রবিবার, ০৮ নভেম্বর, ২০২৬,
ইসলামী জীবনব্যবস্থা

ইসলামে দাম্পত্য জীবনের আনন্দ ও বিনোদনের সীমারেখা কতদূর

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

নভেম্বর ৮, ২০২৬, ১০:৩৯ এএম

ইসলামে দাম্পত্য জীবনের আনন্দ ও বিনোদনের সীমারেখা কতদূর

ছবি: Ai

ইসলাম মানুষের স্বাভাবিক আনন্দ-উচ্ছ্বাস ও বৈধ বিনোদনের কখনোই বিরোধী নয়। বরং ইসলাম চায় মানুষের পারিবারিক জীবন পারস্পরিক ভালোবাসা, মায়া-মমতা ও প্রশান্তিতে পরিপূর্ণ থাকুক। ইসলামের দৃষ্টিতে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক কেবল দায়িত্ব পালন কিংবা সাংসারিক প্রয়োজন মেটানোর গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং পরস্পরকে আনন্দ দেওয়া, হাসি-খুশিতে সময় কাটানো এবং ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটানোও দাম্পত্য জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে এই আনন্দ উদ্যাপনের ক্ষেত্রেও ইসলামের কিছু সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ও শালীনতার সীমারেখা রয়েছে।

পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ সুরা রুমের একুশ নম্বর আয়াতে এরশাদ করেছেন, তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের থেকেই স্ত্রীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি পাও এবং তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। নিশ্চয় এর মধ্যে নিদর্শনাবলী রয়েছে সেই জাতির জন্য, যারা চিন্তা করে।

এই আয়াত থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, দাম্পত্য জীবনের অন্যতম মূল উদ্দেশ্য হলো পারস্পরিক দয়া ও ভালোবাসা। পরস্পরের সঙ্গে কাটানো আনন্দময় মুহূর্তগুলো সেই বন্ধনকে আরও মজবুত করতে সহযোগিতা করে। আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-ও তাঁর সাহাবিদের স্ত্রীকে আনন্দ দেওয়ার ব্যাপারে উৎসাহিত করেছেন। হজরত জাবির (রা.) বর্ণনা করেছেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁকে বিয়ে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আলোচনার সময় বলেছিলেন, তুমি কুমারী মেয়ে বিয়ে করলে না? যার সঙ্গে খেলা-কৌতুক করতে আর সেও তোমার সঙ্গে খেলা-কৌতুক করত। এই হাদিসে স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক আনন্দ ও ঘনিষ্ঠতার বিষয়টি সুন্দরভাবে উঠে এসেছে।

নবীজি (সা.) নিজেও তাঁর স্ত্রীদের মাঝে মাঝে আনন্দ দিতেন। হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি এক সফরে নবীজির সঙ্গে ছিলেন এবং তাঁর সঙ্গে দৌড় প্রতিযোগিতা করে আগে চলে গিয়েছিলেন। পরবর্তীতে তিনি কিছুটা মোটা হয়ে যাওয়ার পর আবারও দৌড় প্রতিযোগিতা করলে নবীজি তাঁকে পেছনে ফেলে বিজয়ী হন এবং বলেছিলেন যে, এই বিজয় সেই আগের বিজয়ের বদলা।

তবে বৈধ আনন্দের নামে কোনোভাবেই অনৈসলামিক বা অবৈধ কাজ করা যাবে না। স্ত্রীকে আনন্দিত করা একটি প্রশংসনীয় ভালো কাজ, কিন্তু সেই উদ্দেশ্যে বেপর্দা হওয়া, পরপুরুষের সামনে সৌন্দর্য প্রদর্শন করা, অশালীনতা ছড়ানো বা অন্যের মনে কুপ্রবৃত্তি জাগিয়ে তোলার মতো কাজ কোনোভাবেই বৈধ হতে পারে না। মহান আল্লাহ মুমিন পুরুষ ও নারী উভয়কেই দৃষ্টি সংযত রাখতে এবং লজ্জাস্থানের হেফাজত করতে নির্দেশ দিয়েছেন। সুরা নুরের ত্রিশ ও একত্রিশ নম্বর আয়াতে এ বিষয়ে কঠোর হিদায়েত এসেছে।

বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একধরনের উদ্বেগের প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কেউ কেউ স্ত্রীকে আনন্দ দেওয়ার নামে বিভিন্ন ভিডিও তৈরি করছেন, দাম্পত্য জীবনের অত্যন্ত ব্যক্তিগত মুহূর্ত জনসমক্ষে প্রকাশ করছেন কিংবা স্ত্রীকে সাজিয়ে-গুছিয়ে ক্যামেরার সামনে উপস্থাপন করছেন। অনেকে মনে করেন যে, বোরকা, হাত মোজা বা পা মোজা ব্যবহার করলেই তা হালাল বিনোদন হয়ে যায়, অথচ বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। কোনো কাজকে হালাল নাম দিলেই তা হালাল হয়ে যায় না; বরং কাজটির ধরন, পরিবেশ, উপস্থাপনা ও পরিণতি শরিয়তের আলোকে বিবেচনা করতে হবে।

স্বামী-স্ত্রীর ব্যক্তিগত আনন্দের বিষয়গুলো কেবল ব্যক্তিগত পরিসরেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত। দাম্পত্য জীবনের অন্তরঙ্গতা জনসমক্ষে প্রকাশ করা, স্ত্রীর সৌন্দর্য এমনভাবে উপস্থাপন করা যাতে পরপুরুষের দৃষ্টি আকৃষ্ট হয় কিংবা দর্শকদের মধ্যে অশালীন চিন্তা ও কৌতূহল সৃষ্টি হয়—এসব কাজ থেকে একজন মুমিনের সম্পূর্ণ বিরত থাকা জরুরি। সুরা আহজাবের তেত্রিশ নম্বর আয়াতে নারী জাতির সৌন্দর্য প্রদর্শনের ব্যাপারে ইসলামের সতর্ক অবস্থান স্পষ্ট করা হয়েছে।

একজন মুসলিম স্বামী তাঁর স্ত্রীকে আনন্দিত করার পাশাপাশি তাঁর সম্মান, পর্দা ও দ্বীনি মূল্যবোধ রক্ষা করার গুরুদায়িত্ব পালন করেন। একজন স্বামী কখনোই নিজের স্ত্রীকে এমন কোনো কাজে উৎসাহিত করতে পারেন না যার মাধ্যমে তিনি নিজে কিংবা অন্য কেউ গুনাহের দিকে ধাবিত হন। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ মুমিনদের নিজেদের ও পরিবার-পরিজনকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচানোর নির্দেশ দিয়েছেন।

অতএব, স্ত্রীকে আনন্দ দেওয়ার নামে এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া উচিত নয় যা তাঁকে কিংবা অন্য কাউকে আল্লাহর অবাধ্যতার পথে নিয়ে যায়। একজন মুসলিম স্বামী তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে ঘুরতে যেতে পারেন, একসঙ্গে খাবার খেতে পারেন, উপহার দিতে পারেন, হাসি-ঠাট্টা করতে পারেন, খেলাধুলা করতে পারেন এবং ঘরের ভেতরে একটি সুন্দর ও আনন্দঘন পরিবেশ তৈরি করতে পারেন। তবে এ ক্ষেত্রে সর্বাবস্থায় খেয়াল রাখতে হবে যেন সেখানে ইসলামবহির্ভূত কোনো কিছুর অনুপ্রবেশ না ঘটে। মহান আল্লাহ প্রতিটি পরিবারে শান্তি ও বরকত দান করুন।