সেপ্টেম্বর ৩০, ২০২৬, ১০:৪৬ এএম
সাইবার পরিসরে অপতথ্য, গুজব ও অনলাইন হয়রানি প্রতিরোধে শাস্তির মাত্রা বাড়িয়ে সাইবার সুরক্ষা আইনে বড় ধরনের সংশোধনী আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। নতুন খসড়া নীতিমালায় গুজব, অপতথ্য, হেয় প্রতিপন্ন করা এবং মানহানি—এই চারটি বিষয়কে সুনির্দিষ্ট অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে কঠোর আইনি পদক্ষেপের প্রস্তাব করা হয়েছে। আইনের খসড়াটি মন্ত্রিসভায় উপস্থাপনের পর বিশেষজ্ঞ ও অংশীজনদের মতামতের জন্য উন্মুক্ত করা হয়।
খসড়া প্রস্তাবনায় যুক্ত হওয়া নতুন ২৬/ক ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি ডিজিটাল মাধ্যমে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে গুজব ও অপতথ্য প্রচার করলে তা আমলযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে। এ অপরাধে দোষী প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ দশ বছরের কারাদণ্ড অথবা অনধিক চল্লিশ লাখ টাকা অর্থদণ্ড কিংবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। খসড়ায় গুজবের সংজ্ঞায়ন করে বলা হয়েছে, এমন যেকোনো অযাচাইকৃত তথ্য বা দাবি যা জনমনে বিভ্রান্তি, আতঙ্ক, উত্তেজনা বা সামাজিক বিশৃঙ্খলা তৈরি করে বা তৈরির ঝুঁকি সৃষ্টি করে, তা-ই গুজব হিসেবে গণ্য হবে।
আইনের ২৫ নম্বর ধারাতেও সংশোধন এনে শাস্তি ও পরিধি বিস্তৃত করা হচ্ছে। এই ধারার অধীনে কোনো ব্যক্তি যদি অন্য কারও মানহানি বা হেয় করতে কোনো তথ্য, অডিও, ভিডিও, গ্রাফিক্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্বারা নির্মিত কনটেন্ট তৈরি ও প্রচার করেন, তবে অনধিক পাঁচ বছরের কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ বিশ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। ভুক্তভোগী যদি কোনো নারী অথবা আঠারো বছরের কম বয়সী শিশু হন, তবে অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী সাজা বৃদ্ধি পেয়ে সর্বোচ্চ দশ বছরের কারাদণ্ড এবং চল্লিশ লাখ টাকা অর্থদণ্ড হতে পারে।
প্রস্তাবিত সংশোধনীতে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিল গঠনের কথা বলা হয়েছে। এই কাউন্সিলে সরকারের পাঁচজন মন্ত্রী, প্রশাসনিক কর্মকর্তা এবং সরকার মনোনীত দুজন বেসরকারি আইটি বিশেষজ্ঞ সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত থাকবেন। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা সংশ্লিষ্ট সংস্থার কাছে যদি কোনো কনটেন্ট দেশের অখণ্ডতা, জাতীয় নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা, জনশৃঙ্খলা ক্ষুণ্ণকারী কিংবা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার মতো প্রতীয়মান হয়, তবে তা অপসারণ বা ব্লক করার প্রশাসনিক ক্ষমতা থাকবে।
আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান জানিয়েছেন, সব অংশীজনের সাথে কার্যকর আলোচনার মাধ্যমেই চূড়ান্ত আইন প্রণয়ন করা হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ উল্লেখ করেছেন, আইনটিকে কোনো অবস্থাতেই নাগরিকদের মতপ্রকাশের বিরুদ্ধে নিপীড়নমূলক হতে দেওয়া হবে না। আইন সংশোধনের এই উদ্যোগের পেছনে ডিজিটাল মাধ্যমে সংঘবদ্ধ ব্ল্যাকমেইলিং, চাঁদাবাজি এবং চরিত্রহননের মতো উদ্বেগজনক প্রবণতা বৃদ্ধিকে মূল কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশেষ করে বিভিন্ন গবেষণা ও পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী নারীদের একটি বড় অংশ নানাভাবে ডিজিটাল বুলিংয়ের শিকার হচ্ছেন। এমনকি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও নাগরিকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পাশাপাশি অন্যের সম্মান রক্ষা ও সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার ক্ষেত্রে আইনি বিধিনিষেধের স্বীকৃতি রয়েছে। সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা এবং নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক সনদেও বলা হয়েছে, ব্যক্তিস্বাধীনতা কোনোভাবেই অন্যের অধিকার বা রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা নষ্টের কারণ হতে পারে না। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের অপব্যবহার রোধ এবং নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এই আইনি সংস্কারকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করছে সরকার।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন