সেপ্টেম্বর ৩০, ২০২৬, ১১:০৪ এএম
বাংলাদেশের বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারে এক নীরব রূপান্তর ঘটাচ্ছে চীনা ব্র্যান্ডগুলো। জীবাশ্ম জ্বালানির ক্রমবর্ধমান সংকটের মুখে বিদ্যুৎচালিত স্কুটার ও চার চাকার ব্যক্তিগত গাড়ির চাহিদা বাড়ছে। উভয় শ্রেণির যানবাহনেই বর্তমানে চীনের নিয়ন্ত্রণ দৃশ্যমান। দেশের চার চাকার বাজারে যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানির প্রতিষ্ঠিত ব্র্যান্ডের গাড়ি উপস্থিত থাকলেও সামগ্রিক বিক্রির প্রায় ৭০ থেকে ৯০ শতাংশ শেয়ার এখন চীনা প্রতিষ্ঠানের দখলে চলে গেছে। সাশ্রয়ী মূল্য, আধুনিক প্রযুক্তিগত সুবিধা এবং বিক্রয়োত্তর ব্যবস্থাপনায় জোর দিয়ে স্থানীয় ক্রেতাদের কাছে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করেছে তারা।
চার চাকার ব্যক্তিগত গাড়ি ও দুই চাকার স্কুটারের বাজারে চীনা তৈরি বাহন এখন শীর্ষে।

দেশে টেসলা, মার্সিডিজ বেঞ্জ, বিএমডব্লিউ ও অডির মতো বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠানের বৈদ্যুতিক গাড়ি বিক্রি হলেও সেখানে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে বিওয়াইডি। একই সঙ্গে চীনা ডিপাল ও এমজি ব্র্যান্ডের গাড়িও বিক্রি হচ্ছে। স্থানীয় বাজারে যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি ও জাপানের তৈরি গাড়ির দাম সাধারণের নাগালের বাইরে হলেও চীনা ব্র্যান্ডের গাড়ি মিলছে ৩৫ লাখ থেকে এক কোটি টাকার মধ্যে। ৩৫ লাখ থেকে ৭০ লাখ টাকা বাজেটের মধ্যে মধ্যবিত্ত ও উচ্চমধ্যবিত্ত ক্রেতাদের একটি বড় অংশ এখন চীনা গাড়ির দিকে ঝুঁকছেন। যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানির তিনটি ব্র্যান্ড মার্সিডিজ বেঞ্জ, বিএমডব্লিউ ও অডি বছরে সম্মিলিতভাবে ২০০ থেকে ২৫০টি গাড়ি বিক্রি করলেও শুধু বিওয়াইডি যাত্রা শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত দেড় হাজারের বেশি গাড়ি বিক্রি করেছে। যেখানে দেশে এখন পর্যন্ত তিন হাজার বৈদ্যুতিক গাড়ি বিক্রির অনানুষ্ঠানিক তথ্য রয়েছে, সেখানে একক ব্র্যান্ডের ১০০টি নতুন গাড়ি একসঙ্গে বিক্রির নজিরও তৈরি হয়েছে।
বিদ্যুৎচালিত স্কুটারের বাজার আরও দ্রুত গতিতে সম্প্রসারিত হচ্ছে।

গত বছরের নভেম্বরে যেখানে মাসে ৯৬৯টি স্কুটার বিক্রি হয়েছিল, চলতি বছরের আগস্টে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে তিন হাজার ৪১৪টিতে। মাঝে তীব্র জ্বালানি সংকটের সময় গত এপ্রিলে এক মাসেই বিক্রি উঠেছিল প্রায় পাঁচ হাজারে। এছাড়া ডিসেম্বরে এক হাজার ২৮৯টি, জানুয়ারিতে এক হাজার ৪১৭টি, ফেব্রুয়ারিতে এক হাজার ৫২৯টি, মার্চে প্রায় আড়াই হাজার, মে মাসে তিন হাজার, জুনে তিন হাজার আটশ এবং জুলাইয়ে তিন হাজার ৭৭৫টি স্কুটার বিক্রি হয়। এই খাতে ইয়াদিয়া, রিভো, টেইলজি ও রাইডোর মতো ব্র্যান্ডগুলো এগিয়ে রয়েছে, যার প্রায় পুরো বাজারই চীননির্ভর। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের সরকারি হিসাব বলছে, দেশে এখন পর্যন্ত নিবন্ধিত বৈদ্যুতিক গাড়ির সংখ্যা ৮২৬টি ছাড়িয়েছে। ২০২১ সালে চারটি, ২০২২ সালে দুটি, ২০২৩ সালে ৩৮টি, ২০২৪ সালে ৬৬টি এবং ২০২৫ সালে ২৩৮টি গাড়ি নিবন্ধিত হয়। সবশেষ চলতি বছরে সর্বোচ্চ ৪৭৮টি গাড়ি নিবন্ধন পেয়েছে।
দেশীয় শিল্পোদ্যোক্তারাও এখন এই খাতের রূপান্তরে শামিল হচ্ছেন।
