নভেম্বর ৮, ২০২৬, ১০:২০ এএম
আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করতে শিক্ষার্থী ভিসাব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কারের পরিকল্পনা করছে দক্ষিণ কোরিয়া। কোরীয় ভাষায় দক্ষতা থাকলে মিলতে পারে আর্থিক প্রমাণ ছাড়াই শিক্ষার্থী ভিসা, খণ্ডকালীন কাজের সুযোগ এবং পড়াশোনা শেষে সর্বোচ্চ তিন বছর পর্যন্ত দেশটিতে থাকার অনুমতি।
নতুন এই প্রস্তাবে কোরীয় ভাষায় দক্ষতা, পড়াশোনার ফলাফল এবং কর্মসংস্থানের প্রস্তুতিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে কোরীয় ভাষায় নির্দিষ্ট পর্যায়ের দক্ষতা অর্জন করতে পারলে বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য ভিসা পাওয়া, পড়াশোনার পাশাপাশি পার্টটাইম কাজ করা এবং স্নাতক শেষ করে দেশটিতে অবস্থানের সুযোগ আরও বাড়বে।
দক্ষিণ কোরিয়া ২০২৭ সালের মধ্যে তিন লাখ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল। তবে নির্ধারিত সময়ের দুই বছর আগেই, ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে সেই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়। গত ফেব্রুয়ারিতে দেশটিতে বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা দাঁড়ায় তিন লাখ চৌদ্দ হাজারে। এবার শিক্ষার্থীসংখ্যা বাড়িয়ে চার লাখে উন্নীত করার পরিকল্পনা করেছে দেশটি।
এই লক্ষ্য অর্জনে দেশটির আইন মন্ত্রণালয় বিদেশি শিক্ষার্থীদের ভিসাব্যবস্থা উন্নয়নে গঠিত পরামর্শক পরিষদের সুপারিশ ও সিদ্ধান্ত সামনে এনেছে। গত এপ্রিলে গঠিত এই পরিষদের নেতৃত্বে রয়েছেন ভারপ্রাপ্ত আইনমন্ত্রী জিনসু লি। উচ্চশিক্ষা ও অভিবাসন খাতের বিশেষজ্ঞেরাও এতে যুক্ত রয়েছেন।
নতুন প্রস্তাবিত নিয়মে কোরীয় ভাষায় মধ্যম পর্যায়ের দক্ষতা থাকলে অধিকাংশ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীকে শিক্ষার্থী ভিসার আবেদনে কোনো আর্থিক সামর্থ্যের প্রমাণ দিতে হবে না। এই সুবিধা পেতে শিক্ষার্থীদের কোরীয় ভাষা দক্ষতা পরীক্ষায় লেভেল চার অথবা কোরিয়ান ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ইন্টিগ্রেশন প্রোগ্রামে লেভেল চার অর্জন করতে হবে।
তবে যেসব শিক্ষার্থীর ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও দেশটিতে থেকে যাওয়ার ঝুঁকি বেশি বলে বিবেচিত হবে, তাদের ক্ষেত্রে এই ছাড় প্রযোজ্য নাও হতে পারে। একইভাবে পড়াশোনার পরিবর্তে চাকরিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার আশঙ্কা থাকলে তাদের জন্য স্টাডি এক্সপেন্স সিকিউরিটি ডিপোজিট সিস্টেম চালু হতে পারে। এই ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট সময়ের জীবনযাত্রার ব্যয় মেটানোর জন্য শিক্ষার্থীকে অর্থ জমা রাখতে হবে।
নতুন প্রস্তাবে কেবল ভিসা পাওয়াই নয়, পড়াশোনার পাশাপাশি খণ্ডকালীন কাজের সুযোগের ক্ষেত্রেও কোরীয় ভাষার দক্ষতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবিত মানদণ্ড অনুযায়ী, পার্টটাইম কাজের যোগ্যতা অর্জনের জন্য শিক্ষার্থীদের ভাষা পরীক্ষায় লেভেল তিন থাকতে হবে। পাশাপাশি তাদের পড়াশোনার ফলাফলও বিবেচনায় নেওয়া হবে। অর্থাৎ দক্ষিণ কোরিয়ায় পড়তে যেতে আগ্রহীদের জন্য কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া যথেষ্ট হবে না, বরং ভাষা শেখা এবং ভালো একাডেমিক ফলাফল ধরে রাখাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
দক্ষিণ কোরিয়ায় উচ্চশিক্ষা শেষ করেও দেশটিতে থাকার সুযোগ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। নতুন কাঠামো অনুযায়ী, বিদেশি স্নাতকেরা তাদের কোরীয় ভাষার দক্ষতা এবং চাকরির প্রস্তুতির ওপর ভিত্তি করে এক থেকে তিন বছর পর্যন্ত থাকার অনুমতি পেতে পারেন। এছাড়া নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে স্নাতক সম্পন্ন করা বিদেশি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দেশটির সম্পর্ক বজায় রাখতে নতুন একটি ভিসা চালুর বিষয় বিবেচনা করছে সরকার। প্রস্তাবিত এই ভিসাটির নাম কোরিয়ান স্টাডি অ্যালামনাই ভিজিটর ভিসা।
বিজ্ঞান ও প্রকৌশল, উৎপাদনশিল্প এবং বিশেষায়িত কারিগরি পেশায় পড়াশোনা করা স্নাতকদের এ ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়া হতে পারে। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে যোগ্যতা এবং কোরীয় ভাষার শর্ত পূরণ করতে পারলে তারা দক্ষ কর্মী ভিসা বা ই-সেভেন পাওয়ার ক্ষেত্রেও অগ্রাধিকার বিবেচনা পেতে পারেন।
এদিকে দক্ষিণ কোরিয়ার নতুন পরিকল্পনায় কোরীয় ভাষার ওপর বেশি জোর দেওয়ায় ইংরেজি মাধ্যমে উচ্চশিক্ষা নিতে আগ্রহী শিক্ষার্থীদের জন্য কিছুটা চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে ভাষা দক্ষতা পরীক্ষায় লেভেল চার অর্জন করতে দীর্ঘ সময় ধরে ভাষা শেখার প্রয়োজন হতে পারে। অন্যদিকে পার্টটাইম কাজের সুযোগ পেতেও লেভেল তিন অর্জনের শর্ত রাখা হচ্ছে। ফলে যারা শুধু ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা করতে চান কিংবা দেশটির সংস্কৃতির প্রতি আকৃষ্ট হয়ে সেখানে যেতে চান, তাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নতুন শর্তগুলো গভীরভাবে বিবেচনা করতে হবে।
অবশ্য দক্ষিণ কোরিয়ায় ইংরেজি মাধ্যমে উচ্চশিক্ষার সুযোগ এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। দেশটির সত্তরের বেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক হাজারেরও বেশি বিভাগে ইংরেজিতে ডিগ্রি অর্জনের ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে কোরীয় ভাষায় উচ্চপর্যায়ের দক্ষতা না থাকলেও শিক্ষার্থীরা এসব বিভাগে পড়াশোনার সুযোগ খুঁজতে পারেন। সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী বাড়ানোর পাশাপাশি তাদের ভাষাগত দক্ষতা, একাডেমিক সাফল্য এবং কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা নিশ্চিত করতে চায় দক্ষিণ কোরিয়া। নতুন নিয়ম কার্যকর হলে দেশটিতে উচ্চশিক্ষার পরিকল্পনা করা বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য কোরীয় ভাষা শেখা আগের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন