সোমবার, ০৫ অক্টোবর, ২০২৬,
শতবর্ষের পূজা ঐতিহ্য

অসুরবধ নেই, মা এখানে দ্বিভুজা মণ্ডলবাড়ির ঐতিহ্যবাহী পূজা

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

অক্টোবর ৫, ২০২৬, ০৭:৪৯ পিএম

অসুরবধ নেই, মা এখানে দ্বিভুজা  মণ্ডলবাড়ির ঐতিহ্যবাহী পূজা

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা ঘিরে চারদিকে সাজ সাজ রব আর প্রতিমায় রং তুলির ব্যস্ততা শুরু হলেও পশ্চিমবঙ্গের একটি প্রাচীন পারিবারিক পূজায় দেখা যায় একেবারেই ভিন্ন রূপ। প্রচলিত দশভুজা প্রতিমা কিংবা মহিষাসুর বধের কোনো দৃশ্য সেখানে নেই, বরং দুই হাতবিশিষ্ট দেবী দুর্গা পূজিত হন মহাদেব শিবের পাশে হরগৌরী রূপে।

ব্যতিক্রমী এই আয়োজনটি চলে আসছে উত্তর চব্বিশ পরগনার ইছাপুরের নবাবগঞ্জ এলাকার মণ্ডলবাড়িতে। গঙ্গার তীরে অবস্থিত পুরোনো ও জরাজীর্ণ এই ভবনটি স্থানীয় মানুষের কাছে পরী বাড়ি নামে সমধিক পরিচিত। এই ঐতিহাসিক ভিটাতেই বংশপরম্পরায় বসবাস করছেন বাঞ্ছারাম মণ্ডলের বংশধরেরা। তাদের পারিবারিক দুর্গাপূজাটি এবার ২১৮ বছরে পদার্পণ করছে।পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, পরিবারটি মূলত বৈষ্ণব ধর্মাবলম্বী হওয়ার কারণে তাদের সমস্ত ধর্মীয় আচার বৈষ্ণবীয় রীতি ও অহিংস ধারা মেনেই পরিচালিত হয়।

এখানে মহিষাসুর বধের কোনো বিধান নেই। দেবী দুর্গার দশটি হাত থাকে না, তিনি বিরাজ করেন শান্ত ও দ্বিভুজা রূপে। দেবীর নৈবেদ্য ও প্রসাদ হিসেবে পরিবেশন করা হয় হাতে ভাজা লুচি, রকমারি তরকারি ভাজা, বিশেষ মিষ্টান্ন, ঐতিহ্যবাহী অন্ন ও নানা পদের ফলমূল। প্রতিমা নির্মাণের সাথে দীর্ঘ ছয় বছর ধরে যুক্ত রয়েছেন স্থানীয় মৃৎশিল্পী অসীম পাল।

প্রায় দুই মাস ধরে নিপুণ হাতে তিনি এই প্রতিমা তৈরি করেছেন। একচালার কাঠামোয় গড়া এই প্রতিমায় বর্তমানে রঙের চূড়ান্ত প্রলেপ দেওয়ার কাজ চলছে। রঙের কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর দেবীকে ফল ও গহনা দিয়ে সাজিয়ে ঠাকুরদালানে নিয়ে যাওয়া হবে। বাঞ্ছারাম মণ্ডলের পরিবারের অনেক সদস্য জীবিকা ও পেশাগত প্রয়োজনে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে বসবাস করেন।

তবে দুর্গাপূজার এই বিশেষ দিনগুলোতে তারা শিকড়ের টানে পুরনো ভিটেতে ফিরে আসেন। পরিবারের সকল সদস্য ও স্থানীয় বাসিন্দারা এক হয়ে উৎসবের পাঁচ দিন নিষ্ঠার সঙ্গে মায়ের আরাধনায় অংশ নেন। পূজার সমাপনী পর্বে রয়েছে নৌকায় করে বিসর্জনের এক চোখজুড়ানো ঐতিহ্য।

পূজার আনুষ্ঠানিকতা শেষে প্রতিমাকে নৌকায় তুলে মাঝগঙ্গায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানেই দেবীর বিসর্জন সম্পন্ন করেন পরিবারের সদস্যরা। দুই শতাব্দীর বেশি সময় ধরে চলা এই আয়োজন কেবল মণ্ডল পরিবারের নিজস্ব উৎসব নয়, বরং ইছাপুরের নবাবগঞ্জের আঞ্চলিক ইতিহাস ও সংস্কৃতির এক অনন্য মেলবন্ধন হয়ে উঠেছে।