দেশের মোট বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারের তিন শতাংশ রয়েছে আকিজ ভেঞ্চার্সের হাতে। প্রতিষ্ঠানটির সহযোগী প্রতিষ্ঠান আকিজ রিনিউঅ্যাবল এনার্জি অ্যান্ড অটোমোবাইলস লিমিটেডের ব্র্যান্ড বিভাগের সিনিয়র ম্যানেজার এ এম রাকিবুল আহসান জানান, দেশের বর্তমান বাজারের প্রায় ৯৫ শতাংশই চীনা গাড়ি। তাদের আনা পণ্যের মধ্যে সম্পূর্ণ বৈদ্যুতিক বাহনের পাশাপাশি রেঞ্জ এক্সটেন্ডেড গাড়িও রয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, চীনা গাড়ির নকশা ও ব্যবহার সুবিধাজনক হওয়ার পাশাপাশি সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো জ্বালানি সাশ্রয়। কিছু মডেলে প্রতি কিলোমিটারে পরিচালন ব্যয় হয় মাত্র এক টাকা ৬০ থেকে এক টাকা ৭০ পয়সা। প্রতিষ্ঠানটি ব্যাটারি ও মোটরে ছয় থেকে আট বছরের সরাসরি ওয়ারেন্টি দিচ্ছে এবং তিন বছরের মধ্যে গাড়ি ফেরত দিয়ে নতুন মডেল কেনার বাইব্যাক সুবিধাও রেখেছে। তবে লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির কার্যক্ষমতা দীর্ঘ ব্যবহারে ধীরে ধীরে কমে আসায় আট বছর পর তা পরিবর্তনের প্রয়োজন হতে পারে।

প্রযুক্তিগত প্রস্তুতিতে চীন অনেক আগে থেকেই এগিয়ে ছিল বলে মনে করছেন স্থানীয় অটোমোবাইল খাতের প্রতিনিধিরা। রানার অটোমোবাইল পিএলসির ন্যাশনাল সেলস ম্যানেজার টি এম আসিবুল ইমরান জানান, অন্যান্য দেশ যখন ইঞ্জিনচালিত বাহন নিয়ে ব্যস্ত ছিল, তখন চীন ব্যাটারিচালিত প্রযুক্তির গবেষণা ও উন্নয়ন শুরু করে। কাঁচামাল ও প্রয়োজনীয় উপাদানের সহজলভ্যতা থাকায় তারা দ্রুত উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি করতে পেরেছে। ফলে বাংলাদেশে আমদানিকৃত বৈদ্যুতিক বাইকের সিংহভাগই আসছে চীন থেকে। ২০২৪ সালের এপ্রিলে আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করা বিওয়াইডি দাবি করছে, দেশের সড়কে বর্তমানে তাদের দেড় হাজারের বেশি গাড়ি চলাচল করছে। বিওয়াইডি বাংলাদেশের চিফ মার্কেটিং অফিসার ইমতিয়াজ নওশের জানান, ২০৩০ সালের মধ্যে সরকার ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বৈদ্যুতিক গাড়ি ব্যবহারের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ ও শুল্ক ছাড়ের উদ্যোগ নেওয়ায় এই বাজারের সম্ভাবনা বেশ জোরালো। তিনি বলেন, ইঞ্জিনিয়ারিং, সেফটি টেকনোলজি ও বিল্ড কোয়ালিটি দিয়েই চীনা গাড়ির সক্ষমতা যাচাই করা উচিত এবং তাদের ব্লেড ব্যাটারি থেকে শুরু করে পুরো কাঠামোটি সর্বোচ্চ নিরাপত্তাকে কেন্দ্র করেই তৈরি।
স্থানীয় সংযোজন শিল্পে নজর দিতে শুরু করেছে উৎপাদনকারী ও বিনিয়োগকারীরা।
বাংলাদেশ-চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মোহা. খোরশেদ আলম জানান, চীনা বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে গাড়ি সংযোজন কারখানা স্থাপনের জন্য অর্থনৈতিক অঞ্চল ও রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকায় জায়গা খুঁজছেন এবং বিনিয়োগের প্রাথমিক সম্ভাব্যতা যাচাই করছেন। দেশীয় সাশ্রয়ী ব্র্যান্ড রাইডো ৫১ হাজার টাকা থেকে স্কুটার সরবরাহ করছে। প্রতিষ্ঠানটির হেড অব মার্কেটিং শরীফুল ইসলাম জানান, দেশে বিক্রি হওয়া প্রায় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ স্কুটার বিভিন্ন যন্ত্রাংশ প্যাকেজ হিসেবে এনে দেশেই সংযোজন করা হচ্ছে। আরএফএল গ্রুপের এই প্রতিষ্ঠানটি আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে ধাপে ধাপে দেশীয়ভাবে যন্ত্রাংশ উৎপাদনের পরিধি বাড়াচ্ছে।
