একটি এই গ্রাম। গাবুরার শেষ প্রান্তে নদী আর ম্যানগ্রোভ সুন্দরবনের বুক ঘেঁষে থাকা এই গ্রামটিতে প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেন বারো মাসের নিত্যসঙ্গী।

গ্রামের নিচু এলাকাগুলোয় তীব্র স্থানাভাবের সাথে যোগ হয়েছে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা। এখানে জলই মানুষের অস্তিত্বের প্রধান নিয়ামক। নদী ও খাল দিয়ে ঘেরা এই গ্রামে এক পাড়া থেকে আরেক পাড়ায় চলাচলের প্রধান ভরসা বাঁশের সাঁকো। প্রতিটি বসতবাড়িতে তাকালেই চোখে পড়ে সারিবদ্ধ প্লাস্টিকের পানির ড্রাম ও ট্যাংক। মাটিতে লবণাক্ততার মাত্রা বিপজ্জনকভাবে বেড়ে যাওয়ায় ফলদ বৃক্ষসহ সব ধরনের গাছপালার সংখ্যা দিন দিন আশঙ্কাজনক হারে কমে যাচ্ছে। খোলা জায়গার সংকটের কারণে গৃহস্থালির হাঁস-মুরগি ও ছাগল পালনেও সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। জলাবদ্ধতার কারণে এমনকি এক ঘর থেকে আরেক ঘরে যেতেও সাঁকো ব্যবহার করতে হয়। খোলা উঠান না থাকায় নারীরা ঘরের দাওয়ায় বসেই রান্নাবান্না ও গৃহস্থালির বাকি কাজ সারেন।

দৈনন্দিন ব্যবহারের কাজে স্থানীয় পুকুরের নোনা জল কাজে লাগানো হলেও ভূপৃষ্ঠ কিংবা ভূগর্ভের পানি পানের সম্পূর্ণ অনুপযোগী। খাবার পানির জন্য গ্রামের নারীদের ছুটতে হয় দূরদূরান্তের উৎসে। মটকা, ড্রাম কিংবা ট্যাংক নেই এমন কোনো বসতবাড়ি চাঁদনীমুখায় খুঁজে পাওয়া যাবে না। বৃষ্টির মৌসুমে ছাদের পানি পাইপের মাধ্যমে বড় প্লাস্টিক ট্যাংকে জমিয়ে রাখা হয়। তবে শুকনো মৌসুমে দূরবর্তী নদী পেরিয়ে ড্রামে করে পানি কিনে এনে অত্যন্ত হিসাব করে পান করতে হয়। স্থানীয় পানি ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের মাধ্যমে মিষ্টি পানি সরবরাহের কিছু সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ থাকলেও চাহিদার তুলনায় তা অপ্রতুল এবং বেশিরভাগ সময় বিকল থাকে।

পাথরঘাটা বা নদীর ওপার থেকে এক ড্রাম পানি কিনতে খরচ হয় সাত টাকা, আর বহন করে নৌকায় ঘরে আনতে গুণতে হয় ত্রিশ টাকা পর্যন্ত। চারজনের একটি পরিবারে দুই ড্রাম পানি চার দিনও চলে না, ফলে প্রতি চার দিনে কেবল পানির পেছনেই ব্যয় হয় ষাট টাকা। ভিটেমাটিহীন গরিব দিনমজুরদের পক্ষে এই খরচ চালানো অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকে ঋণ করে ২৫ হাজার টাকা দিয়ে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ট্যাংক কিনে কোনোমতে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছেন। সুপেয় পানির তীব্র সংকট এবং বাধ্য হয়ে নোনা জলে গোসল ও ধোয়াধোয়ার কারণে স্থানীয়দের মাঝে চর্মরোগ ও নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি ক্রমাগত বাড়ছে।

উপকূলীয় এই জনপদে সুপেয় পানির পাশাপাশি দেখা দিয়েছে তীব্র জ্বালানি সংকট। জোয়ারের সময় সুন্দরবনের গভীর থেকে খোলপেটুয়া নদী হয়ে চাঁদনীমুখা খালে ভেসে আসে সুন্দরী, গেওয়া, গরান ও কেওড়া গাছের ফল। এর মধ্যে গোল গোল সুন্দরী ফল সংগ্রহ করে রোদে শুকিয়ে নেন নারীরা। এই ফল অত্যন্ত দাহ্য হওয়ায় দীর্ঘক্ষণ চুলায় জ্বলে। তবে গ্রামবাসী জ্বালানি হিসেবে ফলগুলো জ্বালিয়ে ফেলায় বনে নতুন চারা গজানোর স্বাভাবিক চক্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

চাঁদনীমুখার সিংহভাগ মানুষের প্রধান পেশা সুন্দরবনের নদী ও খাঁড়িতে মাছ এবং কাঁকড়া শিকার। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তালিকায় দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২৩ নম্বর নদী হিসেবে চিহ্নিত এই খোলপেটুয়া নদীর দৈর্ঘ্য প্রায় ৫৬ কিলোমিটার এবং গড় প্রস্থ প্রায় আধা কিলোমিটার। আশাশুনি উপজেলার বেতনা নদী থেকে উৎপত্তি হয়ে সুন্দরবন ঘেঁষে কয়রা উপজেলার বেদকাশী হয়ে এই নদী মিশেছে পাঙ্গাশিয়া নদীতে।

নৌকা আর নানা ধরনের জাল নিয়ে এই নদীর বুক চিরে সুন্দরবনের ভেতরে পাড়ি জমান জেলেরা। জেলেদের পাশাপাশি মধু আহরণকারী মৌয়াল, কাঠুরে বাওয়ালি এবং শামুক-ঝিনুক সংগ্রহকারী চুনারীদের জীবিকাও এই নদীকেন্দ্রিক। সুন্দরবনের ভেতরে খাল ও খাঁড়ি থেকে অপরিকল্পিতভাবে শামুক-ঝিনুক তোলায় জলজ বাস্তুতন্ত্রের স্বাভাবিক পানি পরিশোধন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

সুন্দরবনের নদী-খালে ঠেলা জাল দিয়ে বাগদা, গলদা ও হরিণা চিংড়ির রেণুপোনা শিকার করেন বিপুল সংখ্যক মানুষ। এই রেণু সংগ্রহের সময় একটি চিংড়ির পোনার সাথে অন্য বিভিন্ন মাছের অন্তত ৭০ থেকে ৮০টি পোনা নষ্ট হয়ে যায়। সংগৃহীত রেণু স্থানীয় চিংড়ি ঘেরগুলোতে সরবরাহ করা হয়। প্রতি বছর সরকারি প্রজনন মৌসুমের অংশ হিসেবে জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত মাছ ও পোনা আহরণে নিষেধাজ্ঞা থাকে।

শ্যামনগর উপজেলায় নদী ও খালে মাছ ধরেন প্রায় আড়াই হাজার নিবন্ধিত জেলে। এর পাশাপাশি সাতক্ষীরা উপকূলের প্রায় বিশ হাজার নারী মৎস্যজীবীর মধ্যে কেবল গাবুরা ইউনিয়নেই চার হাজার নারী প্রতিদিন জাল ফেলে মাছ ধরেন। বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রায় ৮৪ প্রজাতির মাছ এই অঞ্চলে পাওয়া যায়।

গ্রামের এক কিলোমিটার দক্ষিণে সাতক্ষীরা রেঞ্জের আওতাধীন সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বনভূমি। প্রায় এক হাজার বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই বনভূমি শ্যামনগর উপজেলার অর্ধেকেরও বেশি জায়গা জুড়ে বিস্তৃত। শ্বাসমূলধারী সুন্দরী, গেওয়া, কেওড়া ও বাইনসহ প্রায় ৩৫ প্রজাতির নোনাবান্ধব উদ্ভিদের চাদরে ঢাকা এই অরণ্য। একদিকে রয়েল বেঙ্গল টাইগার আর অন্যদিকে নোনা জলের কুমিরের সাথে প্রতিনিয়ত লড়াই করে স্থানীয় বনজীবীরা কাঠ, গোলপাতা, মধু ও কাঁকড়া আহরণ করেন।

সিডর, আইলা, আমফান, বুলবুল ও রেমালের মতো একেকটি প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় এই ভূখণ্ডের মানচিত্র ক্ষতবিক্ষত করেছে। খেলার মাঠ কেড়ে নেওয়ায় শিশুরা এখন খেলাধুলার জায়গা খুঁজে নেয় সরু বেড়িবাঁধের ওপর। বাঁধ ভেঙে নোনা জল ঢুকে তলিয়ে যায় বসতবাড়ি। পারশে ও ভেটকি মাছ চাষের জন্য প্রভাবশালীরা নদী থেকে নোনা পানি ঢুকিয়ে যত্রতত্র ঘের তৈরি করায় নিম্নাঞ্চল স্থায়ী জলাবদ্ধতার শিকার হয়েছে। স্টাইরোফোম বা থার্মোকল দিয়ে তৈরি করা ভেলায় চড়ে বাসিন্দাদের এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়িতে যেতে হয়।

আইলার মতো বিধ্বংসী ঝড়ে বসতবাড়ি ও সম্বল হারিয়ে এই গ্রামের শত শত মানুষ বাঁধের ওপর আশ্রয় নিয়েছিলেন এবং পরবর্তীতে কোনোমতে মাথা গোঁজার ঠাঁই পেলেও দারিদ্র্য পিছু ছাড়েনি। প্রতিটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর এই অঞ্চলের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ পরিবার কর্মসংস্থান হারিয়ে নতুন করে ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ে। এক-চতুর্থাংশ পরিবার পড়ে চরম খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায়। প্রতিদিনের জোয়ার-ভাটার সাথে টিকে থাকার এই সংগ্রাম চাঁদনীমুখার মানুষকে প্রতিনিয়ত বানিয়ে তুলছে জলবায়ু উদ্বাস্তু।