ব্যবহারকারীদের অভিজ্ঞতায় সাশ্রয়ী খরচ ও সেবার বিষয়টি প্রধান সুবিধা হিসেবে উঠে আসছে। ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ের রিভো স্কুটার চালক মো. হান্নান জানান, মাত্র নয় থেকে দশ টাকার বিদ্যুতে একবার পূর্ণ চার্জ দিলে ৭০ থেকে ৭২ কিলোমিটার চলা যায়। তিনি জানান, মোটরসাইকেলের তুলনায় গতি কিছুটা কম হলেও নিয়ন্ত্রণ ভালো হওয়ায় ঝাঁকুনি ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেকটাই কমে যায়। অন্যদিকে বিওয়াইডি গাড়ি ব্যবহারকারী অরেঞ্জ বিডির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আশরাফুল কবির জুয়েল জানান, আগে তার জীবাশ্ম জ্বালানির গাড়িতে প্রতি কিলোমিটারে খরচ হতো প্রায় ১৪ টাকা, যা এখন তিন থেকে সাড়ে তিন টাকায় নেমে এসেছে। বাসায় নিজস্ব চার্জার দিয়ে এক চার্জে ৮৫ থেকে ৯০ কিলোমিটার চলে তার গাড়ি, যা দৈনন্দিন অফিস যাতায়াতে তিন দিন পর্যন্ত চলে যায়। গুলশানে চাকা ফেটে যাওয়ার আধা ঘণ্টার মধ্যে প্রতিষ্ঠানের প্রকৌশলীরা এসে বিনা খরচে চাকা বদলে দিয়েছেন বলেও জানান তিনি।
অবকাঠামো দুর্বলতা এখনো এই সম্ভাবনাময় খাতের প্রধান অন্তরায়।

বর্তমানে সারা দেশে মাত্র ৪০ থেকে ৫০টি চার্জিং স্টেশন কার্যকর রয়েছে, যার প্রায় সবই বেসরকারি উদ্যোগে স্থাপিত। আকিজ রিনিউঅ্যাবল এনার্জি চলতি বছরেই বিভিন্ন মহাসড়ক, শহর, পাঁচ তারকা হোটেল ও হাসপাতালে ৫০ থেকে ৬০টি চার্জিং স্টেশন বসানোর উদ্যোগ নিয়েছে। অন্যদিকে বিওয়াইডি প্রতিটি গাড়ির সঙ্গে বাসায় ব্যবহারের জন্য দুটি চার্জার বিনামূল্যে স্থাপনের পাশাপাশি নিজস্ব ও অংশীদারদের নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ করছে। পরিবহন ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. হাদিউজ্জামান মনে করেন, আগামী ১৫ থেকে ২০ বছর পর জীবাশ্ম জ্বালানির গাড়ি উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাবে। চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিভিন্ন রেঞ্জ ও দামের গাড়ি তৈরির সক্ষমতার কারণে তাদের সঙ্গে খরচের দিক থেকে প্রতিযোগিতা করা কঠিন। তবে ব্যাটারির টেকসই স্থায়িত্ব এবং চার্জিং ব্যবস্থা নিয়ে সাধারণ মানুষের দ্বিধা কাটাতে প্রাতিষ্ঠানিক আস্থা অর্জন জরুরি বলে তিনি উল্লেখ করেন।
পরিবেশ সুরক্ষায় বৈদ্যুতিক যান ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন পরিবেশকর্মীরা। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর কবির জানান, লক্কড়-ঝক্কড় যানবাহনের দূষণ কমাতে বিদ্যুৎচালিত যান ভূমিকা রাখবে, তবে গাড়ির সংখ্যা বাড়লে বিদ্যুতের অতিরিক্ত চাহিদা কীভাবে মেটানো হবে তা বিবেচনায় নিতে হবে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের নির্বাহী পরিচালক ড. নাজনীন আহমেদ জানান, দেশে শুধু আমদানি না করে সংযোজন শিল্প ও চার্জিং স্টেশন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা গেলে নতুন কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ তৈরি হবে এবং পরবর্তীতে বড় গণপরিবহনেও বিদ্যুৎচালিত যান নামানো সম্ভব হবে।
জাতীয় বাজেটে দেওয়া বিভিন্ন করছাড়ের ফলে ৫০ হাজার ডলারের নিচের মূল্যের বৈদ্যুতিক গাড়ির দাম পাঁচ থেকে ছয় লাখ টাকা পর্যন্ত কমার সুযোগ তৈরি হয়েছে। বর্তমানে বিশ্বে উৎপাদিত মোট দুই কোটি ২০ লাখ বৈদ্যুতিক গাড়ির প্রায় ৭৫ শতাংশ তৈরি করছে চীন। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার তথ্য বলছে, গত বছর চীনের এই বাহন রপ্তানি রেকর্ড ২৫ লাখে পৌঁছেছে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন